পাশাপাশি পাঁচটি কবরে শেষ ঠিকানা হলো তাদের

পারিবারিক কবরস্থানটিই একসঙ্গে পরিবারের সবার শেষ ঠিকানা হয়ে উঠলো

ছবির উৎস, SYED RIAD

ছবির ক্যাপশান, পারিবারিক কবরস্থানটিই পরিবারটির সবার শেষ ঠিকানা হয়ে উঠলো
    • Author, সৌমিত্র শুভ্র
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডের একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা স্তব্ধ করে দিয়েছে অনেকগুলো পরিবারকে। বৃহস্পতিবার রাতের এই দুর্ঘটনায় অনেকে পরিবারের একাধিক সদস্যকে হারিয়েছেন।

একটি পরিবারের সবাই মারা গেছেন, আছে এমন খবরও। একের পর এক মর্মান্তিক সংবাদে ওই রাতটি বিভীষিকা হয়ে থাকবে অনেকের কাছেই।

স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে পাঁচ জনের পরিবার ছিল সৈয়দ মোবারক হোসেনের। মার্চের ২২ তারিখে সবাইকে নিয়ে ইতালিতে পাড়ি জমানোর কথা ছিল তার।

তবে, সপ্তাহ তিনেক আগেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে পাড়ি জমালেন মৃত্যুর পথে।

ঢাকার বেইলি রোডের ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারান তারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় পারিবারিক কবরস্থানটিই একসঙ্গে পরিবারের সবার শেষ ঠিকানা হয়ে উঠলো।

সৈয়দ মোবারক হোসেনের চাচাতো ভাই সৈয়দ ঋয়াদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, তার সত্তরোর্ধ্ব মা আগে থেকেই অসুস্থ। ছেলে, নাতি-নাতনিদের মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি।”

বৃহস্পতিবার রাতের ওই অগ্নিকাণ্ড এমন অজস্র শোকগাঁথা লিখে গেছে।

মৃত্যুর আগে অসহায় মানুষগুলোর আকুতির কথা আর স্বজনদের আর্তনাদ উঠে আসছে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর শিরোনামে।

গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনটিতে অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট ছিল। ফলে, পরিবারের সদস্য বা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে অনেকেই দল বেঁধে যেতেন সেখানে।

যেমন গিয়েছিলেন, ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক লুৎফুন নাহার করিম এবং তার মেয়ে জান্নাতিন তাজরী। তাদের আনন্দের ক্ষণটুকু উদযাপনের এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বিষাদে পরিণত হয় পরিবারের জন্য।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে ওই রাতেই স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহে শনাক্ত করেন এম. এ. এইচ গোলাম মহিউদ্দিন।

স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের সঙ্গে সৈয়দ মোবারক হোসেনের পারিবারিক ছবি

ছবির উৎস, Family Handout

ছবির ক্যাপশান, স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের সঙ্গে সৈয়দ মোবারক হোসেনের পারিবারিক ছবি

লুৎফুন নাহার করিমের মতোই মেয়ে ভিয়াংকাকে নিয়ে ওই ভবনের কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন রুবি রায়। আগুন তাদেরও প্রাণ কেড়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন জানিয়েছিলেন, “আমাদের একজন সহকর্মীর কন্যা মারা গেছেন।”

পরে জানা যায়, পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাসিরুল ইসলামের মেয়ে লামিসা ইসলাম ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন। লামিসা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়তেন।

দু’জন গণমাধ্যমকর্মীও মারা গেছেন এ ঘটনায়।

তাদের একজন তুষার হাওলাদার। অপরজন অভিশ্রুতি শাস্ত্রী।

'দমবন্ধ' হয়ে মারা গেছে বেশিরভাগ মানুষ

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ৪৬ জনের মধ্যে ৪১ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অপর পাঁচজনের পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএন পরীক্ষা করা হবে।

তবে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর চেয়ে, ধোয়ার কারণে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে বেশির ভাগ মানুষ মারা গেছেন। মৃত্যুই আগেই ধোঁয়ায় তারা অচেতন হয়ে পড়েন। প্রাথমিকভাবে এমন তথ্যই জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগ কার্বন মনোক্সাইড নামক বিষাক্ত গ্যাস নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করার কারণে মারা গেছেন। আহতদের মধ্যেও অনেকেই এই গ্যাস নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, “একটা বদ্ধ ঘরে যখন বেরুতে পারে না, তখন এই ধোয়াটা শ্বাসনালীতে চলে যায়। প্রত্যেকেরই সেটি হয়েছে।”

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে আহতদের বেশিরভাগ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেলে ১৪ জন এবং শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে আট জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, যারা আহত রয়েছে তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

কারণ অনেকের দেহের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে। অনেকের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে।

আগুনের ঘটনায় ৬০ থেকে ৭০ জনের মতো আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এগুলো হচ্ছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট এবং রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল।

গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনটিতে অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট ছিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনটিতে অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট ছিল

আগেই সতর্ক করেছিল ফায়ার সার্ভিস

বৃহস্পতিবার রাতে পুড়ে যাওয়া ভবনটির অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিল ফায়ার সার্ভিস।

অধিদপ্তরের ওয়্যারহাউজ শাখার পক্ষ থেকে গত বছরের পাঁচ সেপ্টেম্বর একটি চিঠি পাঠানো হয় অ্যামব্রোসিয়া রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড মিউজিক ক্যাফেকে। রেস্তোরাঁটি ভবনের ছয় তলায় অবস্থিত ছিল।

চিঠিতে লেখা হয়, “আপনাদের প্রতিষ্ঠান/ভবনটি পরিদর্শন করে দেখা যায় অগ্নি ও জননিরাপত্তার দিক থেকে খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। যা আদৌ কাম্য নয়।”

কী কী ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক তাও উল্লেখ করা হয়েছিল চিঠিতে।

কিন্তু তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে জানা যাচ্ছে।

শুক্রবার সকালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি পরিদর্শনে যান।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন এ সময় সাংবাদিকদের বলেন, “এই ভবনটিতে কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছিল না।”

অগ্নি নির্বাপণ কাজে নিয়োজিতরা জানান, সিঁড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার রাখা ছিল। যার কারণে, পুরো সিঁড়িটি একটি ‘অগ্নি চুল্লিতে’ রূপ নেয়। এর ফলে নামার জন্য আর কেউ ওই সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি।