আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এক সুইডিশ বিচারপতি কেন বাংলাদেশে সমাহিত হতে চান
- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং বাংলাদেশের মাটিতে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে বাংলাদেশের সরকার ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কাছে সৈয়দ আসিফ শাহকার চিঠি লিখেছিলেন আরো প্রায় আট বছর আগে, ২০১৪ সালে।
কিন্তু বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে তিনি কোন সাড়া পাননি।
এবার তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি চিঠি লিখেছেন, যেখানে তিনি তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া এবং তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
উনিশশো একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের সরকার ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি শাহকারকে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননা দিয়েছে।
তার লেখা চিঠিটি এ সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়া হবে বলে জানিয়েছে ‘আমরা একাত্তর’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
এই সংগঠনটি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের দাবিতে কাজ করছে।
কে এই আসিফ শাহকার?
সৈয়দ আসিফ শাহকার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত একজন সুইডিশ নাগরিক, যিনি ২০১৭ সালে সুইডিশ হাইকোর্ট বিভাগ থেকে বিচারপতি হিসেবে অবসর নিয়েছেন।
স্টকহোমের বাসিন্দা বিচারপতি শাহকার আত্মীয়-পরিজনদের সাথে দেখা করতে এই মুহূর্তে পাকিস্তানের লাহোরে রয়েছেন।
সেখান থেকে টেলিফোনে বিবিসি বাংলাকে তিনি জানিয়েছেন, সত্তরের দশকের তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপের এক অংশ যা ন্যাপ মোজাফফর নামে পরিচিত ছিল, তার সাথে যুক্ত ছিলেন।
জন্ম ১৯৪৯ সালে পাঞ্জাবের হরপ্পায়।
ছাত্রাবস্থায় ১৯৭১ সালে তিনি পাঞ্জাব স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
উনিশশো একাত্তর সালের ২৫শে মার্চে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘটানো অপারেশনে গণহত্যার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন বিচারপতি শাহকার।
এক বছরের বেশি সময় জেলে কাটিয়ে ১৯৭২ সালে তিনি মুক্তি পান।
কিন্তু বিবিসিকে বিচারপতি শাহকার বলেছেন, জেলখানা থেকে ছাড়া পেলেও নিজ দেশ পাকিস্তানে তিনি বিশ্বাসঘাতকের উপাধি পান এবং প্রবল ঘৃণার শিকার হতে থাকেন।
পরবর্তী পাঁচ বছরে সে পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি।
এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে ১৯৭৭ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে সুইডেনে চলে যান তিনি।
সুইডেনে তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং আইন পেশায় যুক্ত হন।
এ সময়েই তিনি মানবাধিকার এবং গণহত্যা ইস্যুতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হন।
তিন সন্তানের জনক বিচারপতি শাহকারের স্ত্রীও একজন সুইডিশ আইনজীবী।
বিবিসিকে মি. শাহকার বলেছেন, সুইডেনেও তার জীবন কঠিন ছিল।
তিনি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, “পাকিস্তানে কেবল পাকিস্তানিদের ঘৃণার মুখোমুখি হয়েছিলাম আমি, কিন্তু সুইডেনে এসে দেখা গেল সেখানকার বাংলাদেশি কম্যুনিটির মানুষেরা আমাকে পাকিস্তান এবং পাঞ্জাবের বাসিন্দা হিসেবে ১৯৭১ সালের জন্য ঘৃণা করছে।”
তিনি বলেন, “আমি তাদের (সুইডেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের) বোঝাতেই পারছিলাম না আমি বাংলাদেশের জন্য জেল খেটেছি এবং বাংলাদেশের পক্ষ নেয়ায় আমার নিজের দেশে আমি কী পরিমাণ অপমান, নির্যাতন এবং যন্ত্রণার শিকার হয়েছি।”
এরপর ২০০০ সালে সুইডেনে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের একজন কর্মকর্তার সাথে তার পরিচয়ের সূত্রে তিনি প্রথমবার সেখানকার বাংলাদেশিদের মুখোমুখি হয়ে তাদের ভুল ধারণা ভেঙে দেয়ার উদ্যোগ নেন।
সে বছরই তিনি বাংলাদেশে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
কিন্তু ২০০১ সালে বাংলাদেশে চারদলীয় জোটের অধীনে নতুন সরকার আসার পর তার সে চেষ্টা থেমে যায়।
বিচারপতি শাহকার বলেছেন, এরপর ২০১০ সালে তিনি নতুন করে সুইডেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগাযোগ করেন।
দুই হাজার বার সালে বাংলাদেশের সরকার ১৯৭১ সালে তার ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননা দেয়।
‘মানসিকভাবে তিনি সবসময় বাংলাদেশের সাথে ‘বিলং’ করেন’ জানিয়ে তিনি বলেছেন, সে কারণে তিনি চান বাংলাদেশের নাগরিক হতে এবং তার মৃত্যুর পর এই দেশে সমাহিত হতে।
বিবিসিকে তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের নাগরিক না হলে যেহেতু সেখানে সমাধিস্থ হতে পারবো না, তাই, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চেয়ে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লিখেছি।”
তিনি তার লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, “‘ফ্রেন্ডস অফ বাংলাদেশ’ সম্মাননা দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘যে বিদেশী স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করেছিল তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা।’ আপনার কথা আমাকে সরাসরি আপনার কাছে আবেদন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।”
তিনি বিবিসিকে বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হতে চান, এবং এদেশে তিনি বসবাস করতে চান।
“আমি বাংলাদেশে টুরিস্ট ভিসা নিয়ে যেতে চাই না, আমি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চাই, কারণ আমি অন্তর থেকে অনুভব করি পাকিস্তান আমার দেশ না। বাংলাদেশই আমার দেশ।”
‘আমরা একাত্তর’ যেভাবে যুক্ত হলো
এ বছর বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর অক্টোবরে জেনেভায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চালানো নৃশংসতাকে ‘গণহত্যার’ স্বীকৃতি দেয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে দাবি জানিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করা হয়।
ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরামের সহায়তায় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ সাপোর্ট গ্রুপ, আমরা একাত্তর এবং প্রজন্ম ৭১ ওই সেমিনার আয়োজন করে।
জেনেভার ওই অনুষ্ঠানে ‘আমরা একাত্তর’ সংগঠনের একজন নেতা এবং রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজা জেসমিন তার সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
তিনি জানিয়েছেন, এতে বিচারপতি সৈয়দ আসিফ শাহকার আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
মিজ জেসমিন বিবিসিকে বলেছেন, তখন তাদের সাথে বিচারপতি শাহকার তার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন, এবং জানান যে তিনি অনেক বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে চিঠি লিখলেও বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে কোন সাড়া পাননি।
এরপর ‘আমরা একাত্তর’ তার আবেদনটি বাংলাদেশে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেয়।
মিজ জেসমিন বলেছেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বিচারপতি শাহকারের আবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য উপযুক্ত সময় মনে করেছেন তারা, এবং সেজন্যই চলতি সপ্তাহে সেটি তারা করতে চান।