রাশিয়া, চীনের সাথে লড়াই করে আমেরিকা কি পারবে আফ্রিকার মন জয় করতে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অ্যান সয়
- Role, আফ্রিকা সংবাদদাতা
প্রথমে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফ্রিকা সফরে করেছেন। এখন মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট সফর করছেন এবং বছরের শেষের দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই আফ্রিকায় সফরে যাবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক এসব সফরের মধ্যে দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকা মহাদেশের রাষ্ট্রগুলোর সাথে তার সম্পর্ককে আরও গভীর করতে ইচ্ছুক।
আর এসব ঘটছে বিশেষ করে চীন এবং রাশিয়াসহ অন্যান্য বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর তরফ থেকে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার পটভূমিতে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিস রোববার ঘানা সফরের মধ্য দিয়ে আফ্রিকায় তার ন’দিনব্যাপী সফর শুরু করেছেন। ঘানার কোটোকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঢোল বাজিয়ে এবং নাচগানের মধ্য দিয়ে তাকে স্বাগত জানানো হয়। ঘানার পর তিনি তানজানিয়া এবং জাম্বিয়ায় সফর করবেন।
ঘানা তার প্রবাসী নাগরিকদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করছে। পাশাপাশি, রাজনীতিতে বেশ ক’বার শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের রেকর্ড তৈরি করেছে।
সেই বিবেচনায়, মিসেস হ্যারিসের আফ্রিকা সফরের সূচনা ঘানা দিয়ে করার জন্য দেশটি ছিল এক আদর্শ জায়গা।

ছবির উৎস, Getty Images
মার্কিন সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, কামালা হ্যারিসের এই সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে ডিসেম্বরের ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলনের সাফল্যকে আরও সামনে এগিয়ে নেয়া।
ঐ শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, "আফ্রিকার ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত" রয়েছে আমেরিকা।
তবে যে ভবিষ্যতের কথা মি. বাইডেন উল্লেখ করছেন, তার সাথে সাথে ঐ মহাদেশের তরুণ জনসংখ্যা এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক শক্তিশালী দেশও আকৃষ্ট হয়েছে। এবং তারাও সেখানে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সাম্প্রতিক ইথিওপিয়া এবং নিজের সফরের লক্ষ্য ছিল এই দুটি দেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলির ওপর দৃষ্টি দেয়া। অন্যদিকে, কামালা হ্যারিসের এই সফর তাকে নিয়ে যাবে এমন সব দেশে - যারা এখন গুরুতর অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন।
ঘানার অর্থনীতি একসময় বেশ সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু দেশটি এখন গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন আর্থিক সঙ্কট পার করছে।

ছবির উৎস, Getty Images
দেশটির মুদ্রাস্ফীতির হার এখন শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি। এর মধ্যেই ঘানা তার বৈদেশিক ঋণ পুন:তফসিল করতে চাইছে। অর্থমন্ত্রী কেন ওফোরি-আট্টা সবেমাত্রই বেইজিংয়ে চীন সরকারের সাথে আলোচনা করে দেশে ফিরে এসেছেন।
“চীনের বৈঠকটি ছিল বেশ ইতিবাচক এবং উৎসাহজনক," অর্থমন্ত্রী টুইট করেছেন। তিনি আশা করছেন যে "খুব শিগগীরই" ঋণের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক [অর্থাৎ চীনের] আশ্বাস পাওয়া যাবে।
দেশটি চাইছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে আর্থিক সহায়তার নিশ্চয়তা জোগাড় করা।
কিন্তু এক্ষেত্রে মিজ হ্যারিস ঠিক কী ধরনের সাহায্যের প্রস্তাব দিতে পারেন তা স্পষ্ট নয়, তবে মি. ওফোরি-আট্টার চীন সফরের পটভূমিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ থাকবে ঘানার উন্নয়নে প্রকৃত অংশীদারের মতো কাজ দেখানোর।

ছবির উৎস, Getty Images
যুক্তরাষ্ট্রও বন্ধু, ঠিক চীন ও রাশিয়ার মতো
অর্থনীতিবিদ ও ঘানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক গডফ্রেড আলুফার বোকপিন অবশ্য মনে করেন না যে মিজ হ্যারিসের এই সফরটি তার দেশের আর্থিক দুরবস্থা দূর করতে “দ্রুত কোন সুফল” বয়ে আনবে।
"চীন জড়িয়ে পড়ায় এই ব্যাপারটা বেশ জটিল হয়ে পড়েছে," বলছেন তিনি, তবে মিজ হ্যারিসের সফরটি ঘানার জন্য "খুব গুরুত্বপূর্ণ" কারণ এর মাধ্যমে "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।“
তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ঘানার প্রতি এবং এর ঋণ সংকটের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে সেটা ‘ভাল’ খবর তবে, তার ভাষায়, ঋণদাতা দেশের আরোপ করা "প্রতিকূল বাণিজ্যিক শর্ত" নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
অন্যদিকে, মধ্য আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ার অবস্থাও ঘানার মতোই।
যখন কোভিড মহামারি শুরু হয়েছিল তখন তামা-সমৃদ্ধ দেশটি ছিল আফ্রিকার প্রথম কোন দেশ যেটি ঋণ খেলাপি হয়।
ঋণ পুনঃতফসিল করার জন্য জাম্বিয়া দীর্ঘদিন ধরে চীনের সাথে আলোচনা চালাচ্ছে এবং তারা আইএমএফের কাছেও আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
বার্তা সংস্থা রয়টার্স একজন সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে, মিজ হ্যারিস "ঘানা এবং জাম্বিয়ার ঋণ সঙ্কট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন।"
অধ্যাপক বোকপিনের মতোই জাম্বিয়ার বিশ্লেষক ড. সিশুওয়া সিশুওয়াও মনে করেন, ঋণ পুন-তফসিলের ক্ষেত্রে চীনের প্রভাবই বেশি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেকে আরও বেশি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়।
আফ্রিকা মহাদেশে এখন এই মনোভাব জোরদার হচ্ছে যে বাদবাকি বিশ্বের সাথে আফ্রিকার সম্পর্ক কেমন হবে সেটি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা তার থাকা উচিত।
"জাম্বিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সেইভাবে দেখে যেভাবে সে চীন এবং রাশিয়াকে দেখে থাকে – বন্ধু হিসেবে," ড. সিশুওয়া বিবিসিকে বলছিলেন।
"যখন কোনও দেশ সমর্থনের আশায় চীন, রাশিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ফিরে তাকায়, তখন তার মানে এই নয় যে অন্য বড় পরাশক্তিকে সে প্রত্যাখ্যান করছে।"
তাই, আফ্রিকার দেশগুলির সাথে একচেটিয়া সম্পর্ক খোঁজার প্রচেষ্টার ফল উল্টো হতে পারে এবং সেটা টেকসই নাও হতে পারে বলেই তিনি মনে করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
এর প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল গত বছর ওয়াশিংটন সফরের সময়, যখন দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসা মন্তব্য করেছিলেন: "আমরা কার সাথে মিশবো বা মিশবো না তা আমাদেরকে বলে দিতে হবে না।"
ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারা বিবিসিকে বলছেন, আফ্রিকান দেশগুলো কাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে সেটা বলা তাদেরও উদ্দেশ্য নয়।
আফ্রিকান দেশগুলির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য গণতন্ত্রের ওপরই জোর দিতে আগ্রহী। ভাইস-প্রেসিডেন্ট তার সফরের সময় এমন বিষয় নিয়েই আলোচনা করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
মিজ হ্যারিসকে স্বাগত জানানোর আগে জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হাকাইন্দে হিচিলেমা গণতন্ত্রের ওপর একটি ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলন কো-হোস্ট করবেন বলে কথা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনসহ আরও চারটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এই শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবেন।
মার্কিন সরকার বলছে, মানবাধিকার এবং সুশাসনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও ঐ মহাদেশের সাথে তার সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করছে। আর এটাই চীন এবং রাশিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
আফ্রিকায় নানা সংশয়
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
চীনের নীতি হচ্ছে, কোন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, যা স্বৈরাচারী নেতাদের সাথে তার সম্পর্কের পথ অনেকটাই মসৃণ করে দেয়।
বুরকিনা ফাসো ও মালিসহ আফ্রিকার যে দেশগুলিতে সম্প্রতি অভ্যুত্থান হয়েছে ঐসব দেশে রাশিয়ার উপস্থিতি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের সাথে। ঐ দুটি দেশের সাথেই ফ্রান্সের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ঘটনা নি:সন্দেহে পশ্চিমা বিশ্বকে আরও বেশি সংখ্যায় আফ্রিকান দেশগুলোর মন জয় করার জন্য বাড়তি তাগিদ দিয়েছে।
এই আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের এক ভোটকে কেন্দ্র করে আফ্রিকান দেশগুলো বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ভোটদানে বিরত থাকার দেশগুলোর অর্ধেকই ছিল আফ্রিকান। এর মধ্যে রয়েছে তানজানিয়া, কামালা হ্যারিস যে দেশটি সফর করবেন বলে কথা রয়েছে।
মিজ হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি তানজানিয়ার প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসানের সঙ্গেও দেখা করবেন।
নারীর অগ্রযাত্রার প্রতীক এই দুই নেতার যৌথ অভিজ্ঞতা নিয়ে তানজানিয়ায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
দেশটি যে অগ্রগতি অর্জন করছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে এর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রমাণ হিসাবেও অনেকে এই সফরকে উল্লেখ করছেন।
খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয় যখন জন মাগুফুলির নেতৃত্বাধীন দেশ তানজানিয়া ছিল একটি একঘরে রাষ্ট্র। কারণ তার ছিল স্বৈরাচারী প্রবণতা। বিরোধীদল এবং স্বাধীন মিডিয়ার কার্যক্রম তিনি সীমিত করেছিলেন।
মিজ হ্যারিস হলেন বাইডেন প্রশাসনের সবচেয়ে সিনিয়র কর্মকর্তা যিনি আফ্রিকা সফর করছেন আর ডিসেম্বরের যুক্তরাষ্ট্র-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলনের পর এটি হচ্ছে কোন মার্কিন নেতার পঞ্চম সফর।
আফ্রিকা সফর করেছেন এমন অন্য মার্কিন নেতারা হলেন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন, জাতিসংঘে মার্কিন দূত লিন্ডা টমাস-গ্রিনফিল্ড, ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন এবং মি. ব্লিঙ্কেন।
কিন্তু আফ্রিকার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আগ্রহের প্রশ্নে ঐ মহাদেশ থেকে তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণেরও দাবি উঠেছে।
ঘানার অধ্যাপক বোকপিন বলছেন, আফ্রিকার প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
"একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে ‘আফ্রিকা দখলে’র জন্য একটি নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, অনেকটা স্ক্র্যাম্বল খেলার মতো," তিনি উল্লেখ করেন উনিশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপীয় দেশগুলির হাতে আফ্রিকা মহাদেশের বিভক্তির ঘটনা, যার ফলে কয়েক দশক ধরে আফ্রিকায় উপনিবেশবাদ এবং শোষণ চলেছিল।
"এখন নতুন করে এই যোগাযোগের ব্যাপারে জোর দিতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর," বলছেন তিনি।








