অবৈধ বিয়ের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও স্ত্রী বুশরা বিবির কারাদণ্ড

ইমরান খান এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে গত জুলাইয়ে জামিন নিতে দেখা গেছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইমরান খান এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে গত জুলাইয়ে জামিন নিতে দেখা গেছে
    • Author, হেনরি অ্যাস্টিয়ের
    • Role, বিবিসি নিউজ

পাকিস্তানের একটি আদালত দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং তার স্ত্রীর বিয়ে বাতিল করে অবৈধ বিয়ের অভিযোগে তাদের সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।

আদালত রায় দিয়েছে যে, ২০১৮ সালে আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতা বুশরা বিবির সাথে ইমরান খানের যে বিয়ে হয়েছে, তা ছিল অনৈসলামিক এবং অবৈধ।

দুর্নীতির দায়ে ইমরান খান ইতিমধ্যেই কারাগারে রয়েছেন। গত বুধবার, দেশটির সাধারণ নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে, এই দম্পতিকে রাষ্ট্রীয় উপহার থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

এ নিয়ে ৭১ বছর বয়সী ইমরান খান বলেছেন, তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক এবং বর্তমানে এই রাজনীতিবিদকে ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সর্বশেষ মামলার জন্য রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের ভিতরে একটি আদালত স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে খান তার আগের সাজা ভোগ করছেন।

বুশরা বিবির নামে ‘বিয়েতে প্রতারণা এবং ব্যভিচারের’ অভিযোগ উঠেছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বুশরা বিবির নামে ‘বিয়েতে প্রতারণা এবং ব্যভিচারের’ অভিযোগ উঠেছে।

বুশরা বিবির প্রাক্তন স্বামী খাওয়ার মানেকা নতুন এই মামলা দায়ের করেছেন। সর্বশেষ ২০১৭ সালের বিবাহবিচ্ছেদের আগে বুশরা বিবির সাথে তার ২৮ বছরের সংসার ছিল।

খাওয়ার মানেকা দাবি করেছেন যে ইমরান খানের সাথে বুশরা বিবির বিয়ে প্রতারণামূলক ছিল।

পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডন এ প্রকাশিত খবরে বলা হয়, সরকারি কর্মচারী এবং সুপরিচিত এক রাজনীতিবিদের ছেলে খাওয়ার মানেকা।

নভেম্বরে তিনি বুশরার নামে ‘বিয়েতে প্রতারণা এবং ব্যভিচারের’ অভিযোগ দায়ের করেন।

ব্যভিচারের অভিযোগ বাতিল করলেও প্রতারণার অভিযোগটি আমলে নেয় আদালত।

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যু বা বিবাহ বিচ্ছেদের পর কয়েক মাসের জন্য নারীদের পুনরায় বিয়ে করা নিষিদ্ধ।

আদালত দেখতে পান যে বুশরা বিবি তার বিবাহ বিচ্ছেদের পর নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই পুনরায় বিয়ে করেছেন।

সাত বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি, আদালত খান এবং বিবিকে পাঁচ লাখ রুপি জরিমানা করেছে।

ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাস আগে ২০১৮ সালে বুশরা বিবিকে বিয়ে করেছিলেন।

বিবি, একজন আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতা এবং তার বয়স চল্লিশের মতো বলে বিশ্বাস করা হয়। তিনি সর্বদা জনসমক্ষে বোরকা পরেন এবং তিনি খানের তৃতীয় স্ত্রী।

ইমরান খানের প্রথম স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথ এবং প্রিন্সেস ডায়ানা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইমরান খানের প্রথম স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথ এবং প্রিন্সেস ডায়ানা

১৯৯৫ সালে সুপরিচিত ব্রিটিশ নাগরিক জেমিমা গোল্ডস্মিথের সাথে বিয়ের আগ পর্যন্ত ইমরান খান তার ক্রিকেটে ক্যারিয়ারের বছরগুলোয় প্লেবয় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

তখন মি. খানের বয়স ৪৩ বছর আর জেমিমার বয়স ছিল ২১ বছর। মিজ গোল্ডস্মিথের বাবা সেসময় বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।

তার সেই প্রথম বিয়ে নয় বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং দুটি পুত্রের জন্ম হয়েছিল।

এরপর ২০১৫ সালে সাংবাদিক এবং বিবিসির সাবেক আবহাওয়া উপস্থাপক রেহাম খানের সাথে ইমরান খানের দ্বিতীয় বিয়ে হয়।

কিন্তু সেই বিয়ে এক বছরও স্থায়ী হয়নি।

রেহাম খানের দাবি, ইমরান খানের সমর্থকরা তাকে হেনস্তা করেছিল এবং এ নিয়ে পরে একটি বইও লেখেন তিনি।

এর বিপরীতে, ইমরান খানের ২০১৮ সালে বুশরা বিবির সাথে বিয়ে ছিল খুবই সাদামাটা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, তাদের বিয়ে ইসলামের প্রতি ইমরান খানের আনুগত্যকে জনগণের সামনে বেশ ভালোভাবে উপস্থাপন করেছিল।

ইমরান খানের সাবেক দ্বিতীয় স্ত্রী রেহাম খান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইমরান খানের সাবেক দ্বিতীয় স্ত্রী রেহাম খান

বলা হয়ে থাকে, একবার ইমরান খান ১৩ শতকে নির্মিত এক দরগায় পরামর্শের জন্য গিয়েছিলেন পাঁচ সন্তানের মা বুশরা বিবির কাছে।

তখনও বুশরা বিবি তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে ছিলেন।

কথিত আছে, একদিন বুশরা বিবি স্বপ্নে দেখেন যে কেবল তাদের বিয়ে হলেই ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।

এরপর তারা বিয়ে করেন এবং ছয় মাস পর মি. খান দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

তবে, বর্তমানে ৪০ বছর বয়সী বুশরা বিবি ২০১৮ সালের অক্টোবরে তার দেয়া একমাত্র টিভি সাক্ষাৎকারে এ বিষয়টির সত্যতা নাকচ করে দেন।

তবে ইমরান খানের অধীনে দ্রুতই পাকিস্তান উন্নতি করবে বলে উপস্থাপককে আশ্বস্ত করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চার বছরের মধ্যেই মি. খানের রাজনৈতিক জীবনে ঝামেলা শুরু হয়।

এক পর্যায়ে ২০২২ সালে তাকে সংসদ়ে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

পরের বছর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বেশ কিছু মামলায় তাকে জেলে পাঠানো হয়।

বুশরা বিবি ও ইমরান খান।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বুশরা বিবি ও ইমরান খান।
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

গত বছরের আগস্টে গ্রেফতারের পর থেকে আটক রয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

শনিবার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে মি. খান তৃতীয় কারাদণ্ড পেলেন। মঙ্গলবার, গোপন নথি ফাঁস করার জন্য তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

বুধবারের আদালতে ইমরান খানের বিরুদ্ধে যে মামলাটির রায় ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে মূল অভিযোগ ছিল যে ইমরান খান এবং তার স্ত্রী যেসব রাষ্ট্রীয় উপহার পেয়েছিলেন সেগুলো অবৈধভাবে বিক্রি করে দিয়েছেন বা নিজেদের কাছে রেখেছেন।

সেসব উপহারের মধ্যে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের কাছ থেকে পাওয়া গহনাও ছিল।

ক্ষমতায় থাকাকালীন সহযোগীদের মাধ্যমে দুবাইতে পারফিউম, ডিনার সেট এবং হীরার গহনাসহ বিভিন্ন দামি উপহার বেআইনিভাবে বিক্রির অভিযোগ আনা হয় বুশরা ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, এই উপহারগুলোর মূল্য ছিল পাঁচ লাখ ডলারের বেশি।

ওই মামলায় দুজনকেই ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের রায়ে বুশরা বিবিকে গৃহবন্দি অবস্থায় তার দণ্ড ভোগ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে তাকে "ক্যাঙ্গারু কোর্ট" দ্বারা বিচার করা হয়েছে।

"ক্যাঙ্গারু কোর্ট" শব্দটি মূলত একটি বাগধারা যা দ্বারা এমন এক আদালতকে বোঝায় যার কার্যধারা স্বীকৃত আইনি নিয়মের সাথে মেলে না এবং সেগুলো ন্যায্য বলে বিবেচনা করা যায় না।

ক্রিকেটার ইমরান খান।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ক্রিকেটার ইমরান খান।

সর্বশেষ এই সাজা ঘোষণার আগেই, খান এবং তার দলকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই আগামী সপ্তাহে দেশটিতে হতে যাওয়া নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

কর্তৃপক্ষ ক্র্যাকডাউন চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করলেও পিটিআই নেতাদের অনেকেই কারাগারে আছেন বা দেশ ছেড়ে গিয়েছেন।

গত বছর খানকে যখন পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়, তখন তার দলের হাজার হাজার সমর্থক বিক্ষোভ করে। যা এক পর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল।

পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে এবারও জয়ী হওয়ার পথে এগিয়ে আছেন নওয়াজ শরিফ। তিনি পাকিস্তানের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

২০১৮ সালের নির্বাচনে ইমরান খান জয়ী হওয়ার আগে তাকে দুর্নীতির জন্য জেলে পাঠানো হয়েছিল।

অনেক বিশ্লেষক বলেছেন যে তিনি এখন পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক সংস্থার পক্ষ সমর্থন করছেন।