বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ যাত্রার পেছনে যে আইসিসি ট্রফি জয়ের গল্প

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, ফয়সাল তিতুমীর
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
“যখন রান আউটটা হল, মানুষ ঢুকতে আরম্ভ করলো আর আমি দৌড়াতে শুরু করলাম,” কথাগুলো খালেদ মাহমুদ সুজনের। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর বাংলাদেশের ক্রিকেট ফ্যানরা কেউই আসলে আর নিজেদের আটকে রাখতে পারেনি। এক অন্যরকম অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় হয় তাদের। এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা ছিল সেটা ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবারই।
কারণ সেটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ, আর সেটাই ছিল কোন টেস্ট স্ট্যাটাসপ্রাপ্ত দলকে প্রথমবার হারানোর স্বাদ। সেই ম্যাচের ম্যান অফ দ্য ম্যাচ খালেদ মাহমুদ সুজন। তিনি মনে করেন ঐ জয়টা বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছিল।
তবে এর প্রেক্ষাপটটা আসলে আরও পেছনে। আর পাকিস্তানের সঙ্গে সেই জয়টাই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় কিন্তু নয়, আর উদযাপন তো নয়ই!
নব্বই দশকে যাদের বেড়ে ওঠা তাদের অনেকেরই ক্রিকেট প্রেমের শুরু ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি দিয়ে। রেডিওতে খেলা শোনা, কেনিয়ার সাথে বাংলাদেশের ১ বলে ১ রানের উপাখ্যান, এরপর রঙিন উদযাপন, যে রঙের ছটা সারা দেশেই লেগেছিল!
ছাব্বিশ বছর আগে বাংলাদেশের সেই আইসিসি ট্রফি জয় পথ তৈরি করে দেয় আজকের সাকিব-তামিম-মুশফিকদের।

ছবির উৎস, Getty Images
‘বাংলাদেশের ক্রিকেট অধ্যায় দুই রকম’
“ইংল্যান্ড বলেন, অস্ট্রেলিয়া বলেন, তাদের কারোরই কিন্তু কোন নির্দিষ্ট মোমেন্ট নেই যেটা পিনপয়েন্ট করা যায়, যে ঐ নির্দিষ্ট ঘটনা বা ম্যাচের জন্য তাদের ক্রিকেটটা আজ এখানে। কিন্তু বাংলাদেশের আছে, আইসিসি ট্রফি জয়ের আগে ও পরে ভিন্ন দুইটা অধ্যায়,” বলছিলেন যে গুটিকয় সাংবাদিক বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া গিয়ে ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি কাভার করেছিলেন তাদের একজন - উৎপল শুভ্র।
তিনি মনে করেন বাংলাদেশ ক্রিকেটে টার্নিং পয়েন্ট এইটা। “ট্রফি জয়ের পর দেখেন বিশ্বকাপ নিশ্চিত হল, এরপর সেখানে পাকিস্তানকে হারানো না হলে টেস্ট মর্যাদার দাবি তোলা যেত না। আর টেস্ট স্ট্যাটাস না পেলে আমাদের ক্রিকেট এখনো আগের মতো থাকতো।”
প্রায় দশ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হাসিবুল হোসেন শান্তর। কিন্তু তিনি এখনো বিখ্যাত আইসিসি ট্রফির ফাইনালে কেনিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক রানটির জন্য। তিনিও মনে করেন ওটিই আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আজকের অবস্থানে আসার মূল ভিত্তি।
“সেখানে সফল না হলে আবার আইসিসি ট্রফি খেলা লাগতো, হয়তো কেনিয়ার মতো অবস্থা হত। এখন দেখেন কেনিয়া নাই, আমরা আজকে যেখানে আছি সবই ঐ ট্রফি জয়ের কারণেই।”
১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি জয়ের পরপরই বাংলাদেশ ওয়ানডে স্ট্যাটাস লাভ করে। এরপর ১৯৯৯ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ও ২০০০ সালে হয় টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তি। এ পথে আমূল বদলে যায় দেশের ক্রিকেট কাঠামো।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post, 1
আঠার বছরের নি:সঙ্গ লড়াই
বাংলাদেশে ক্রিকেটের পরিচিতি ঘটে ব্রিটিশদের হাত ধরেই। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড।
তখন একমাত্র ঢাকা স্টেডিয়ামেই ফুটবলের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে ক্রিকেট খেলা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে ঘরোয়া ক্রিকেটেও কিছু টুর্নামেন্ট শুরু করে বোর্ড।
তবে সেসময় বড় ঘটনা ছিল ১৯৭৬ সালে মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাব-এমসিসির ঢাকা সফর। বাংলাদেশ বনাম এমসিসির ম্যাচ ব্যাপক আলোড়ন ফেলে। এর পরের বছরই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল-আইসিসির সহযোগী সদস্যপদ লাভ করে।
আর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ প্রথমবার সুযোগ পায় আইসিসি ট্রফি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের। যেটাতে চ্যাম্পিয়ন হলেই কেবল মিলবে বিশ্বকাপের টিকিট।

ছবির উৎস, BCB
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আইসিসির সব সহযোগী সদস্যদের নিয়ে চার বছর পর পর তখন আয়োজন হতো আইসিসি ট্রফির।
সে সময় ছিল জিম্বাবুয়ের দাপট। নেদারল্যান্ডসও ছিল শক্তিশালী দল। ফলে প্রতিবার অংশ নিয়েও কখনো ফাইনালে খেলা হয় নি বাংলাদেশের।
তখন সে অর্থে দেশের কোন ক্রিকেট কাঠামো নেই, অর্থ নেই, ফুটবল-হকির উন্মাদনা ছিল প্রচুর। ক্রিকেটকে তাই অনেকটা নি:সঙ্গ লড়াই চালিয়ে যেতে হয় টিকে থাকার।
১৯৯৪ আইসিসি ট্রফিতে নিয়ম বদলে যায়। আইসিসি জানায় টুর্নামেন্টের সেরা তিন দল সুযোগ পাবে বিশ্বকাপ খেলার। জিম্বাবুয়ে ততদিনে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে গিয়েছে ফলে তারাও নেই এখন টুর্নামেন্টে।
ফলে আশায় বুক বাঁধে বাংলাদেশের ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবাই। কিন্তু সেবার ২য় রাউন্ডে বাদ পড়ে একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরতে হয় বাংলাদেশকে। অনেকের ক্রিকেট নিয়ে আশাও ছেড়ে দেয়ার উপক্রম হয়।
“৯৪-তে ধরা হয়েছিল বাংলাদেশ যাবে। ওখানে ফেইল করায় ৯৭-তে সবাই উঠেপড়ে লাগে। অনেক সিদ্ধান্ত ছিল, যা ধীরে ধীরে ৯৪ থেকে তিন বছর ধরে স্বপ্নের দিকে নিয়ে যায়,” বলেন ক্রীড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্র।
আর শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালে বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার যে লড়াই শুরু, সেটার ইতি ঘটে ১৮ বছর পর ১৯৯৭ সালে এসে।

ছবির উৎস, Utpol Shuvro
১৯৯৭ আইসিসি ট্রফির প্রস্তুতি
১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি মিশনে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন দলের ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। সদ্য ক্রিকেট ছেড়ে ১৯৯৬ সালে জাতীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব নেন তিনি। তার কথায় বাংলাদেশের প্রস্তুতির পুরো বিবরণ উঠে আসে।
“আমি কিন্তু বিসিবির প্রস্তাবে ম্যানেজার হয়ে আসি আইসিসি ট্রফিটা লক্ষ্য করে। এর আগে আরেকটা টুর্নামেন্টে মালয়েশিয়াতে গিয়ে ভেন্যুগুলো নিয়ে একটু হোমওয়ার্ক করে আসি। এরপর গর্ডন গ্রিনিজকে কোচ করে আনা হয়।”
সাবেক এই ক্রিকেটার মনে করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তীকে যোগ করা ছিল ট্রফি জয়ের পরিকল্পনার একটা অংশ।
মালয়েশিয়ার আবহাওয়ার জন্য সেখানে সবরকম ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হত কৃত্রিম উইকেটে। ফলে সেবার ঢাকার ঘরোয়া লিগও অনুষ্ঠিত হয় উইকেটে ম্যাট বিছিয়ে। গাজী আশরাফ মনে করেন সেটা ছিল দারুণ প্রস্তুতি।
আইসিসি ট্রফি সামনে রেখে বুয়েট মাঠে প্রথম অনুশীলন শুরু হয় বাংলাদেশ দলের। এরপর বিকেএসপিতে ক্রিকেটারদের নিয়ে চলে প্রথমবারের মতো আবাসিক ক্যাম্প।
“গর্ডন গ্রিনিজের অধীনে আমরা শিখেছি কীভাবে প্রাকটিস করতে হয়,” বলছিলেন এই দলের অন্যতম সদস্য খালেদ মাসুদ পাইলট। এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান বলেন, “বিকেএসপিতে যেন কারাগারে ছিলাম আমরা। ভোরে উঠেই ফিটনেস ট্রেনিং করাতো গর্ডন গ্রিনিজ। এরপর বিরতি দিয়ে আবার ব্যাটিং-বোলিং। এরপর বিরতি দিয়ে আবার ফিল্ডিং। দিনের পুরোটা আলো ব্যবহার করতো। বৃহস্পতিবার রাতে ফিরতে পারতাম ঢাকায়, এরপর আবার শুক্রবার সেই কারাগারে।”
ম্যানেজার লিপু মনে করেন বিকেএসপির অনুশীলন সবাইকে একটা দল হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। তিনি জানান সেখানে ক্রিকেটাররা যেমন কড়া শাসনে ছিল তেমনি, মজাও ছিল অনেক। ফলে সবার মধ্যে বোঝাপড়াটা দারুণ হয়।
দলের অধিনায়ক আকরাম খান মনে করেন সব প্রস্তুতির মূলে ছিল ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়া। আর সেটা সম্ভব হয় সবার মধ্যে দারুণ বন্ধন তৈরি হওয়াই।
“আমার যেটা সুবিধা ছিল সবাই আমার কথা শুনতো। আমরা সবাই একটা ফ্যামিলির মতো ছিলাম।”

ছবির উৎস, Getty Images
যত নাটকীয় সব ঘটনা
১৯৯৭ সালের আইসিসির ট্রফির ফাইনালকে বলা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ।
তবে যারা খেলেছিলেন তাদের কাছে এর আগে নেদারল্যান্ডস ম্যাচের গুরুত্ব ছিল আরও বেশি, সেই ম্যাচটিই ছিল বেশি শ্বাসরুদ্ধকর।
প্রথম রাউন্ডে বাংলাদেশ একে একে ডেনমার্ক, আর্জেন্টিনা, মালয়েশিয়া, পশ্চিম আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারায়।
এর মধ্যে আরব আমিরাত ম্যাচের স্মৃতি আলাদা করে জমা সাংবাদিক উৎপল শুভ্রর কাছে।
১৯৯৪ সালে আরব আমিরাতের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ। যেটাকে ম্যানেজার গাজী আশরাফ মনে করেন তারা আইসিসির অন্যায় নিয়মের সুবিধা নিয়ে বেশ কিছু ভারতীয় ও পাকিস্তানিকে খেলিয়েছিল। এবার তাই সেই ম্যাচের আগে তিনি সাংবাদিক উৎপল শুভ্রর দ্বারস্থ হোন। অনুরোধ করেন বেনামে সমর্থক হিসেবে কয়েকটি চিঠি লিখে দিতে যা দলকে অনুপ্রাণিত করবে।
রাত জেগে দল ও কয়েকজন ক্রিকেটারকে উদ্দেশ্য করে বেশ কিছু চিঠি লেখেন উৎপল শুভ্র। সে ম্যাচটি জিতে যায় বাংলাদেশ।
২য় রাউন্ডের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। সে ম্যাচে বাগড়া দেয় বৃষ্টি। আয়ারল্যান্ড আগে ব্যাট করে ১২৯ রানে গুটিয়ে যায়।
ম্যানেজার লিপু জানান বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সময় আমরা জানতে পারি এই খেলা শেষ না হলে বাংলাদেশ জিতে যাবে। ফলে ইচ্ছে করে সময় নষ্ট করতে থাকে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।
কিন্তু পরে জানা যায় পয়েন্ট ভাগ হবে। এরপর তাই যখন শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়, বাংলাদেশ দলের বদ্ধমূল ধারণা আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেটাররা ইচ্ছে করে পিছলে পড়ে মাঠকে খেলার অনুপযোগী দেখিয়েছে আম্পায়ারদের কাছে।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post, 2
এ বিষয়েও মজার অভিজ্ঞতা আছে উৎপল শুভ্রের। “তখন আসলে আমার সাংবাদিক সত্ত্বা আর সমর্থক সত্ত্বা এক হয়ে গিয়েছিল। আমি গিয়ে ম্যাচ রেফারিকে ধরি আপনি কেন খেলা পরিত্যক্ত করলেন। এখন বুঝি সেটা আমার ঠিক হয় নি।”
আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পয়েন্ট ভাগ হওয়ায় নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে পরের ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য হয়ে পড়ে ডু অর ডাই। হারলেই বিশ্বকাপের আশা শেষ, টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়। এই ম্যাচেও হানা দেয় বৃষ্টি। খেলতে মরিয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটার, সমর্থক, সাংবাদিক মিলে তোয়ালে দিয়ে মাঠের পানি শুকিয়েছে এমন গল্প তো ইতিহাস হয়ে আছে।
“আমরা হোটেল থেকে টাওয়েল নিয়ে আসতাম, ড্রেস চেঞ্জের জন্য। সেই টাওয়েল দিয়ে পুরো টিম আমরা মাঠে নেমে যাই খেলা চালানোর জন্য এবং খেলাটা হয়,” বলেন খালেদ মাসুদ।
তবে সেই ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের ১৭২ রান তাড়া করতে নেমে ১৫ রানেই চার উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ। এমন অবস্থায় হাল ধরেন অধিনায়ক আকরাম খান। ৬৮ রানে অপরাজিত থেকে দলকে ৩ উইকেটে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন।

ছবির উৎস, Getty Images
এই ইনিংসটা তাই কারো কারো কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। উৎপল শুভ্রের ভাষায়, “বাংলাদেশের ক্রিকেটটা পরের পর্বে আসছে এই নির্দিষ্ট ইনিংসের উপর ভর করে।”
এই ম্যাচ জয়ের সাথে সাথে নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশ সেমিফাইনাল। আর সেমিতে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
অধিনায়ক আকরাম খান বলেন, “আমরা জানতাম বাংলাদেশের কোন একটা স্পোর্টে যদি বিশ্বকাপ খেলার চান্স থাকে সেটা হল ক্রিকেট। এছাড়া আমাদের লক্ষ্য ছিল ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়া।”
সেই লক্ষ্যে ফাইনালে ফেভারিট কেনিয়াকে হারানোর ছক কষে ক্রিকেটাররা। আর নাটকীয়তায় এই ম্যাচটি ছাড়িয়ে আগের সব কিছুকে।
স্টিভ টিকোলোর দারুণ এক সেঞ্চুরিতে ৭ উইকেটে ২৪১ করে কেনিয়া। বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের সামনে নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৫ ওভারে ১৬৬ রানের। ছয় এর উপর রানরেট সেইসময় ছিল বেশ কঠিন। সেই লক্ষ্য একটা ‘বাজি’ খেলে বাংলাদেশ।
“আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেই আতহার আলীকে পরে নামানোর। রফিককে ওপেনিংয়ে পাঠাই আমরা,” বলেন ম্যানেজার লিপু। বাজিটা দারুণভাবে কাজে লাগে।
শেষ ওভারে বাংলাদেশের দরকার পড়ে ১১ রান। প্রথম বলে ছক্কা মেরে সেই সমীকরণ সহজ করে দেন খালেদ মাসুদ পাইলট।
“প্রথম বল ছয় মারলাম, এরপর ওয়াইড হলো, ডট দিলাম। তখন কিন্তু মনের মধ্যে ছিল, জিততেই হবে। আমি দোয়া করছিলাম, আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস নিয়ে হলেও আজকের দিনটা জিতায়া দাও আল্লাহ,” বলেন পাইলট।
শেষ বলে যখন এক রান দরকার ক্রিজে তখন বোলার হাসিবুল হোসেন শান্ত। “তখন সবার মাথা খারাপ। পাইলটের সাথে কথা ছিল খালি আউট হব না, যেটাই করি রান নেব। আমাদের বোঝাপড়া ভালো ছিল সেজন্য ওটা হয়ে যায়।”
এরপর তো মাঠেই উদযাপন, সারা দেশে রঙ মাখামাখি, প্রধানমন্ত্রীর ফোন আর দেশে আসলে লাল গালিচায় বিরাট সম্বর্ধনা পায় ক্রিকেটাররা।
“আমার মনে হয় ক্রিকেট খেলে যদি কোন অর্জন থাকে তাহলে সেই দিনের স্মৃতি, সেই ভালোবাসায় কোন খাদ ছিল না,” – স্মৃতিকাতর হন গাজী আশরাফ।

ছবির উৎস, Getty Images
প্রথম বিশ্বকাপ
১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে ছিল বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ। তবে ততদিনে ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ায় একটা ক্রিকেট কাঠামো দাঁড়াতে থাকে বাংলাদেশে। জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইংল্যান্ডে যায় একটা টুর্নামেন্ট খেলতে। এর মাঝে আইসিসি ট্রফি জয়ী কোচ গর্ডন গ্রিনিজের একবার নাটকীয় বিদায় ঘটে। আবার বিশ্বকাপের আগে তিনি দলের দায়িত্ব নেন। কিন্তু বিশ্বকাপ চলাকালীন পাকিস্তান ম্যাচের আগেই তাকে আবারো চাকরিচ্যুত করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।
তবে তার অধীনেই বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড আর পাকিস্তানকে হারিয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির দাবি জোরালো করে বাংলাদেশ।
গর্ডন গ্রিনিজের বিদায় প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আকরাম খান বলেছিলেন, “আমরা ওর সঙ্গে যা করেছি সেটা খুবই দু:খের। পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা যখন বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলছি সেদিন দুপুরে বোর্ডের কিছু কর্মকর্তাদের সাথে দ্বন্দ্বে তাকে বরখাস্ত করা হয়। এভাবে বিদায় দেয়াটা খুব খারাপ লাগে এখনো।”
আইসিসি ট্রফি জয়ের পর গর্ডন গ্রিনিজকে বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতা জানায় সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিয়ে।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post, 3
তখন আর এখন
এবার ভারতে নিজেদের ৭ম বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছে বাংলাদেশ দল। তবে সেসময়ের সাথে স্বাভাবিকভাবেই এখন অনেক পার্থক্য দেখেন সাবেক ক্রিকেটাররা।
“এখন অনেক ক্রিকেট হয়। অতিরিক্ত ক্রিকেট হওয়ার কারণে ক্রিকেটাররা মনে হয় সিরিয়াস কম। আমার মনে হয় ম্যাচের সংখ্যা কমানো উচিত, তাহলে তারা আনন্দ নিয়ে খেলতে পারতো। এখন অনেকে হয়তো হাতে পায়ে ইনজুরি নিয়ে খেলে, যথেষ্ট আনন্দ তারা পায় না,” বলেন ৯৭ আইসিসি ট্রফি জয়ী দলের ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু।
আর পেসার হাসিবুল হোসেন মনে করেন যতোটা এগুনোর কথা সেই তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট।
“আমাদের সময় তো কোন স্ট্রাকচারই ছিল না। এখন অনেক কোচ, সুযোগ সুবিধা, টাকা পয়সা বেড়েছে, তবে আমার মনে হল খেলা আরো বেটার হওয়া দরকার। উইকেট, মাঠ এসব দিকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে,” বলেন তিনি।











