আদালতের হাজতখানায় বাবার কোলে শিশু, আইনে কী আছে?

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের হবিগঞ্জে আদালতের হাজতখানায় অভিযুক্ত ব্যক্তির কোলে তার নবজাতক শিশু সন্তানের একটি ছবিকে কেন্দ্র করে দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মানবিক বিষয় নিয়ে এমন ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে সমালোচনা।

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান অবশ্য দাবি করেছেন, হাজতখানায় অভিযুক্তের কাছে বাচ্চাকে দেওয়ার জন্য বা ছবি তোলার জন্য নয় বরং ওই দুই সদস্যকে দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে বরখাস্ত করা হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে মি. রহমান বলেন, "আদালতে হেফাজতে থাকাকালীন তার কাছে কোনো কিছু দেওয়া বা ছবি তোলা নিষেধ। নিউবর্ন(নবজাতক) বেবিকে বাবা দেখতে পারে, এটা খুবই মানবিক বিষয়।"

" একটু উল্টা করে বলি আজকে এটা যদি বেবি না হয়ে বিষের বোতল, বিস্ফোরক বা আগ্নেয়াস্ত্র হতো? তার মানে যাদেরকে সাসপেন্ড করা হয়েছে তারা সব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে " বলেন পুলিশ সুপার।

এই পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, বাচ্চার বিষয়টি খুবই মানবিক বিষয়। এ নিয়ে পুলিশের কোনো আপত্তি নেই।

তবে ঘটনা কি ঘটেছে সে বিষয় জানতে তাদের ক্লোজ করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি জাকির হোসেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি অধিকারেই অনুমতি সাপেক্ষে তার সাথে কেউ সাক্ষাৎ করতে পারবেন। এটা বেআইনি নয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "কোর্ট পুলিশের অনুমতি নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সাথে আইনজীবী বা পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে পারেন। এতে অভিযুক্তের আইনি অধিকার রয়েছে। এটা বেআইনি নয়।"

বিবিসি বাংলার যত খবর

কী ঘটেছে আদালতে?

হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় করা একটি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি জাকির হোসেনকে গত সোমবার আদালতে হাজির করা হয়েছিল।

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, সেদিন বাবার সাথে পরিচয় করাতে নবজাতক শিশুকে নিয়ে আসেন তার স্ত্রী।

মি. হোসেন এ সময় হাজতখানার দায়িত্বে থাকা দুই জন পুলিশের সদস্যের অনুমতি নিয়ে শিশুটিকে কোলে তুলে নেন।

কোর্ট পুলিশের ইন্সপেক্টর শেখ নাজমুল হকও বিবিসি বাংলাকে জানান, প্রত্যাহার হওয়া দুই পুলিশ সদস্যের অনুমতি নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি তার শিশুকে কোলে নেন।

সাধারণত পুলিশের অনুমতি নিয়েই আদালতের হাজতখানায় থাকা অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে পরিবারের সদস্যরা দেখা করে, খাবার দেয় এমন প্র্যাকটিস রয়েছে বলে জানান মি. হক।

কিন্তু এই ঘটনায় বিষয়টি সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

হবিগঞ্জের ওই হাজতখানার প্যাটার্ন ভিন্ন দাবি করে মি. হক জানান শিশুটিকে বাবার কোলে দেওয়ার পাশাপাশি তার স্ত্রী এবং আরো তিন -চারজন ব্যক্তিও ওইদিন সেখানে প্রবেশ করেছিলেন।

বিবিসি বাংলাকে মি. হক বলেন, "এই ঘটনাটা একটা বিদঘুটে ঘটনা। এখানে ছবিটা কোথা থেকে কি আসছে। খুঁজে পাচ্ছি না কার মোবাইলে আছে? এটার ডিটেইলস আমাদের কাছে নাই। আমার কথা হলো বাচ্চা যাবে। কিন্তু আমরা মেসেজ (তথ্য) পাইলাম এখানে আরো অনেক লোকজন ছিল।"

অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে পর্যায়ক্রমে দেখা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু তার স্ত্রীসহ আরও তিন – চারজন ব্যক্তিকে সেখানে ঢুকতে দেয়ার কারণেই তদন্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি মি. হকের।

"আমরা যেটা শুনলাম অনেক লোক ঢুকাইছে। অন্য কিছু ঘটনা আছে। এটাতো আমাদের জন্য একটা রিস্ক। হুট করে কাউরে ঢুকায়া কোন সময় কি ঘটনা ঘটে। আবার ছবিও তুলেছে পুলিশ বলতে পারে না। তার মানে নিরাপত্তার কিছুটা ঘাটতি মনে করছে," বলেন মি. হক।

এদিকে, ঘটনার দিন হাজতখানার দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে ক্লোজ করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।

তাদের একজন কোর্ট পুলিশের এ এস আই সবুজ চন্দ এবং অপর জন কনস্টেবল উজ্জ্বল মিয়া।

একই সাথে ঘটনাটি তদন্ত করতে দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।

মি. রহমান জানান, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি অধিকার এখন আরো সহজ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু এই ঘটনার ক্ষেত্রে ঠিক কি ঘটেছে তা জানতেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মি. রহমান জানান, এখন গ্রেফতার করার বারো ঘণ্টার মধ্যে তার পরিবারকে জানানো, আইনি সহযোগিতা দেওয়ার বিধান করা হয়েছে।

আইনি বিধান ছাড়াও এটি অত্যন্ত মানবিক বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

"দেখা করার, আইনি পরামর্শ নেওয়ার এখতিয়ারটি সবসময় আছে। আইনজীবীরা নিজেরা পারবেন। এগুলোতো অনেক বেশি মানবিক" বলেন মি. রহমান।

কিন্তু এই ঘটনার ক্ষেত্রে অন্য কিছু ঘটেছে বলে জানান তিনি।

মি. রহমান বলেন, "এটা জানতে চাচ্ছি যে আসলে এখানে পুলিশ অনুমতি দিয়েছিল কি না, বা অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কিনা। এটা জানতেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমাদের কাছে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। এটা পরিষ্কার হওয়ার জন্যই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।"

অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এমন প্রশ্ন করলে পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জানান, এই 'ফ্যাক্ট' জানার জন্যই তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শুধু ছবি প্রকাশ পাওয়াতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, বিষয়টি এমন নয় বলে দাবি করেন তিনি।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে গত পাঁচই অগাস্টের পরে ওই মামলাটি হয়েছিল। এই মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।

হবিগঞ্জ শহরের কোর্ট জামে মসজিদের সামনে থেকে গত ১৫ই জানুয়ারি তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ধরে নিয়ে গিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। পরে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে হাজতে দেখা করা যায়? আইন কি বলে?

জেল কোড এবং ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডার নামের দুই খণ্ডের বইয়ে হাজতি ব্যক্তিদের আইনি অধিকারের বিষয়টি রয়েছে বলে জানান আইনজীবীরা।

মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, আদালতের হাজতখানার দায়িত্বে থাকা পুলিশের অনুমতি নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে তার পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে পারেন।

তবে হবিগঞ্জের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

"এখানে রাজনৈতিক পরিচয় থাকায়, ওই ব্যক্তি ছাত্রলীগ করায় পুলিশকে ক্লোজ করা হয়েছে। কিন্তু যদি সাধারণ কোনো ব্যক্তি হতো তাহলে তার ক্ষেত্রে এটা হতো না। কারণ এটার তো বিধান আছে," বলেন মি. মোরসেদ।

এখন যারা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ করে তাদের ক্ষেত্রে আইনের ব্যতিক্রম ঘটছে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

বিবিসি বাংলাকে মি. মোরসেদ বলেন, "রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যারা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ করে তাদের জন্য তো আইনটা একটু ব্যতিক্রম হচ্ছে এখন।"

"তাদের ক্ষেত্রে আইনটা আইনের মত প্রয়োগ হচ্ছে। যেটা প্রতিহিংসামূলক অথবা কঠিন হওয়া দরকার এমন করা হচ্ছে। প্রটেক্টেড এরিয়া (সুরক্ষিত এলাকা) হাজতখানায় কেউ পুলিশের অনুমতি ছাড়া জোর করে ঢুকতে পারবে না," মন্তব্য করেন মি. মোরসেদ।

তবে সুপ্রিম কোর্টের আরেকজন আইনজীবী শিশির মনির অবশ্য বলছেন, হাজতে থাকা ব্যক্তির সাথে কেউ দেখা করতে চাইলে বা খাবার বা অন্য যে কোনো বিষয় সম্পর্কে আদালতের অনুমতি নিতে হবে।

তিনি জানান, উদাহরণস্বরূপ বই নিয়ে যাওয়া, আত্মীয়-স্বজন দেখা করা, আইনজীবীর সাথে কথা বা অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে বসে খেতে চাওয়া, এমন যে কোনো বিষয় বিবেচনা করবে আদালত।

এই স্ট্যান্ডার্ড আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বলে উল্লেখ করেন এই আইনজীবী।

অভিযুক্ত ব্যক্তি যখন আদালতের কাস্টডিতে থাকবে তখন সব কিছুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আদালতের।

আর যখন কোনো ব্যক্তি থানায় থাকবে তখন 'পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল' অনুযায়ী ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার পুলিশের বলে জানান মি. মনির।

মি. মনির বিবিসি বাংলাকে বলেন, "অভিযুক্ত ব্যক্তি যখন কোর্ট কাস্টডিতে থাকবে তখন কোর্টের অর্ডার সাপেক্ষে দেখা করার অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু যখন থানা পুলিশের কাছে থাকবে, তখন তার বিষয়ে পুলিশ সিদ্ধান্ত নেবে।"