কোটা-বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল বিভিন্ন ক্যাম্পাস, সঙ্গে অবরোধ ও যানজট

ছবির উৎস, Tanvir Ibne Mobarak
সরকারি চাকরিতে কোটা-পদ্ধতি বাতিল, ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহাল-সহ মোট চার দফা দাবিতে চতুর্থ দিনের মতো কোটা-বিরোধী আন্দোলন চলছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
দেশের কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলেছে। এতে করে ঢাকা-সহ সারা দেশের বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কে ঘণ্টাব্যাপী তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের সকল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
তবে পাঁচই জুলাই, মানে আগামিকাল শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় ওইদিন সারা দেশে আন্দোলন বন্ধ থাকবে।
শনিবার বিকাল তিনটা থেকে দেশের সকল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল হবে এবং তার পরদিন সকল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও ধর্মঘট দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

ছবির উৎস, Nur Mohammad Bayezid
বৃহস্পতিবারের কোটা-বিরোধী আন্দোলন
বৃহস্পতিবার ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে আন্দোলন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শের-এ-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-সহ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরাও।
এদিন বেলা ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশেপাশের কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা মিছিল শুরু করে। পরে তারা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়, যা চলে এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী শাহবাগ মোড়ে জড়ো হওয়ায় রাস্তাঘাটে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছিল।
“কিন্তু আমরা এম্বুলেন্সের যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি” বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ সালেহীন অয়ন।
এদিন শাবিপ্রবিতেও সকাল ১১টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এদিন আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। তাদের এই আন্দোলনের কারণে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত তীব্র যানজট হয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মিলে এদিন দুপুর ১২টা সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে অবস্থান নেয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও কয়েক হাজার শিক্ষার্থী কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। তারা সকাল ১০টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলমান রাখে।
এদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এক ঘণ্টা ধরে বন্ধ রাখেন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কও। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে বন্ধ থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও আশেপাশের শিক্ষার্থীরা তাঁতিবাজারে এলাকায়, শের-এ-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকার আগারগাঁও-এ আন্দোলন করে।

ছবির উৎস, Md. Hasanuzzaman
কোটা নিয়ে ঝামেলার শুরু যেখানে
২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল বাংলাদেশে। তার মাঝে ৩০ শতাংশই ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা।
বাকি কোটার মাঝে ১০ শতাংশ নারী কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ৫ শতাংশ কোটা ছিল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য এবং এক শতাংশ কোটা ছিল প্রতিবন্ধীদের।
ওই বছরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল যে কোটা ৫৬ শতাংশ না হয়ে ১০ শতাংশ করা হোক।
তাদের দাবির মুখে সে বছর পুরো কোটা পদ্ধতিই বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
কিন্তু ২০২১ সালে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ফিরে পাবার জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেন এবং গত পাঁচই জুন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট।
তারপর হাইকোর্টের ওই রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। বৃহস্পতিবার সকালে কোটার পক্ষের এক আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানি করেনি আদালত।
সুতরাং, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এই রায় স্থগিত না করায় পূর্বের নিয়মানুযায়ী সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা আপাতত বহাল রয়েছে ।

ছবির উৎস, Tariq Hossain
আন্দোলনকারীদের প্রতিক্রিয়া
হাইকোর্টের ওই রায়ের পর গত ছয় জুন থেকেই তা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে কিছুদিন আন্দোলন চললেও মুসলিমদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আজহা চলে আসায় ২৯শে জুন পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখেন শিক্ষার্থীরা।
এরপর গত ৩০শে জুন থেকে ফের আন্দোলন শুরু করেন তারা এবং পহেলা জুলাই থেকে এই আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
“একটা চাকরিতে ১০০ আসন থাকলে ৫৬টি যদি রিজার্ভ থেকে যায়, তাহলে বাকী ৪৪টা সিটে আমরা ১০ হাজার মানুষ লড়াই করব। আর ঐ ৫৬টি সিটের জন্য তারা মাত্র দুই তিন হাজার জন লড়াই করবে। সাধারণ জনগণ তো এভাবে বৈষম্যের শিকার হতে পারে না”, বলছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নূর মোহাম্মদ বায়েজিদ।
তিনি আরও বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ কোটা, এটা মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের পর্যন্ত মানা যায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের পর্যন্ত মানা যায় না। আগে যখন আমরা পাকিস্তানের অধীনে ছিলাম, তখন পাকিস্তানিরা আমাদের চেয়ে বেশি কোটা নিতো। কিন্তু এখন স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা বেশি কোটা নেয়।”
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Masud Parvez
এই শিক্ষার্থী মনে করেন, এভাবে চললে “সাধারণ মানুষকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।”
এ প্রসঙ্গে শাবিপ্রবি-সহ দেশের প্রায় দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিবিসির কথা হয়েছে। তাদের সবারই বক্তব্য কম-বেশি একই রকম, তারা কেউ মুক্তিযোদ্ধা কোটা চান না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাসেল আহমেদ প্রশ্ন করেন, ‘দুই শতাংশ লোকের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা কীভাবে যৌক্তিক হয়?”
শিক্ষার্থীরা সমতার পক্ষে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কোটা পুনর্বহাল করার মাধ্যমে তো সুযোগের সমতা থাকল না। সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ খেলাপ করা হচ্ছে।”
মাত্র কয়েক শতাংশ মানুষের জন্য “৩০ শতাংশ কোটা কীভাবে সম্ভব?”, এই প্রশ্ন রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা-পদ্ধতি সংস্কার আন্দোলনের সংগঠক আশিক উল্লাহ মুহিবও।

ছবির উৎস, Abdullah Salehin Oyon
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারিক হোসেন বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীরা কখনওই চাই না যে পড়াশুনা বাদ দিয়ে সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলন করব।”
“কিন্তু আমাদের কিছু করার নাই। কারণ যে পরিমাণ কোটা, তাতে পড়াশুনা করেও আমাদের ভবিষ্যৎ কী?”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদ সিয়াম বলেন হাইকোর্ট যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষে যে রায় দিয়েছে, “তা যতদিন পর্যন্ত বাতিল না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।”
এই শিক্ষার্থী মনে করেন, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের যে প্রক্রিয়া, তাতে মেধাবীরা সুযোগ পাচ্ছে না।
“মেধাবীরা গুরুত্ব না পেলে তারা দেশের বাইরে চলে যাবে, দেশে কাজ করার আগ্রহ হারাবে। তাই এত বছর পরে এসে কোটার এই চাহিদা কমিয়ে আনা দরকার”, বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Ashik Ullah Muhib
শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি
কোটা পদ্ধতির সংস্কারের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি জানিয়েছে। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এই দাবিগুলো তুলে ধরছে।
এর মধ্যে রয়েছে- ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি সংস্কার করা এবং কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধা কোটায় শূন্যপদ পূরণ করা, একজন ব্যক্তি যেন তার জীবদ্দশায় সব ধরনের সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একবার কোটা ব্যবহার করতে পারে, প্রতিটি জনশুমারির সাথে অর্থনৈতিক সমীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যমান কোটার পুনর্মূল্যায়ন নিশ্চিত করা, দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মি. সিয়াম-সহ সকলেই বলেন, "অনগ্রসর মানুষদেরকে কোটা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এর বাইরে কোনও সম্মানসূচক কোটা থাকবে না।”








