আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
১৩ হাজার কোটি টাকা প্রতারণায় অভিযুক্ত মেহুল চোকসিকে ভারতে কি আনা যাবে?
ভারতের সরকারি ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার কোটিরও বেশি টাকা প্রতারণা করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া হীরে ব্যবসায়ী মেহুল চোকসি বেলজিয়ামে ধরা পড়েছেন। এখন ভারত চেষ্টা করছে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে।
মি. চোকসি ও তার ভাগ্নে নীরব মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তারা রাষ্ট্রায়ত্ত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১৩৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করেই দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআইয়ের অনুরোধের পরে বেলজিয়ামের পুলিশ গত শনিবার মি. চোকসিকে আটক করেছে।
সেখান থেকে তাকে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে সিবিআই।
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের এই বড়সড় আর্থিক প্রতারণার ঘটনাটি ২০১৮ সালে প্রকাশ্যে এসেছিল।
এই তছরুপে নীরব মোদী, তার স্ত্রী এমি, ভাই নিশাল এবং তার মামা মেহুল চোকসি প্রধান অভিযুক্ত।
ব্যাংকের তরফে অভিযোগ ছিল যে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে তাদের এত বড় ক্ষতি করেছেন এরা।
এই প্রতারণাকে ভারতের সবথেকে বড় অঙ্কের ব্যাংক দুর্নীতি বলে মনে করা হয়।
যেভাবে পালিয়েছিলেন চোকসি আর মোদী
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক বা পিএনবি-তে যে বড়সড় আর্থিক তছরুপ হয়েছে, সেই কথা বেঙ্গালুরুর এক ব্যবসায়ী হরি প্রসাদ এসভি চিঠি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে জানিয়েছিলেন ২০১৮ সালে।
তার আগেই অবশ্য মেহুল চোকসি এবং নীরব মোদী দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন।
ভারতের অর্থনীতি সংক্রান্ত সংবাদপত্র ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখেছে, "ভারত থেকে পালিয়ে চোকসি প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে অ্যান্টিগুয়াতে চলে যান। দেশ ছাড়ার এক বছর আগেই তিনি অ্যান্টিগুয়ার নাগরিকত্ব নিয়ে রেখেছিলেন।"
মি. চোকসির সঙ্গেই দেশ ছেড়েছিলেন একই দুর্নীতিতে অভিযুক্ত তার ভাতিজা নীরব মোদীও।
মি. মোদী এক বছর পালিয়ে থাকার পরে লন্ডনে মেট্রোপলিটান পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ভারতে যাতে তাকে না প্রত্যর্পিত করা হয়, সেজন্য তখন থেকেই আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মি. মোদী।
এখনও তিনে হেফাজতেই আছেন, তবে তার কাছে প্রত্যর্পণ থেকে বাঁচার আর বিশেষ আইনি রাস্তা খোলা নেই।
ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী মেহুল চোকসি অ্যান্টিগুয়া থেকে কিউবাতে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন ২০২১ সালে। কিন্তু ডমিনিকাতে আটক হন।
নাটকীয়ভাবে তার আইনজীবিরা তখন অভিযোগ করেছিলেন যে ভারতীয় এজেন্টরা তাকে অপহরণ করার চেষ্টা করেছিল।
তাকে ফেরত পাঠানো হয় অ্যান্টিগুয়াতে।
এর আগেই এই দুই পলাতক হীরে ব্যবসায়ীর নামে ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিস জারি হয়েছিল।
ফিনান্সিয়াল টাইমস জানাচ্ছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যদিও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন, তবে ২০২৩ সালে ইন্টারপোল মেহুল চোকসির বিরুদ্ধে জারি হওয়া রেড কর্নার নোটিস প্রত্যাহার করে নেয়।
বেলজিয়ামে কেন মেহুল চোকসি?
অ্যান্টিগুয়া থেকে বছর কয়েক আগে ক্যান্সারের চিকিৎসা করানোর নাম করে বেলজিয়ামে চলে আসেন মেহুল চোকসি। তার স্ত্রী প্রীতি চোকসি বেলজিয়ান নাগরিক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে যে ভুয়া নথি দিয়ে বেলজিয়ামের 'এফ-রেসিডেন্সি কার্ড' পেয়েছিলেন মি. চোকসি এবং সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি।
যদিও কিছু সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে যে মি. চোকসির প্রতিটা চলাফেরার ওপরে নজর রেখেছিল ভারতের এজেন্সিগুলি। কয়েকমাস ধরেই বেলজিয়ামের প্রশাসনকে তারা বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে ভারতে তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, তার বিচারের জন্য প্রত্যর্পণ দরকার।
আবার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সংবাদ ওয়েবসাইট অ্যাসোসিয়েট টাইমস এবছর ২০ মার্চ তারিখে এক প্রতিবেদনে লিখেছিল যে তারা সূত্রের মারফত নিশ্চিত হয়েছে যে মেহুল চোকসি বেলজিয়ামের 'এফ রেসিডেন্সি' পেয়েছেন এবং সুইজারল্যান্ডে পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়, "২০২৩ সালের ১৫ই নভেম্বর এফ রেসিডেন্সি কার্ড পেয়েছিলেন মেহুল চোকসি। গোটা প্রক্রিয়ায় বেলজিয়ান নাগরিক তার স্ত্রী সহায়তা করেছেন। ভারত এবং অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় যে ব্যাপক প্রতারণা করেছেন তিনি, তারপরেও মি. চোকসি বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া নথি দিয়ে বেলজিয়ামের রেসিডেন্সি জোগাড় করেছেন বলে সূত্রগুলি নিশ্চিত করেছে।"
তাকে যাতে ভারতে প্রত্যর্পণ না করা হয়, সেজন্যই তিনি আবারও পালানোর চেষ্টা করছিলেন বলে অ্যাসোসিয়েট টাইমস জানিয়েছে।
তবে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের একাংশে এরকম তথ্য দেওয়া হচ্ছে যে গ্রেফতারির সপ্তাহ দুয়েক আগেই মাত্র মেহুল চোকসি বেলজিয়ামের 'এফ-রেসিডেন্সি' জোগাড় করেছিলেন।
প্রত্যর্পণ কী সম্ভব?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা যাচ্ছে যে, বেলজিয়ামের সঙ্গে ভারতের মধ্যে ১৯০১ সাল থেকেই বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। ওই চুক্তিটি ব্রিটিশ ভারত সরকারের সঙ্গে হলেও তা এখনও বলবত আছে।
তবে সংবাদ সংস্থা এএনআই মি. চোকসির আইনি উপদেষ্টাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে যে এখন তারা তার জামিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রত্যর্পণেরও বিরোধিতার করা হবে আইনি পথেই, এমনটাও জানাচ্ছে এএনআই।
তার আইনি উপদেষ্টারা জানাচ্ছেন যে অন্যান্য বিষয় ছাড়াও তার অসুস্থতার কারণটাই প্রত্যর্পণ রুখতে সবথেকে বড় কারণ হিসাবে তারা ব্যবহার করবেন।
তবে পিএনবি-র এই বিপুল তছরুপ যিনি প্রথম প্রকাশ করেছিলেন, সেই হরি প্রসাদ এসভি সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন, "মেহুল চোকসির গ্রেফতারি শুধু ভারতের জন্য নয়, যেসব মানুষ ও সংস্থার সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন, সবার জন্যই এটা সুসংবাদ। কিন্তু তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা অতটা সহজ হবে না কারণ তার কাছে তো ব্যাগ ভর্তি টাকা। বিজয় মালিয়ার মতোই সেরা আইনজীবী নিয়োগ করবে প্রত্যর্পণ আটকানোর জন্য।"
আরও যেসব শিল্পপতি প্রতারণা করে পালিয়েছেন
যে কয়েকজন কথিত শিল্পপতি বড় অঙ্কের প্রতারণা করে ভারত ছেড়ে পালিয়েছেন তাদের মধ্যে এক নম্বর নামটা মেহুল চোকসিরই আর দ্বিতীয়জন হলেন একই প্রতারণায় তার সঙ্গী, তার ভাগ্নে নীরব মোদী।
মেহুল চোকসি তার বাবা হীরে ব্যবসা নিজের হাতে নিয়েছিলেন ১৯৮৫ সালে। তারপর থেকে তার সংস্থা 'গীতাঞ্জলি জেমস' সারা ভারতে প্রায় চার হাজার দোকান খুলেছিল।
মেহুল চোকসি আর তার ভাগ্নে নীরব মোদীদের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে হীরে ব্যবসায় জড়িত।
এরা দুজনে একসময়ে একই সংস্থায় জড়িত ছিলেন, কিন্তু নীরব মোদী পরে নিজের হীরের কারবার শুরু করেন।
এই দুজনের পরেই যে ভারত থেকে পলাতক যে প্রতারকের নাম আসে, তিনি হলেন বিজয় মালিয়া।
'লিকার ব্যারন' বলে পরিচিত ও কিংফিশার এয়ারলাইন্সের মালিক মি. মালিয়া ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে চলে গিয়েছিলেন।
কিংফিশার এয়ারলাইন্সের নাম করে ভারতীয় ব্যাংকগুলি থেকে প্রায় নয় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি।
তবে ঋণ পরিশোধ না করেই দেশ ছাড়েন তিনি।
ভারত সরকার তখন থেকেই যুক্তরাজ্যের আদালতে আইনি লড়াই চালাচ্ছে যাতে বিজয় মালিয়াকে ফেরত আনা যায়।
এদিকে মি. মালিয়ার সব সংস্থাগুলিই হয় বন্ধ হয়ে গেছে, নয়তো মালিকানা বদল হয়েছে।
এর পরেই আসে আইপিএলের প্রবর্তক ও ক্রিকেট সংগঠক ললিত মোদীর নাম।
আইপিএলের ২০১০ সালের নিলামে কারসাজি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও সম্প্রচার ও ইন্টারনেট 'রাইটস' বেআইনিভাবে বিক্রি করারও অভিযোগ আছে।
তিনি সবসময়েই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
ওইসব অভিযোগের পরেই তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান।
ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড বা বিসিসিআই ২০১৩ সালে মি. মোদীকে সব ধরনের ক্রিকেটীয় কার্যকলাপ থেকে ব্যান করে দিয়েছে।