প্লট না নিলেও টিউলিপ সিদ্দিককে সাজা দেওয়ার যে কারণ বলেছে আদালত

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি এবং বর্তমান ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিককে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্লট দুর্নীতির মামলায় কেন দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত তা রায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

একইসাথে, প্লট গ্রহীতা তার মা শেখ রেহানাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, তার খালা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বাকি ১৪ আসামিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৪ এর বিচারক রবিউল আলম।

এই মামলার অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিক নিজে প্লট না নিলেও মা শেখ রেহানাকে প্লট পাইয়ে দিতে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার খালা শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, এই রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় মিজ সিদ্দিক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বৃটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি মন্তব্য করেছেন, পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত 'ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক' ছিল।

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, তার কাছে এই মামলার বিষয়ে কোনো সমন বা অভিযোগ পত্র পাঠানো হয়নি, বাংলাদেশি কোনো কর্তৃপক্ষের কেউ তার সাথে কখনো যোগাযোগও করেনি।

তার দল যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টিও বলেছে, তারা এই বিচারকে স্বীকৃতি দেয় না কারণ মিজ সিদ্দিককে আইনগতভাবে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

দোষী সাব্যস্ত করার কারণ নিয়ে রায়ে যা বলা হয়েছে

এদিকে, রায়ে বিচারক আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করার কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেছেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, " শেখ রেহানা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্ররোচিত করে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পে প্লট নিয়েছেন। টিউলিপ সিদ্দিক তার মা রেহানা সিদ্দিককে প্লট পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার খালা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এবং শেখ হাসিনার একান্ত সচিব সালাউদ্দিনকে মোবাইল ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে এবং বাংলাদেশে এলে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন।"

দুইজন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং তাদের জবানবন্দিতে তা প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেছে আদালত।

কিন্তু, কেবলমাত্র সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও জবানবন্দি ছাড়া এই অভিযোগ প্রমাণের স্বপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন এই মামলায় নিযুক্ত স্পেশাল পিপি তরিকুল ইসলাম।

অর্থাৎ অ্যাপের মাধ্যমে মিজ সিদ্দিকের আসামিদের সাথে যোগাযোগ করে প্রভাবিত করার কোনো স্ক্রিনশট বা নথি প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করেনি দুদকের আইনজীবীরা।

হোয়াটসঅ্যাপে মিজ সিদ্দিক যোগাযোগ করেছেন বলে উল্লেখ করেন তরিকুল ইসলাম।

তবে হোয়াটসঅ্যাপের যোগাযোগের কোনো স্ক্রিনশট বা কপি আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে মি. ইসলাম বলেন," না, সাক্ষী ওসমান গণি এবং উজ্জল হোসেন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছে, টিউলিপ সিদ্দিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি(১)মি. সালাউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করে তার মা, ভাই ও বোনকে প্লট বরাদ্দ দিতে প্ররোচিত করেছেন, উস্কানি দিয়েছেন।"

তবে, হোয়াটসঅ্যাপে মিজ সিদ্দিকের দেয়া মেসেজের কোনো স্ক্রিনশট বা কপি আইনজীবীদের কাছে নেই বলে জানান তারা।

আইনজীবী মি. ইসলাম দাবি করেন, মেসেজের স্ক্রিনশট না থাকলেও সাক্ষী ওসমান গনি ও উজ্জল হোসেন মি. সালাউদ্দিন আহমেদের খুব ঘনিষ্ঠ।

একইসাথে মি. আহমেদ টিউলিপ সিদ্দিক, শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

এ মামলায় আনা অভিযোগ কিভাবে প্রমাণিত হয়েছে সে সম্পর্কে রায়ে আদালত বলেছে, "আসামি শেখ হাসিনা সকল আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অধীনস্ত কর্মকর্তা, কর্মচারীদের প্রভাবিত করে দুর্নীতির মাধ্যমে তার প্লট বরাদ্দ প্রদানের ব্যবস্থা করে দিয়ে ক্রিমিনাল মিস কন্ডাক্ট বা ফৌজদারী অসদাচরণ করেছে। এই তিনজন বাদে অপর আসামিরা পাবলিক সার্ভেন্ট। তারা বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে প্লট বরাদ্দ পেতে সহায়তা করেছেন।"

কেন আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পাননি?

দুদকের করা এই প্লট দুর্নীতির মামলায় ১৭ জন আসামির মধ্যে কেবলমাত্র একজন খুরশিদ আলম কারাগারে রয়েছেন।

শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং টিউলিপ সিদ্দিকসহ বাকি ১৬ জন আসামিকে পলাতক দেখিয়ে এই মামলার বিচার করা হয়েছে।

কেন পলাতক আসামিরা আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পাননি সেই বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশেষ জজ আদালত চারের বিচারক রবিউল আলম।

রায়ের পর্যবেক্ষণে কারণ ব্যাখ্যা করে বিচারক বলেন, "বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় পৃথিবীর যেখানেই থাকুক না কেন সেই আসামির বিচার করতে আইনে কোনো বাধা নেই।"

শুধু আসামি খুরশিদ আলম আত্মসমর্পণ করেছেন এবং বাকি ১৬ জন আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ না করে পলাতক থেকেছে বলে উল্লেখ করেছে আদালত।

একইসাথে, আইনানুযায়ী আসামিদের প্রথমে আদালতে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণের নির্দেশ এবং পরে উপস্থিত না হলে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আদালত।

ফলে কেন আসামিরা আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ পাননি সেই কারণ ব্যাখ্যা করে আদালত বলেছে, "কেবলমাত্র মৃত্যুদণ্ডের ধারার মামলার ক্ষেত্রে পলাতক আসামির ক্ষেত্রে স্টেট ডিফেন্স বা রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে।"

"মৃত্যুদণ্ডযোগ্য ধারা না থাকলে মামলায় পলাতক আসামির ক্ষেত্রে ডিফেন্স ল ইয়ার নিয়োগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের কোনো ধারার অভিযোগ না থাকায় আসামিদের জন্য ডিফেন্স ল ইয়ার নিয়োগ প্রদানের কোনো সুযোগ নেই" বলে জানিয়েছে আদালত।

টিউলিপ সিদ্দিকের প্রতিক্রিয়া

রায়ের পর বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ানকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়া টিউলিপ সিদ্দিক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে যেসব এভিডেন্স জমা দিয়েছেন সেগুলো জাল।

বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল এবং তার পাসপোর্ট ও কর আইডির কথা বলা হয়েছে সরকারি কৌসুলির পক্ষ থেকে।

যদিও মিজ সিদ্দিক বলছেন, শৈশব থেকেই তার কোনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই এবং বাংলাদেশে কখনো কর দেননি তিনি।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বিবিসিকে বলেছেন, পুরো ঘটনায় আমি হতচকিত হয়ে গেছি। আমার বিরুদ্ধে নানারকম অভিযোগ ছড়ানো হলেও গত দেড় বছরে বাংলাদেশি কোনো কর্তৃপক্ষ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি।''

তিনি বলেন, ''আমার কাছে কোনো সমন পাঠানো হয়নি, কোনো অভিযোগপত্র পাঠানো হয়নি, তাদের পক্ষ থেকে কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি, আমাকে পাওয়া তো কঠিন না, আমি একজন সংসদ সদস্য''।'

টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, ''আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমি একধরনের দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছি। আমাকে সাজা দেওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে, আমি সংবাদপত্রে এটা পড়েছি। এটি মিডিয়া ট্রায়াল, যা অত্যন্ত অন্যায়''।

রায়ের পর দ্যা গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছেন, "এর (বিচারের) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক ছাড়া আর কিছুই নয়।''

"আগে থেকেই যেমনটা ধারণা করা হচ্ছিল, তেমনি অন্যায্যভাবেই এই ক্যাঙ্গারু আদালতের রায় এসেছে। আমি আশা করি, এই তথাকথিত 'রায়'টিকে তার যথাযথভাবেই দেখা হবে।''

''আমার ফোকাস বা মনোযোগ সবসময়ই হ্যাম্পস্টেড এবং হাইগেটের আমার ভোটারদের উপর ছিল এবং আমি বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতির দ্বারা বিভ্রান্ত হবো না।"

মিজ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে দেওয়া দুর্নীতির রায়কে স্বীকৃতি দিচ্ছে না তার দল লেবার পার্টিও।

কারণ হিসেবে দলটি বলছে, বিচারকাজ চলাকালে টিউলিপ সিদ্দিককে ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এদিকে, ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ ১৬জন আসামি পলাতক থাকায় কীভাবে আইনের আওতায় আনা হবে এমন প্রশ্নে দুদকের আইনজীবী খান মো. মইনুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, "এই সাজা দুর্নীতি দমন কমিশনকে অবহিত করা হবে। কমিশন সরকারকে অবহিত করবে। পরে বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার বা আসামিরা যেসব দেশে পলাতক আছে সেসব দেশের সরকারের সাথে যোগাযোগ করবে।"

মিজ সিদ্দিক বর্তমানে লেবার পার্টির এমপি।

ফলে কিভাবে তার সাজা কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ এমপি হওয়া সত্ত্বেও উনি বাংলাদেশের নাগরিক এবং ভোটার আছেন। একদিকে উনি বাংলাদেশের নাগরিক, আরেকদিকে ব্রিটিশ নাগরিক। সেই হিসেবেই সরকার ব্রিটিশ সরকারের সাথে যোগাযোগ করবে।"

দুদক গতবছরের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পরিবারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলে টিউলিপ সিদ্দিকের ওপর পদত্যাগের চাপ পড়ে।

একপর্যায়ে এ বছরের ১৫ই জানুয়ারি ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন টিউলিপ সিদ্দিক।

গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর গত ডিসেম্বরে তাদের বিরুদ্ধে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠার ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

এই ছয় মামলার মধ্যে শেখ হাসিনা ও তার ছেলে-মেয়ের বিরুদ্ধে করা মামলায় গত সপ্তাহে রায় দেয় আদালত।

শেখ হাসিনা ছয় মামলাতেই আসামি।

এর মধ্যে সোমবারের মামলাসহ মোট চার মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া টিউলিপ সিদ্দিকের ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক এবং আজমিনা সিদ্দিক রুপন্তীর বিরুদ্ধে করা আরো দুইটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম কার্যক্রম চলমান রয়েছে।