'মোদী বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়ে ভারতকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন'

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে ভারত। তবে এই যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করেছে সে সম্পর্কে কোনো উল্লেখ করেনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে পাকিস্তানের নামও নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন নেতারা যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতার করার জন্য পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টার প্রশংসা করলেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টাকে শুধু উপেক্ষাই করেনি, ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়েও নীরব থেকেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আমরা যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আমরা আশা করি এটা পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে। যেমনটা আমরা আগেও বলেছি, যুদ্ধবিরতি, সংলাপ এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপ এই যুদ্ধ অবসানের জন্য অপরিহার্য"।
এই যুদ্ধের যে ধ্বংসাত্মক রূপ দেখা গিয়েছে, সে বিষয়েও ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি বলা হয়েছে, "এটা বিশ্বব্যাপী তেল ও জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে। আমরা আশা করি বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজগুলো এবার স্বাধীনভাবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসতে পারবে"।
এর আগে পাকিস্তান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মাঝে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, সেই সময় থেকেই দেশের ভেতরে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এটাকে ভারতের জন্য এক জাতীয় 'কূটনৈতিক আঘাত' বলে আখ্যাও দিয়েছিল।
অন্যদিকে, বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন ভারত 'ব্রোকার নেশন' (দালালি করে এমন দেশ বোঝাতে) বা মিডলম্যান হতে চায় না।

ছবির উৎস, @MEAIndia
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার কথা উল্লেখ না থাকলেও ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের অনেকেই এই বিষয়ে পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কূটনীতির সমালোচনা করছেন।
কংগ্রেস নেতা রশিদ আলভি বলেছেন, "পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করেছে, তা আসলে ভারতের করা উচিত ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন ইসরায়েলকে 'পিতৃভূমি' বলে অভিহিত করেন, তখন তিনি যুদ্ধবিরতির কথা কীভাবে বলবেন?"
যুদ্ধবিরতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা মেনন রাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটা দীর্ঘ পোস্ট করেছেন।
সেখানে তিনি লিখেছেন, "(এক্ষেত্রে) পাকিস্তানের ভূমিকা আর্কিটেক্ট হিসেবে নয়, বরং মাধ্যম ও অনুঘটক হিসেবে উন্মোচিত হয়েছে। তারা এমন এক পথ তৈরি করে দিয়েছে যার মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে, ডেডলাইন (সময়সীমা) শিথিল করা হয়েছে এবং একটা সংকীর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা ঠিক চিরাচরিত অর্থে মধ্যস্থতা নয়, কিন্তু একে রসিকতা করে উড়িয়েও দেওয়া যায় না"।
তিনি লিখেছেন, "আমরা এখন যা দেখছি সেটা সংঘাতের সমাধান নয়, বরং অবস্থানের পুনর্বিন্যাস। যুদ্ধ শেষ হয়নি। সেটা একটা ভিন্ন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে মাত্র, যেখানে এখন বলপ্রয়োগ এবং আলোচনা একসঙ্গে চলছে"।
এই প্রসঙ্গে ভারতের ভূমিকা নিয়েও মত প্রকাশ করেছেন তিনি। ওই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেছেন, "এর অন্তর্নিহিত অর্থ স্পষ্ট"।
"একে শুধু উত্তেজনা প্রশমন হিসেবে দেখলে হবে না। বিষয়টাকে চাপের পরিস্থিতিতে থাকা একটা ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে ফলাফল এখনো পরিবর্তনশীল," লিখেছেন নিরুপমা মেনন রাও।
পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, ভারতের নিজের অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার।
"ভারতের উচিত সুস্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান জানানো। উত্তেজনা প্রশমনকে সমর্থন করা, সমুদ্রপথে নেভিগেশনকে রক্ষা করা এবং এই সংঘাতের কোনো একটা পক্ষের বয়ানের সঙ্গে একাত্ম হওয়া থেকে বিরত থাকা দরকার। এটা নীরব থাকার মুহূর্ত নয়। এটা পরিমিত কণ্ঠস্বর ব্যবহারের মুহূর্ত," লিখেছেন তিনি।

ছবির উৎস, WHITEHOUSE
বিশ্লেষক অশোক সোয়াইন 'পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট' নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি এই যুদ্ধবিরতিকে ইরানের বিজয় এবং পাকিস্তানের জন্য সম্মানের বলে বর্ণনা করেছেন।
তার মতে, "যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের সফল আলোচনা প্রমাণ করে যে তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আস্থাভাজন নয়, তাদের প্রতি চীনেরও আস্থা রয়েছে। বিশ্বমঞ্চে মোদী পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু উল্টে তিনি ভারতকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন"।
এই প্রসঙ্গে অতীতেও পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি। তার কথায়, "স্নায়ু যুদ্ধের সময় পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শান্তির পথ প্রশস্ত করেছিল এবং এখন স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী যুগে পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কাজ করছে। জয়শঙ্কর যাই বলুন না কেন, এমন রেকর্ড কারো নেই"।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশ এবং ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষক অভিনব সিং।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, "বর্তমানে পাকিস্তানই একমাত্র রাষ্ট্র যার তিন পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তি উপসাগরীয় দেশসমূহ ও ইরান এই সবার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে"।
"সেই তুলনায় মোদীর কাছে রয়েছে নেতানিয়াহুর কাছ থেকে পাওয়া পদক ও আলিঙ্গন এবং তাকে অধীন একজন হিসেবে মনে করেন ট্রাম্প," মন্তব্য মি. সিংয়ের।

ছবির উৎস, ashoswai/X
গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স সাংবাদিক অঞ্জনা শঙ্করও পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন।
তিনি লিখেছেন, "আমি বুঝতে পারছি না কেন কিছু মানুষ মধ্যস্থতা করার জন্য পাকিস্তানের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিতে চান না। যুদ্ধ চরম অবস্থায় থাকাকালীনও পাকিস্তান কূটনৈতিক পথ বন্ধ হতে দেয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ইসলামাবাদ আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মধ্যস্থতা করতে সফল হয়। এই যুদ্ধ যেভাবে বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছিল সেদিক থেকে এটা একটা বড় সাফল্য"।
অমিত ভেরে নামে এক সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারী লেখেন, "আপনারা বুঝতে পারছেন যে ভারতের এলপিজি ও পেট্রোল সমস্যার সমাধান আমাদের নেতা (মোদী) করেননি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এর সমাধান করেছেন? এটা অবিশ্বাস্য শোনালেও বিষয়টা চমকে দেওয়ার মতো। শাহবাজ শরিফ যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছেন"।
এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও পরিশোধিত পণ্যের উপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় সাত বছরের মধ্যে প্রথমবার ইরানের তেল ভারতে আসছে। চলতি সপ্তাহেই এসে পৌঁছাবে তেলের সেই ট্যাংক।
ক্যাপ্টেন নরেশ সিং নামে একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী লিখেছেন, "মোদীজির ব্যর্থ কূটনীতির ফলস্বরূপ পাকিস্তান বিশ্বগুরু হয়ে উঠেছে।"
সাংবাদিক অঙ্কুর ভারদ্বাজের মতে, "তুচ্ছ চিন্তাভাবনা ও তিক্ততা দেখানোর বদলে আমাদের স্বীকার করা উচিত যে এই যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করেছে এবং কূটনীতিতে আমরা কোথায় ভুল করেছি আর কেন ভুল করেছি তা নিয়ে গভীরভাবে আত্মসমীক্ষা করা এবং ভাবা উচিত।"








