আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'সব কিছুর দামই তো একটু একটু করে বাড়তাছে কিন্তু আমার আয় তো বাড়ে না'
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
"করোনা দিয়া সেই যে ঝামেলা শুরু হইলো আর ঠিক হইলো না। হের পর থেক্কাই আয় করি ব্যয় করি টিয়া দেহিনা," এভাবেই বলছিলেন ঢাকার ছোলমাইদ এলাকার বাসিন্দা মোহোম্মদ সোহেল। জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধিতে তার মতো অনেকেই এখন আয়-ব্যয়ের হিসেব মেলাতেই বেশ হিমশিম খাচ্ছেন।
রিকশা চালিয়ে পরিবারের পাঁচজনের খোরাক জোগান মোহাম্মদ বাবুল। জমা-খরচ দিয়ে প্রতিদিন তার উপার্জন ৭০০-৮০০ টাকা।
ঢাকায় থাকা-খাওয়াসহ নিজের খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে গ্রামে পরিবারের কাছে পাঠান ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। যা দিয়ে সব খরচের পাশাপাশি চলে দুই সন্তানের লেখাপড়া আর মায়ের চিকিৎসাও।
রাজধানীর গুদারাঘাট এলাকায় কথা হচ্ছিল এই রিকশাচালকের সঙ্গে । বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ব্যাটারি রিকশার আধিক্যে আগের তুলনায় আয় কমে বেশ চাপে পড়েছেন।
একই সাথে বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে নাভিঃশ্বাস অবস্থা।
"পোলাটা সেভেনে পড়ে। আর মনে হয় বেশিদিন স্কুলে যাওয়া হইবে না," বলেন তিনি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস-এর করা ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ দেশে গত তিন বছরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় দশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, দারিদ্র্য ও বৈষম্য নিয়ে গত এপ্রিলে অনেকটা একই ধরনের বার্তা দিয়েছিল বিশ্বব্যাংকও। যেখানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি ও সার্বিকভাবে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রশ্নে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে
সম্প্রতি 'ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউস হোল্ড লেভেল ইন মিড ২০২৫' শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি)।
যেখানে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি এবং আয়-ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, দেশের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ৩৩ হাজার ২০৭ জনের মতামতের ভিত্তিতে করা হয়েছে গবেষণাটি।
পিপিআরসি'র গবেষণা অনুযায়ী, দেশের দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৭.৯৩ শতাংশে। যা ২০২২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যায় ব্যুরোর কথা প্রতিবেদনের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
এছাড়া দারিদ্র্য সীমার বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে অন্তত ১৮ শতাংশ এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে যারা হঠাৎ যেকোনো দুর্যোগে দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের মানুষের আয় কমেছে কিন্তু খরচ বেড়েছে। আর অপেক্ষাকৃত গরিব পরিবারগুলো আয়ের চেয়ে বেশি খরচ করে ঋণের বোঝা বাড়াচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি পরিবারে মোট খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশই যাচ্ছে খাবারের পেছনে। একই সাথে দ্রুত বাড়ছে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ও।
পিপিআরসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ঘুষ কিছুটা কমলেও বন্ধ হয়নি। বরং সরকারি অফিসে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা।
এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা খাতের নানা অনিয়মের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে এই গবেষণায়। এর পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী রোগের শঙ্কা, খাদ্য নিরাপত্তায় ধারাবাহিক ঝুঁকি এবং আয় বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
গত এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' শীর্ষক এক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি ও সার্বিকভাবে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কা জানানো হয়েছিল।
সেখানেও দাবি করা হয়েছিল, চলতি বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসার সম্ভবনা নেই। বরং এ বছর বাংলাদেশে আরও ৩০ লাখ মানুষ অতি দারিদ্র্যের মধ্যে পড়বে।
সেখানে অবশ্য বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক নয় শতাংশে পৌঁছাতে পারে ধারণা দেয়া হয়েছিল।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, করোনা মহামারির পর দেশে যে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছিল তা অতীতের সরকার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছিল। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতাও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধিতে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি সহায়তার অভাব-অব্যবস্থাপনা এই তিনটি বিষয়কে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "দারিদ্য বিমোচনে আমাদের অগ্রগতি যেটা হয়েছিল, সেটা তো মুছে গেছেই বরং নতুন করে বড় ধরনের একটা দারিদ্র বৃদ্ধির অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।"
অস্বস্তিতে সাধারণ মানুষ
বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে আয়-ব্যয়ের হিসেব মেলাতেই ব্যস্ত সাধারণ মানুষ। সরেজমিনে রাজধানীর রামপুরা এবং ভাটারা বাজার পরিদর্শন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে এমনই দৃশ্যপট।
মঙ্গলবার সকালে ভাটারা বাজারে গিয়েই চোখে পড়লো সবজির দাম নিয়ে দুই ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি। যা কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বন্দ্বে পরিণত হলো।
ওই ক্রেতা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ছোট্ট এক আটি শাকের দাম চল্লিশ টাকা হয় কী করে? প্রতিটা সবজির দাম বেশি, পটল ৮০ টাকা, বরবটি একশ টাকা। পাশ থেকে ওই ব্যবসায়ীও তার যুক্তি দিতে থাকেন। "কি করমু, কেনা বেশিতে তাই বিক্রিও বেশিতে," বলেন ওই ব্যবসায়ী।
ভাটারা থানার সামনে ভ্যানের ওপর ফল বিক্রি করেই সংসার চালান মিলন মাহমুদ। তিনি বলছেন, "মানুষ না কিনলে আমার ইনকাম হইব ক্যামনে, পয়সা পাতি হাতে নাই, মানুষ কম কেনে।"
কিছুটা এগিয়ে নতুনবাজারের বাঁশতলা এলাকায় চোখে পড়লো ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবি'র গাড়ি ঘিরে কয়েকশ মানুষের হট্টগোল। কিছুটা কম মূল্যে পণ্য কিনতে কড়া রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে আছেন অনেকেই।
তিন বছরের সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সকাল থেকে সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সালেহা বেগম। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "বাজার থেইকা কিনই্যা খামু কেমনে, যে দাম। খালি আলুর দামটা একটু কম আছে, মাছ-মাংস তো খাওয়াই বন্ধ কইরা দিছি।"
"চাল, ডাল, সবজি কিংবা মাছ-মাংস সব কিছুর দামই তো একটু একটু করে বাড়তাছে কিন্তু আমার আয় তো বাড়ে না," বিবিসি বাংলাকে বলেন রাজমিস্ত্রী মোহাম্মদ রুবেল।
অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন
করোনা মহামারির পর থেকেই দেশের অর্থনীতিতে শঙ্কার কথা বলছিলেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজা সংকটের কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল স্বল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট আগে থেকেই চাপে থাকা অর্থনীতিকে আরো জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
তারা বলছেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঠামোগত তেমন পরিবর্তন না হওয়া, প্রকৃত মজুরী কমা, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া- এসবের কারণে দরিদ্রতা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ছয় মাস পরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্যের দাম কমা শুরু হলেও বাংলাদেশের বাজারে ক্রমাগতভাবে বেড়েছে।"
অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. সেলিম রায়হান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "নতুন করে একটা বড় সংখ্যক মানুষ যে দারিদ্র্য সীমার নিচে পড়ে গেছে তার একটা বড় কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। পাশাপাশি এই সময়ে মানুষের কর্মসংস্থান যেমন তৈরি হয়নি, বাড়েনি প্রকৃত আয়। অথচ প্রতিনিয়ত দ্রব্যের অধিক মূল্য তাদেরকে দিতে হচ্ছে," বলেন মি. রায়হান।
তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি না কমলেও অতীত বিবেচনায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে বলেই মনে করেন মি. রায়হান।
গত এক বছরে ১২-১৪ শতাংশ থেকে কমে এখন ৮-৯ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, তারপরও মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক বেশি বলেও মনে করেন তিনি।
সামাজেক সুরক্ষা খাতে সরকারকে গুরুত্ব দিতে বলছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে সুষমভাবে সহায়তা পৌঁছাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলছেন, সামাজিক সুরক্ষা খাতে অতীতের তুলনায় বরাদ্দ কিছুটা কমেছে। এছাড়া সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রেও অনেক অনিয়ম রয়েছে।
"ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা থাকায় সরকার যতটা ব্যয় করছে, যাদের উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে তাদের কাছের পৌঁছাচ্ছে না" বলেন মি. হোসেন। তিনি বলছেন, "দরিদ্রদের পাশে দাড়াতে হলে সহায়তা কর্মসূচির আওতা, ভাতা এবং দক্ষতা তিনটিই বাড়াতে হবে।"
দারিদ্রের হার বৃদ্ধি দেশের এলডিসি গ্রাজুয়েশনের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা তৈরি করবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তবে, "এই উত্তোরণের জন্য আমরা প্রস্তুত কিনা এটা পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। রপ্তানি বহুমুখিকরণের জন্য আমরা কতটা অগ্রগতি করতে পেরেছি, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কতটা বাড়াতে পেরেছি এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এলডিসি উত্তোরণের পরেই আমরা বড় প্রতিযোগীতায় পড়বো," বলেন মি. রায়হান।