নির্বাচনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বন্ধে ইসি কী করছে?

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র পাঁচদিন আগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবিরের একজন পান-সিগারেট বিক্রেতার হাতে এক হাজার টাকার নোট গুঁজে দেওয়ার একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ঢাকা পনেরো নির্বাচনী আসনের এলাকা মিরপুরে তার সমর্থনে প্রচারণা চালানোর সময় তাকে ওই টাকা দিতে দেখা যায়।

জামায়াতে ইসলামপন্থি এই আইনজীবীর হাতে এ সময় নিজের দলের প্রচারপত্রও ছিল।

ভ্রাম্যমান একজন বয়োজ্যেষ্ঠ পান, সিগারেট বিক্রেতার সাথে শনিবার কথোপকথনের একপর্যায়ে মি. কবির নিজের মানিব্যাগ খুলে এক হাজার টাকার নোটটি গুঁজে দেন তার হাতে।

মি. কবিরের টাকা বিতরণের এরকম দুইটি ভিডিও নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে।

আগামী বারোই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

ফলে নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে প্রকাশ্যে এভাবে ভোটারদের অর্থ দেওয়ায় নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার লঙ্ঘন হয়েছে কিনা সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেককেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হতেও দেখা গেছে।

এদিকে, মি. কবির নিজেই তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে এই ভিডিওটি আপলোড দিয়ে লিখেছেন, গরিব মানুষকে সাহায্য করাও বিপদ।

আবার, মি. কবির দাবি করেছেন বিভিন্ন গণমাধ্যম এই মানবিক সাহায্যকে অন্যভাবে প্রচার করার হীন চেষ্টা করেছে। কেউ কষ্ট পেলে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মি. কবির দান হিসেবে অর্থ দিয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, "এটিকে রাজনীতিকরণ করার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করার কোনো সুযোগ দেখতেছি না।"

যদিও নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা ভঙ্গের মতো এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনও পাননি বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে যে কোন অনিয়মকে আমলে নেওয়া উচিত।

টাকা দেওয়া নিয়ে কী ঘটেছে?

টাকা দেওয়ার ওই ভিডিওতে দেখা যায়, এ এস এম শাহরিয়ার কবির ওই পান বিক্রেতাকে ব্যবসা কেমন চলছে জানতে চাইলে মোটামুটি উল্লেখ করেন তিনি।

মোটামুটি কেন মি. কবির আবার জানতে চাইলে ওই বিক্রেতা তাকে বলছিলেন, "দেশের পরিস্থিতি ভালা না, বুঝেন না। সবাইতো ভয়ের মধ্যে, আতঙ্ক।"

তখন তিনি জানতে চান, কী ভয়, আতঙ্ক কিসের?

এ সময় ওই ব্যক্তি উত্তর দেন, কোন বেলা কি কইরা বয়।

আবার প্রশ্ন করে মি. কবির "আমরাতো আপনাদের জন্যই" এমন আশ্বাস দিয়ে ভয়ের কারণ জানতে চান।

"নতুন সরকার আইলে কওন যাইবো। এখন সরকার নাই বুঝেন না" বলেন ওই বিক্রেতা।

পরে আইনজীবী শাহরিয়ার কবির তার কাছেই জানতে চান কোন সরকার ভালো।

বিক্রেতা বলেন, "আইলেতো কওন যাইবো কোনটা ভালা। আমিতো চাই দেশ ভালা চলুক।"

একপর্যায়ে মি. কবির বলেন, "আমরা মুসলমান। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো, কারও ক্ষমতা আছে ভালো করার?"

এ সময় ওই ব্যক্তিকে তিনি আবার প্রশ্ন করেন, "রিজিকের মালিক কে? আপনার সঙ্গে এই মুহূর্তে আমার দেখা হবে, এটার মালিক কে?"

বয়োবৃদ্ধ ওই বিক্রেতা উত্তরে "আল্লাহ" উচ্চারণ করলে মি. কবির প্রশ্ন করেন, "তাহলে সে যেটা বলছে, তার বাইরে গিয়া দেশ চললে ভালো হবে?"

একইসাথে কতদিন বাঁচবেন এবং কবরে নাকি দুনিয়ায় বেশি দিন এমন প্রশ্নও করেন তিনি।

বিক্রেতা 'কবর' উত্তর দেওয়ার পর মি. কবির বলেন, "কবরে ভালো থাকতে হবে, তাইলে ওই ব্যবস্থাটা করতে হবে। তাই না।"

কথোপকথন শেষ করে এই পর্যায়ে মি. কবির মানিব্যাগ থেকে এক হাজার টাকার নোটটি বের করে বিক্রেতাকে দিয়েই, সঙ্গীদের চলেন বলে সামনে এগোতে দেখা যায় ভিডিওটিতে।

এরকম আরেকটিতে ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ছোট শিশুদের হাতে ব্যাডমিন্টন কেনার জন্য টাকা তুলে দিচ্ছেন।

তিন জনের হাতে টাকা তুলে দিয়ে তিনি বলছেন, "এডি আবার ভিডিও করে দেখায়া বইলো না যে আমি ভোটের জন্য টাকা দিছি। তোমাদের র‍্যাকেটের জন্য টাকা দিছি কিন্তু।"

যদিও ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজে মি. কবির দুইটি ঘটনার জন্যই ক্ষমা চেয়েছেন।

পান-সিগারেট বিক্রেতাকে টাকা দেওয়ার বিষয়টিকে মানবিক বিষয় উল্লেখ করে তিনি একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

মি. কবির লিখেছেন, "আমি গত শনিবারে মিরপুর এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে জামাতের সমর্থনে গণসংযোগ কালে একজন পান ও সিগারেট বিক্রেতার সাথে আমার সাক্ষাৎকালে জানতে পারি যে, তার সারাদিন তেমন বেচা বিক্রি হয় নাই,এবং আমি সবার সম্মুখে ক্যামেরার সামনে এক হাজার টাকা দান করি মানবিক দিক বিবেচনা করে,ওই একই স্থানে আমি বাচ্চাদের র‍্যাকেট কেনার কিছু টাকা গিফট করি এবং মিডিয়াকে আমি স্পষ্টভাবে বলি এই মানবিক সাহায্যকে আপনারা অন্যভাবে দেখবেন না বা দেখার সুযোগ নেই।"

একইসাথে এই ঘটনায় "মানুষ হিসেবে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী" বলেও লিখেছেন তিনি।

নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় কী আছে?

গত দশই নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।

কোনো প্রতিষ্ঠানে চাঁদা, অনুদান বা অর্থ বরাদ্দ দেওয়া যাবে কিনা সে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে এই বিধিমালায়।

এতে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী কিংবা তার পক্ষ থেকে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন-পূর্ব সময়ে ওই প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ওই এলাকা বা অন্যত্র অবস্থিত কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো প্রকার চাঁদা বা অনুদান বা উপঢৌকন দেওয়া বা দেওয়ার অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটের আগে এরকম সরাসরি ভোটারকে অর্থ দেওয়ার ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে নির্বাচন কমিশনের সেটি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।

নির্বাচন পর্যবেক্ষক জেসমিন টুলি বিবিসি বাংলাকে বলেন,"ইলেকশন কমিশনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এটা এভয়েড করা উচিত না আসলে। এটাতো আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ ভোটারদের পয়সা দিয়ে কেনা।"

বাংলাদেশে এমনিতেই সাধারণত নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয় উল্লেখ করে তিনি জানান, নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে যে কোনো অনিয়মকে আমলে নেওয়া উচিত।

"নির্বাচনী শুদ্ধতার জন্য দরকার, প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেজন্য ছোটো হোক বড় হোক সব ধরনের বিষয়কে আমলে নেওয়া উচিত। চাক্ষুষ এরকম প্রমাণ থাকলে সেটাতো আরো খারাপ" বলেন এই নির্বাচন পর্যবেক্ষক।

নির্বাচন কমিশন যা বলছে

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন সংক্রান্ত এ ধরনের অভিযোগ স্থানীয় ইলেকটোরাল এনকোয়ারি অ্যান্ড অ্যাডজুডিকেশন কমিটির কাছে করা যাবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "অভিযোগটা করবেন স্থানীয় ইলেকটোরাল এনকোয়ারি অ্যান্ড অ্যাডজুডিকেশন কমিটির কাছে। তাদের কাছে অভিযোগটা করলেই সবচেয়ে বেশি সমীচীন হবে।"

কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভোটারদের টাকা দেওয়া, বিকাশে টাকা বিকাশ করা বা ব্যাংক লেনদেনের মতো আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে নির্বাচন কমিশন কী ধরনের ব্যবস্থা নেয় এমন প্রশ্নও মি. আহমেদের কাছে করা হয়।

নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গের অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে বিচারিক দায়িত্ব পালনকারীরা শাস্তির সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান ইসি সচিব।

"এটা অনেক ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার আছে। অ্যাডজুডিকেশন, বিচারিক দায়িত্বে যারা আছেন, তারা যে সিদ্ধান্তটা নিবেন সেটাই গ্রহণীয়। সেটা জরিমানা হতে পারে, জেলও হতে পারে" বলেন মি. আহমেদ।

তবে এ ধরনের অভিযোগ সাধারণত স্থানীয় ইলেকটোরাল এনকোয়ারি অ্যান্ড অ্যাডজুডিকেশন কমিটির কাছে যায় উল্লেখ করে তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাননি।

আচরণবিধি লঙ্ঘনে কী করতে পারবে বিচারিক কমিটি?

ভোটের আগে ও ভোটের দিনের অপরাধ ঠেকাতে দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে নির্বাচনের মাঠে থাকবে বিচারিক কমিটি।

গত ১৪ই ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন এই ইলেকটোরাল এনকোয়ারি অ্যান্ড অ্যাডজুডিকেশন কমিটি বা বিচারিক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়।

এই বিচারিক কমিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ফল ঘোষণার গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত নির্বাচনী অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিচার করতে পারবে।

এই কমিটির অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দেওয়া প্রতিবেদনে অনিয়মের প্রমাণ পেলে নির্বাচনের ফলাফল ইসি আটকে দিতে পারবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান অনুযায়ী, ৩০০ আসনে ৩০০ জন বিচারক এই বিচারিক দায়িত্ব পালন করবেন।

একইসাথে অনিয়ম তদন্ত করে সুপারিশ পাঠাবেন ইসিতে।

ভোটে ঘুষ আদান-প্রদান, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চরিত্র নিয়ে মিথ্যা বিবৃতি, অবৈধ প্রভাব, ভোটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ এরকম নির্বাচনী অপরাধ করলে ন্যূনতম দুই বছর থেকে অনধিক সাত বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

এছাড়া ভোটের দিন কেন্দ্রের চারশো গজের ভেতরে প্রচার, বিশেষ কাউকে ভোট দিতে প্ররোচিত করলে নূন্যতম ছয় মাসের কারাদণ্ড থেকে অনধিক তিন বছরের দণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।