গ্রেফতার হওয়া শাহজাহান শেখ পুলিশ রিমান্ডে, সন্দেশখালিতে উৎসব

পশ্চিমবঙ্গের সন্দেশখালির যে তৃণমূল কংগ্রেস নেতা শাহজাহান শেখের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতন-সহ নানা অভিযোগ করে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা, তাকে অবশেষে বৃহস্পতিবার ভোররাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বসিরহাট আদালত তাকে ১০ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছে।

আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই তাকে সোজা কলকাতায় সিআইডি দপ্তরে নিয়ে আসা হয়েছে।

তবে স্থানীয় মানুষের ওপরে নির্যাতনের মামলায় নয়, কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের কর্মকর্তাদের ওপরে হামলার ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এ বছর পাঁচই জানুয়ারি সকালে শাহজাহান শেখের বাড়িতে কেন্দ্রীয় অর্থ দপ্তরের তদন্ত শাখা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র কর্মকর্তারা গিয়েছিলেন তল্লাশি চালাতে।

রেশন দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া প্রাক্তন খাদ্য মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে ওই তল্লাশিতে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় এজেন্সির কর্মকর্তারা।

তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই শাহজাহান শেখের বাড়িতে কয়েকশো নারী-পুরুষ জড়ো হয়ে ওই কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাবৃন্দ, তাদের সঙ্গে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ব্যাপক মারধর করে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ওই ঘটনা নিয়ে যে অভিযোগ দায়ের করেছিল ইডি, সেই মামলাতেই শাহজাহান শেখ গ্রেফতার হলেন।

ভোররাতে গ্রেফতার

উত্তর ২৪ পরগণা জেলার মিনাখাঁর সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার আমিনুল ইসলাম খান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে তার এলাকার বামনপুকুর অঞ্চল থেকে বৃহস্পতিবার রাত দুটো নাগাদ গ্রেপ্তার করা হয়েছে শাহজাহান শেখকে।

সন্দেশখালির ওই তৃণমূল কংগ্রেস নেতা শাহজাহান শেখের বিরুদ্ধে অন্যান্য যেসব অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে, সেই সব ঘটনা আসলে বেশ পুরনো, তাই সেগুলির তদন্ত করতে আরও কিছুটা সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের অতিরিক্ত মহা-নির্দেশক (দক্ষিণ বঙ্গ) সুপ্রতিম সরকার।

এলাকায় যার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন অত্যাচার চালানোর অভিযোগ করছিলেন স্থানীয় মানুষ, তার গ্রেফতারির পরে সন্দেশখালিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে উৎসব শুরু হয়ে যায়।

কেউ পুজো দেন, একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান, আবার আবির ওড়াতেও দেখা যায় অনেককে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

শাহজাহান শেখ গ্রেপ্তার হওয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেছেন, “পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা ছিল। আমরা আশা প্রকাশ করেছিলাম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যে দ্রুততম গতিতে এই শাহজাহান গ্রেপ্তার হবে, সেটাই হয়েছে।“

এরপরে তিনি যোগ করেন, “রাজ্য পুলিশ তো কাজ করল। এবার নারদ মামলার এফআইআর-এ নাম থাকা শুভেন্দু অধিকারী এবং অ্যালকেমিস্ট চিট ফান্ডের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর মিঠুন চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করুক সিবিআই।"

"এবার মহিলা কুস্তিগীরদের সঙ্গে অসভ্যতার নায়ক ব্রিজভূষণ গ্রেফতার হোক। এবার দেশের ব্যাঙ্ক লুঠেরাদের ধরুক ইডি", আরও বলেন তিনি।

অন্য দিকে শাহজাহান শেখের গ্রেফতারি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি ও দলীয় সংসদ সদস্য দিলীপ ঘোষ বলছেন যে তৃণমূল কংগ্রেস এবং পুলিশ ঠিকই জানত যে শাহজাহান শেখ কোথায় আছেন, আদালতে ধাক্কা খাওয়ার পরে আর আন্দোলনের চাপে তাকে এখন ধরতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ।

“সর্বভারতীয় চাপের জন্য পুলিশ গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়েছে। সারা দেশ জুড়ে ন্যাশনাল চ্যানেলে এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সবাই আমরা জানতাম ওখানেই আছে।"

"পুলিশকেই ধরতে হতো, ইডি তো ওখানে জলে-জঙ্গলে গিয়ে ধরতে পারত না। পুলিশের হাতেই ছিল। পুলিশই ধরেছে। আমরা গোড়া থেকেই বলছিলাম, পুলিশ জানে ও কোথায়। এখন বাধ্য হয়ে তাকে ধরা হয়েছে। এটা আগে হলে বিষয়টা বাড়ত না”, মন্তব্য দিলীপ ঘোষের।

হাইকোর্টের নির্দেশ

এর আগে রাজ্য পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস দল বলছিল যে আদালতের স্থগিতাদেশ আছে বলেই শাহজাহান শেখকে গ্রেপ্তার করতে পারছে না পুলিশ। তবে কলকাতা হাইকোর্ট দুদিন আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে মি. শেখকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে কোনও স্থগিতাদেশ তারা দেয়নি। রাজ্য পুলিশ অথবা কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সিগুলি– যে কেউই গ্রেপ্তার করতে পারে মি. শেখকে।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত মহা-নির্দেশক মি. সরকার বলেন, “সংবাদমাধ্যমে লাগাতার বলা হয়েছে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে শাহজাহানকে গ্রেফতার করছে না। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, এটা ঠিক নয়। এটা ভুল। এটা অপপ্রচার। আমাদের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। দিন দুয়েক আগে যখন মাননীয় উচ্চ আদালতের তরফে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয় যে গ্রেফতারির উপরে কোনও বিধিনিষেধ নেই, তখন আমরা জোরকদমে তল্লাশি শুরু করি। গত রাতে মিনাখাঁ থানার বামনপুকুর অঞ্চল থেকে শেখ শাহজাহানকে গ্রেফতার করি।”

তবে ঠিক কোথা থেকে, কীভাবে গ্রেপ্তার করা হলো মি. শেখকে, তার বিস্তারিত তথ্য ‘তদন্তের স্বার্থে’ জানাতে চাননি সুপ্রতিম সরকার। সব তথ্য আদালতে দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

কে এই শাহজাহান শেখ

সুন্দরবনের একটি দ্বীপ সন্দেশখালি। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র নেতা শাহজাহান শেখ। তিনি উত্তর ২৪ পরগণা জেলা পরিষদে মৎস্য ও পশুপালন বিভাগের প্রধান।

একসময়ে বামফ্রন্টের প্রধান শরিক সিপিআইএম দলে ছিলেন তিনি। কিন্তু বাম জমানার শেষ দিকে তিনি ধীরে ধীরে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ঝোঁকেন। পরে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন ওই জেলার নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের।

শাহজাহান শেখের নাম সংবাদমাধ্যমে প্রথমবার উঠে আসে এবছর জানুয়ারিতে। রাজ্যের রেশন দুর্নীতির যে তদন্তে গ্রেফতার হয়েছেন প্রাক্তন খাদ্য মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রেই পাঁচই জানুয়ারি কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি তল্লাশি চালাতে গিয়েছিল শাহজাহান শেখের বাড়িতে।

সেদিন কয়েকশো নারী পুরুষ জড়ো হয়ে ইডির কর্মকর্তা, তাদের সঙ্গে থাকা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, সংবাদমাধ্যম – সবাইকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। তারপর থেকে মি. শেখ নিখোঁজ।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একসময়ে মাছের ভেড়ির শ্রমিক বা কখনও ভ্যান গাড়ির চালক এই মি. শেখ এখন বিপুল সম্পত্তির মালিক। আর এইসব সম্পত্তির অনেকটাই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন মি. শেখ বা তার ঘনিষ্ঠ তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা, এমনটাই অভিযোগ স্থানীয় মানুষের।

‘পিঠা-পুলি বানানোর ডাক’

সন্দেশখালির স্থানীয়দের অনেকে অভিযোগ করেন যে শাহজাহান শেখ ও তার দুই সঙ্গী শিবু হাজরা এবং উত্তম সর্দার নিজেদের সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে গত দুই আড়াই বছর ধরে স্থানীয় মানুষের ওপরে অত্যাচার করে চলেছেন। এই সব অত্যাচারের মধ্যে নারীদের যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের অভিযোগও আছে।

শিবু হাজরা এবং উত্তম সর্দারকে আগেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গত তিন সপ্তাহ ধরে সন্দেশখালির নারীরা শাহাজাহান শেখ ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন লাঠি-ঝাঁটা নিয়ে।

তৃণমূল কংগ্রেসের ওই স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অন্তত দুটি এফআইআর দায়ের হয়েছে।

সেখানকার বাসিন্দা এক নারী নিজের পরিচয় গোপন করে বিবিসি বাংলার কাছে জানিয়েছিলেন “মেয়েদেরকে পিঠে পুলি করতে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের কি মা বোন নেই বাড়িতে? তাদের বাড়িতে কি পিঠে পুলি কেউ করে না? কেন আজকে সুন্দরী সুন্দরী মা বোনদের নিয়ে গিয়ে পিঠে পুলি করানো হতো? ভেতরে কী করেছে, সেটা জিগ্যেস করলে মেয়েরা বলে লজ্জার কথা কী বলবো!”

আরেক নারী বলেছিলেন, “মেয়েদের পিঠে পুলি বানানোর নাম করে নিয়ে যেত। সেখানে মেয়েদের সঙ্গে যেসব খারাপ কাজ, সেসব করা হতো। এই অত্যাচারের কথা কী কোনও মেয়ে নিজ মুখে বলতে পারে? পুলিশের কাছে গেলে তারা আবার ওই দাদাদের কাছেই গিয়ে মিটিয়ে নিতে বলতো।

তার ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ যদি দলীয় অফিসে না যেতেন, তাহলে পরের দিন ওই পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মারধর করা হতো বলেও একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন।

বিবিসি বাংলা অবশ্য সন্দেশখালিতে ঘুরে এমন কোনও নারীর সঙ্গে কথা বলতে পারেনি, যিনি নিজে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাও গ্রেপ্তার বা পলাতক থাকার কারণে তাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর

চাষের জমি দখল

যৌন নির্যাতন ছাড়াও এলাকার চাষের জমি জোর করে দখল করে মাছ চাষের ভেড়ি বানানোর অভিযোগও আছে মি. শেখ এবং তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে।

সেই সব অভিযোগ, এখন লিখিতভাবে এক গণ পিটিশন করে সরকারের কাছে জানিয়েছেন তারা।

এক নারী, উর্মিলা দাস বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, “৩৩ শতক জমি ছিল, বছরে তিন বার ধান হতো। দু'বছর আগে নোনা জল ঢুকিয়ে দিয়ে জমি নিয়ে নেয়। সেখানে মাছের ভেড়ি করেছে।"

"এদিকে একবছর আমাদের কিছু টাকা দিয়েছিল লিজ নেওয়ার বদলে, তারপর থেকে আর কিছু দেয় না। ওইটুকু জমিই ছিল আমার। এখন খেটে খেতে হয়। টাকা চাইতে গেলে হেনস্থা করত ওরা। তাই সরকারের কাছে আবেদন করেছি আমাদের জমি ফিরিয়ে দেওয়া হোক সেখানে আবারও চাষ করবো আমরা।“