ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলের চির বিদায়ের শোক হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে হঠাৎ একটি খবরে ফেসবুক সয়লাব, ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে মারা গিয়েছেন।
পরক্ষণেই বেরিয়ে আসে এই খবরের কোন সত্যতা নেই, এটি গুজব।
কিন্তু ওই একটি মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষ অনুভব করেছিল হঠাৎ মহা মূল্যবান কিছু হারানোর গভীর বিষাদ থেকে মুহূর্তেই সেটি ফিরে পাওয়ার আনন্দ অনুভূতিটা কেমন হয়।
ওই একদিন, কয়েক ঘণ্টা বিশ্বকাপের বাইরে মুখ্য আলোচনা হয়ে উঠেছিল পেলে কেমন আছেন।
পেলে ভালো ছিলেন না। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। যাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল কোলন ক্যানসার।
লড়াই করে করে বেশ কয়েক বছর টিকে গেলেও বয়সের ভারে শেষ পর্যন্ত ৮২ বছর বয়সে বিদায় জানাতে হল তাকে।

ছবির উৎস, Getty Images
পেলে ভক্তদের শোক
বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরা যেখানে বিভিন্ন দেশ ও ক্লাবের সমর্থনে বিভক্ত, সেখানে তারাই পেলের মৃত্যুতে তাকে অমরত্বের আখ্যা দিয়েছেন কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই।
বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীদের টাইমলাইন জুড়ে শুধুই তার শোক বার্তার নানা কথা।
অথচ এই ভক্তদের বেশিরভাগ কখনও পেলের খেলা সরাসরি দেখার সুযোগ পাননি। তারা জন্মেছেন অনেক পরে।
এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বাংলাদেশে পেলে ভক্তের সংখ্যা শুধুই বেড়েছে।
তার অনবদ্য ফুটবল ক্যারিয়ার জায়গা করেছে বাংলাদেশের পাঠ্য বইতে।

ছবির উৎস, Getty Images
আধুনিক ফুটবলের প্রতিভূ
কিন্তু ফুটবল যে দেশের ক্রীড়া অঙ্গনে এতোটা দাপুটে অবস্থানে আসতে পারেনি, যে পেলের জন্ম আরেক মহাদেশে, তাকে নিয়ে বাংলাদেশে কেন এতো বন্দনা? তার মৃত্যুর শোক কেন ছেয়ে ফেলেছে বাংলাদেশের ভক্তদের?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয় বর্তমান প্রজন্মের কয়েকজন পেলে ভক্তের সাথে।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যায় বড়দের মুখে শুনে, বইয়ে পড়ে কিংবা বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপস দেখে তারা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন পেলে নিছক কোন ভালো খেলোয়াড় নন।
ফুটবলের জন্মই হয়েছে পেলের স্পর্শ পাবে বলে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং ফুটবল ভক্ত সৈয়দ ফাইয়াজ আহমেদ পেলেকে ব্যাখ্যা করেছেন মডার্ন ফুটবলের প্রতিভূ হিসেবে।
“পেলের খেলা দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। কিন্তু তার ব্যাপারে আমি পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি। বাবা, চাচাদের কাছে গল্প শুনেছি এবং বেশ কিছু ভিডিও দেখা হয়েছে,'' তিনি বলেন।
''সেখানে একটা বিষয় স্পষ্ট আজকের মেসি, নেইমার, রোনালদো কিংবা জিদানের যতো বিশেষ দক্ষতা আছে তার সবটাই ছিল পেলের মধ্যে। এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর একটা ব্যাপার।”

ছবির উৎস, Getty Images
ফুটবলের শৈল্পিক রূপ
পেলের খেলা দেখার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশের সাবেক ফুটবলার গোলাম সারওয়ার টিপুর।
সে সময় বাংলাদেশে টেলিভিশন সেট ছিল হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারে। তার ওপর সরাসরি সম্প্রচারের প্রযুক্তি তেমন আধুনিক হয়নি।
মি. সারওয়ার খেলা দেখেছেন, থার্টি ফাইভ মিলিমিটারে রেকর্ড অবস্থায়। সেখানে কয়েক মিনিটের ক্লিপগুলো দেখেছেন। সেই থেকেই তার খেলার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন পেলে।
তার কাছে পেলে হলেন শৈল্পিক ফুটবলের জাদুকর।
“ফুটবলকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন পেলে, তার আগে-পরে অনেক ভালো খেলোয়াড় এসেছে কিন্তু পেলে একজনই। তার সাথে কারও তুলনা চলে না,'' তিনি বলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ব্রাজিল সমর্থক গোষ্ঠী
পেলের সেই শৈল্পিক ছন্দে মোহাবিষ্ট ছিলেন পাক্ষিক ক্রীড়াজগত পত্রিকার সম্পাদক এবং জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক দুলাল মাহমুদ।
পেলের অনবদ্য ফুটবলের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল সমসাময়িক পত্রপত্রিকা ও বই-পুস্তক পড়ে।
বাংলাদেশে আজকের যে ব্রাজিল সমর্থক গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলকে ঘিরে এতো উত্তেজনা, পেলে এর বীজ বুনেছিলেন বলে মনে করা হয়।
তার মতে, ফুটবলে পেলের যে অসাধারণ বিস্ময়, তিনি তার দক্ষতার যে আলো ছড়িয়েছেন, সেই দীপ্তি ঠিকরে পড়েছে ১৬ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ বাংলাদেশেও।
“বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রবেশ ঘটেছে পেলের হাত ধরে। তার খ্যাতির দীপ্তি, ফুটবলে তার বিস্ময় বাংলাদেশে পৌঁছেছে,'' মি. মাহমুদ বলেন।
''তিনটি চারটি বিশ্বকাপ খেলে তিনটি ট্রফি জয় করেছেন। প্রথমটা মাত্র ১৭ বছর বয়সে। এটা ইতিহাস। এটা বিস্ময়, এমনটা সবাই পারে না।”

ছবির উৎস, Getty Images
পেলের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৩শে অক্টোবর। বাবার দেওয়া নাম এডসন আরান্তেস দি নাসিমেন্তো হলেও “পেলে” নামেই তিনি বিশ্বব্যাপী তিনি পরিচিতি পান।
শুধু ফুটবল দিয়েই নয় বরং ব্রাজিলের চরম দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে এক কৃষ্ণাঙ্গ বালকের সারা বিশ্ব জয় করা- তার এই গল্প যুগে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের অনুপ্রাণিত করেছে বলে মনে করেন মি. মাহমুদ।
অবশেষে মর্তের নক্ষত্র আকাশে ঠাঁই নিলেন ধ্রুবতারা হয়ে। অনেকটা রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লার পংক্তির মতো, “চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে, আমার না-থাকা জুড়ে”











