আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভারতের দলিতদের নেতা আম্বেদকারের সংবিধান রচনার কিছু অজানা কাহিনি
- Author, সৌতিক বিশ্বাস
- Role, ভারত সংবাদদাতা
ভারতের সাংবিধানিক পরিষদে ১৯৪৯ সালের ২৫শে নভেম্বর যখন সংবিধান পাঠ শেষ হয়, তখন ভারতের অন্যতম রাজনৈতিক প্রবক্তা এবং দেশটির দলিত সম্প্রদায়ের অবিসংবাদিত নেতা ড. ভীমরাও আম্বেদকার তার বক্তৃতায় একটি জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য করেন। দলিতদের সেসময় বলা হত “অচ্ছুৎ”।
তিনি বলেছিলেন, “২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০এ আমরা পরস্পরবিরোধিতায় ভরা এক জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। ভারতের রাজনীতিতে আমরা সৃষ্টি করছি সাম্য, এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে আমরা ডেকে আনছি অসাম্য।”
ওই দিনে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হয়। ভারত নিজেকে সার্বভৌম গণতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে। ড. আম্বেদকার সম্ভবত নতুন একটি প্রজাতন্ত্র এবং প্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতির প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। তিনি আলাদাভাবে এমন মন্তব্যও করেছিলেন যে গণতন্ত্র “ভারতে ওপর ওপর একটা সজ্জা” যা “বাস্তবিক অর্থে কিন্তু অগণতান্ত্রিক” আর গ্রামগুলো সেখানে “স্থানীয় ঘেটো মানসিকতার কূপ- অজ্ঞতা, সংকীর্ণ মানসকিতা আর সাম্প্রদায়িকতার আখড়া”।
বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক জর্জ উইলহেল্ম ফ্রেইডরিক হেগেল বলেছিলেন: অস্পৃশ্যতার অবসান, সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ, সব প্রাপ্তবয়স্কর জন্য ভোটাধিকার এবং সকলের জন্য সমান অধিকার, একজন দরিদ্র মানুষের জন্য যেমন অভাবনীয় তেমনই তা উল্লেখযোগ্য একটা অর্জন ভারতের মত একটা অসম মানসিকতার রাষ্ট্রের জন্য, যে দেশ একই জায়গায় “আটকে রয়েছে এবং এগোয়নি”।
তিনটি উত্তাল বছর - ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত ২৯৯ সদস্যের একটি সাংবিধানিক পরিষদ এই সংবিধান রচনার কাজে ব্যাপৃত ছিল। এই তিন বছরে সেদেশে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয়েছে- দেশ ভাগ হয়েছে – ভারত ও নবগঠিত পাকিস্তানের মধ্যে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যাপক সংখ্যক শরণার্থী এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়েছে। এই তিনটি বছর আরও প্রত্যক্ষ করেছে ব্রিটিশ শাসনের সময়ে শত শত দেশীয় রাজা বাদশাদের শাসনাধীন রাজ্যকে কীভাবে কঠিন শর্তে স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ড. আম্বেদকার নিজে ছিলেন একজন আইনজ্ঞ। প্রধান যে সাত সদস্যের প্যানেল ৩৯৫ ধারা সম্বলিত সংবিধানের খসড়া তৈরি করে তার নেতৃত্ব তিনি দিয়েছিলেন।
অশোক গোপালের লেখা ‘আ পার্ট অ্যাপার্ট’ নামে ড. আম্বেদকারের একটি গৌরবজ্জ্বল জীবনী গ্রন্থ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি তুলে ধরেছেন ড. আম্বেদকার কীভাবে তার স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে লড়াই করেছেন এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূতদের সঙ্গে তার মতভেদ দূরে সরিয়ে রেখে বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে পুরনো সংবিধানের ভিত্তি রচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এই বই থেকে জানা যায় ড. আম্বেদকারের ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞা কীভাবে তাকে এই ভূমিকায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে।
ওই সাত সদস্যের খসড়া রচয়িতা কমিটির পাঁচজনই ছিলেন উচ্চ বর্ণের। কিন্তু তারা আম্বেদকারকেই অনুরোধ করেছিলেন এই কমিটিতে নেতৃত্ব দিতে।
এইম্যন ডি ভ্যালেরা, আর্য়াল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতা, যিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন এবং আর্য়াল্যান্ডের সংবিধান রচনা করেছিলেন, তিনি, হয় ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটন অথবা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে এই ভূমিকার জন্য ড. আম্বেদকারের নাম সুপারিশ করেছিলেন বলে লিখেছেন মি. গোপাল। (এই তথ্য জানা যায় ড. আম্বেদকারকে লেখা ভারতের শেষ ভাইসরয়-পত্নী এডউইনা মাউন্টব্যাটনের চিঠি থেকে।)
এডউইনা মাউন্টব্যাটন ড. আম্বেদকারকে আরও বলেছিলেন যে তিনি “ব্যক্তিগতভাবে খুশি” যে ভারতের সংবিধান রচনা তিনি “তত্ত্বাবধান” করছেন, কারণ তিনিই “একমাত্র প্রতিভাবান ব্যক্তি যিনি সব শ্রেণি, সব জাতির জনগণকে সমান ন্যায়বিচার দিতে পারবেন”।
মার্চ ১৯৪৭এ ভাইসরয়ের পদ গ্রহণের অল্প দিন পরেই লর্ড মাউন্টব্যাটন ড. আম্বেদকারের সঙ্গে “খুবই আগ্রহজনক এবং মূল্যবান আলোচনা” করেন বলে লিখছেন অশোক গোপাল।
ভাইসরয় ঊর্ধ্বতন একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তাকে বলেছিলেন যে নেহরুর অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ১৫জন মন্ত্রীর মধ্যে ড. আম্বেদকারের নাম দেখে তিনি “অত্যন্ত সন্তুষ্ট” হয়েছেন।
আম্বেদকারের প্যানেল, সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ খসড়াটি পরীক্ষা করে দেখে, যেটি গণপরিষদে উত্থাপন করা হয় ১৯৪৭ সালের মে মাসে। এটি পাঠানো হয় প্রথমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের এবং পরে কংগ্রেস পার্টির কাছে। কোন কোন অংশের খসড়া সাতবার পর্যন্ত বদলানো হয়।
ওই পরিষদের প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্র প্রসাদের কাছে সংশোধিত যে খসড়াটি ড. আম্বেদকার পেশ করেন, তাতে প্রায় বিশটি বড়ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল মূল প্রস্তাবনার অংশটিও, যেখানে ন্যায়বিচার, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল এবং সংবিধানের মূল অঙ্গীকারগুলোও যেখানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল।
প্রস্তাবনা অংশে “ভ্রাতৃত্ব” শব্দটির সংযোজন এবং সংবিধানের অন্যান্য অংশেও এই মর্মে “৮১টি শব্দের চমকপ্রদ ও ঐতিহাসিক প্রয়োগের” পুরো কৃতিত্ব ছিল ড. আম্বেদকারের – লিখেছেন মি. গোপাল। ভারতীয় সংবিধান রচনার গোপন ইতিহাস নিয়ে দার্শনিক আকাশ রাঠোরের লেখা বই ‘আম্বেদকারস্ প্রিঅ্যাম্বেল: এ সিক্রেট হিস্ট্রি অফ দ্য কনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে একথা লিখেছেন মি. গোপাল।
এই সংবিধান নিয়ে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলো করেছিলেন ড. আম্বেদকার। তিনি তখন ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তার মধ্যেও তিনি গণপরিষদে প্রায় ১০০ দিন দাঁড়িয়ে থেকে “ধৈর্য্যের সাথে প্রতিটি ধারা এবং প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কেন বাতিল করা হয়েছে তা ব্যাখ্যা করেন”।
বৈঠকগুলোতে সব সদস্য সবসময় উপস্থিত থাকতেন না। কমিটির একজন সদস্য টি টি কৃষ্ণামাচারি ১৯৪৮এর নভেম্বরে অ্যাসেম্বলিতে বলেন যে “সংশোধিত সংবিধানের খসড়া তৈরির সব চাপ ঘাড়ে নিয়েছিলেন” ড. আম্বেদকার প্রায় একাই, কারণ বেশিরভাগ সদস্যই “মৃত্যু, অসুস্থতা এবং অন্যান্য কাজের দায়িত্বের” মত নানাবিধ কারণে এ কাজে “উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান” রাখতে পারেননি।
খসড়ায় সাড়ে ৭ হাজারের ওপর সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছিল, এবং এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার গৃহীত হয়। এই সংবিধানের খসড়া তৈরির “অনেকটা কৃতিত্ব” ড. আম্বেদকার দিয়েছিলেন এস এন মুখার্জিকে, যিনি ছিলেন একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা এবং “খুবই জটিল প্রস্তাবকে সহজ আইনি ভাষায় ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা তার ছিল”।
ভারতের “দলিত শ্রেণির” প্রবক্তা হিসাবে বিআর আম্বেদকারের একটা বিপ্লবী ভাবমূর্তি ছিল। তা সত্ত্বেও এই সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে তিনি সব শ্রেণির মানুষের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেছেন। শ্রেণি ভিত্তিক আলাদা নির্বাচকমণ্ডলীর জন্য তার দাবি গণপরিষদে প্রত্যাখ্যাত হয়। এর আগেই ভারতের মূল শিল্পগুলো জাতীয়করণের জন্য তার দাবি টেকেনি। সংবিধানে সমাজবাদেরও উল্লেখ করা হয়নি।
সাংবিধানিক পরিষদ যখন ১৯৪৬এর ডিসেম্বরে প্রথমবার বৈঠক করে, তখন ড. আম্বেদকার স্বীকার করেন: “আমি জানি আজ আমরা রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিভক্ত। আমরা এক একটি বিবদমান শিবির। আমি এমনকি একথাও স্বীকার করব যে এরকম একটি শিবিরের নেতাদের আমিও অন্যতম একজন।”
মি. গোপাল তার বইতে লিখেছেন “আম্বেদকার আগে অনগ্রসর ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠির জন্য যেসব দাবিদাওয়া তুলেছিলেন, তার নতুন নেতৃত্বের ভূমিকায় সেগুলো নিয়ে তিনি যেভাবে কাজ করেছেন তা হল - তিনি সব শ্রেণির মানুষের স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়েছেন, শুধু বিশেষ কোন শ্রেণির স্বার্থকে তিনি অগ্রাধিকার দেননি – যেমন তফসিলি জাতি”। (ভারতের ১৪০ কোটি জনগণের মধ্যে ২৩ কোটি মানুষ “তফসিলি জাতি ও উপজাতি”র মানুষ)
মি. গোপাল তার বইয়ে যুক্তি দিয়েছেন এসব বিভিন্ন কারণ থেকে এটা নিশ্চিতভাবে স্বীকার করা যায় যে ভারতের সংবিধানের প্রধান স্থপতি হলেন ড. আম্বেদকার। তিনি এই দলিলটি “সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিবেচনা করেছেন” এবং দলিলটির “প্রতিটি অংশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে” চূড়ান্ত করার বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
বহু বছর পর রাজেন্দ্র প্রসাদ স্বীকার করেছিলেন যে ড. আম্বেদকার “সংবিধান রচনায় দক্ষ পাইলট”এর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
দলিত সম্প্রদায়ের অবিসংবাদিত এই প্রতিনিধি ৬ই ডিসেম্বর ১৯৫৬তে প্রয়াত হবার কয়েক ঘণ্টা পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরু বলেছিলেন: “সংবিধান রচনায় ড. আম্বেদকার যতটা যত্ন নিয়েছিলেন ও ঝামেলা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন আর কেউ তা নেয়নি”।
আজ সাত দশক পর, ভারতের বিশাল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ গণতন্ত্র অনেক গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখেও টিকে আছে। দেশটিতে বিভক্তি এবং সামাজিক অসাম্য যেভাবে বাড়ছে তাতে ভারতের ভবিষ্যত নিয়ে বহু মানুষ উদ্বিগ্ন।
ড. আম্বেদকার যখন সংবিধানের সংশোধিত খসড়া গণ পরিষদে উত্থাপন করেন তখন তার আরেকটি প্রজ্ঞাপূর্ণ উক্তির কথা তারা আজ তুলে ধরছেন।
তিনি বলেছিলেন, “ভারতের সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন আনুগত্যের সঙ্গে মেনে নিয়েছে...সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুদের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না, সে দায়িত্ব যে এখন তাদের ওপর তা তাদের বুঝতে হবে”।