ভারতের যে গ্রামে মা-বোন তুলে গালি দিলে জরিমানা করা হয়

ছবির উৎস, Kiran Sakale
- Author, শ্রীকান্ত বাঙ্গালে
- Role, বিবিসি মারাঠী
"আমার খুব রাগ হয়। আমার মা-বোনকে কেউ এইভাবে অপমান করলে আমার সত্যিই খুব রাগ হয়। এর বিরুদ্ধে কোথাও না কোথাও কিছু একটা হওয়া খুব দরকার ছিল। আমাদের গ্রাম এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই কারণে নিজের গ্রাম নিয়ে আমি গর্বিত"
কথাগুলো বলছিলেন মহারাষ্ট্রের সৌন্দালা গ্রামের বাসিন্দা মঙ্গল চামুটে। এক দুপুরে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল আমাদের।
বর্তমানে খবরের শিরোনামে রয়েছে সৌন্দালা গ্রাম এবং তার নেপথ্যের কারণটাও কিন্তু উল্লেখযোগ্য। এই গ্রামে যারা মা-বোনকে নিয়ে গালিগালাজ করেন, তাদের জরিমানা করা হয়। এর জন্য গ্রাম পঞ্চায়েতের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে একটা প্রস্তাবও পাশ করা হয়েছে।
সৌন্দালা গ্রাম মহারাষ্ট্রের অহল্যানগর (আহমেদনগর) জেলার নেভাসা তালুকের অন্তর্গত। এই গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ১৮০০ জন।
গ্রামে ঢুকতেই আমাদের চোখে পড়ল একটা বড় ব্যানার। গ্রাম পঞ্চায়েতের তরফে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে ওই ব্যানারে স্পষ্ট ভাষায় লেখা রয়েছে।
সৌন্দালার গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসের কাছেই দেখা মিলল পঞ্চায়েত প্রধান শরদ আরগাড়ের। গ্রাম যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিষয়ে তিনি আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন।
শরদ আরগাড়ের কথায়, "আমরা যে সংকল্প নিয়েছি, তার মূল কথা হলো- এটা মা ও বোনেদের সম্মানের জন্য।"
"যে নারীর গর্ভে নয় মাস থাকার পর আমরা জন্মগ্রহণ করি তার দেহ কতটা পবিত্র। সেই পবিত্রতার অপমান করা কখনোই উচিৎ নয়। এটা রুখতে গ্রামসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে যারা এ জাতীয় গালি দেবেন, তাদের ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হবে।"

ছবির উৎস, Srikant Bangle/BBC

ছবির উৎস, Kiran Sakale
নারী ও যুবসম্প্রদায় এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গ্রামে ঘুরে বেরানোর সময় লক্ষ্য করলাম জায়গায় জায়গায় এই সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত ব্যানার লাগানো হয়েছে। সৌন্দালারই বাসিন্দাদের একজন হলেন জ্ঞানেশর শোরত। গ্রামের রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে তার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলেন।
গ্রাম পঞ্চায়েতের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমরা। এর উত্তরে মি. শোরত বললেন, "যখন বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আমরা গল্প করি তখন কথা বলতে গিয়ে অনেক সময় বিনা কারণেই একে অন্যকে মা-বোন নিয়ে গালি দিয়ে থাকি। এমন করাটা ঠিক নয়।"
"এই কারণে ঠিক নয় যে ঝগড়া হলো আমাদের দুই বন্ধুর মাঝে আর সেখানে আমরা টেনে আনলাম পুরো পরিবারকে। তাই, আমি মনে করি (গ্রাম পঞ্চায়েতের তরফে) যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটা ভালো। জরিমানা দেওয়ার ভয়ে কেউ ওদের (মা, বোনকে নিয়ে) নিয়ে গালি তো অন্তত দেবে না।"
সৌন্দালা গ্রামের নারীরা এই সিদ্ধান্তকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করেন।
এই গ্রামের বাসিন্দা জ্যোতি বোধক বলেন, "এই জাতীয় ঘটনায় আমাদের সৌন্দালার গ্রাম পঞ্চায়েত ৫০০ টাকা জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লোককে ৫০০ টাকা করে জরিমানা দিতে হলে গালি দেওয়াও কমবে।"
দুইজনকে জরিমানা
নারীদের সম্মানের কথা ভেবে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কিত প্রস্তাব গ্রামপঞ্চায়েতে গৃহীত এবং গ্রামে কার্যকর হয়েছে চলতি বছরের ২৮ই নভেম্বর। এরই মধ্যে দুইজনের কাছ থেকে গালিগালাজ করার জন্য জরিমানাও আদায় করা হয়ে গিয়েছে।
বিবিসির সঙ্গে কথোপকথনের সময়, যাদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন পঞ্চায়েত প্রধান শরদ আরগাড়ে। তার কথায়, "ক্ষেতে বাঁধ দেওয়া নিয়ে দু'জনের মধ্যে বিবাদ হয়েছিল। এর প্রভাব তাদের বাড়ি পর্যন্তও পৌঁছেছে। তারা দু'জনেই একে অপরকে গালিগালাজ করেন।"
"তবে তারা দু'জনেই কিন্তু সে কথা অকপটে স্বীকারও করেছেন।"
"পরদিন সকালে আমি বাঁধের কাছে গেলাম। ক্ষেতের বাঁধে পিলার লাগিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা। সেই সময় দু'জনেই বিবাদের সময় একে অপরকে গালি দেওয়ার কথা স্বীকার করে নেন। এরপর তাদের প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়।"
এখন প্রশ্ন হলো, কেউ যদি গালি দেওয়ার পরও জরিমানার জন্য নির্ধারিত টাকা দিতে অস্বীকার করেন সেক্ষেত্রে কী হবে? সৌন্দালা গ্রাম পঞ্চায়েত কিন্তু সেই পরিস্থিতির কথা আন্দাজ করে তার জন্যেও একটা ব্যবস্থা করেছে।
পঞ্চায়েত প্রধান আরগাড়ে বলেন, "আমরা ভেবেছি যে সবার আগে আমাদের যা করা উচিত তা হলো গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসে সেই বিষয়টাকে নথিভুক্ত করা। এরপর তাকে (যে ব্যক্তি গালি দিয়েছেন) নোটিশ পাঠাতে হবে।"
"কিন্তু নোটিশ দেওয়ার পরও যদি তিনি জরিমানার টাকা না দিতে চান, তাহলে আমাদের কিছু একটা করতে হবে।"
"সেক্ষেত্রে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে জরিমানার টাকা আদায় করতে হবে। তাদের আর কোনোরকম কাগজপত্র দেওয়া হবে না।"
নজর রাখতে সিসিটিভি
প্রায়শই দেখা যায়, যে সময় গ্রামসভা কোনও সিদ্ধান্ত নেয়, তখন গ্রামের অনেকেই হয় মাঠে কাজ করেন অথবা অন্য কোনও কাজের জন্য বাইরে থাকেন। তাই তাদের পক্ষে সব সময় গ্রামসভায় যোগ দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।
সে কথা মাথায় রেখে, গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ব্যানার লাগানো হয়েছে। যাতে মানুষ সৌন্দালা গ্রাম পঞ্চায়েতে সদ্য পাশ হওয়া এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে পারেন। এই ব্যানারের মাধ্যমে গ্রামবাসীদের মধ্যে সচেতনতাও ছড়িয়ে পড়ে।
প্রসঙ্গত, এই নিয়ম কিন্তু পুরুষ এবং নারী দু'জনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। নারী-পুরুষ ব্যতিরেকে যারাই গালি দিয়ে থাকুন, তাদের জরিমানা করা হবে। কিন্তু পুরো বিষয়টার উপর কীভাবে নজরদারি রাখা সম্ভব? এর জন্যও উপায় বের করা হয়েছে।
নজরদারির জন্য ব্যবস্থা করেছে গ্রাম পঞ্চায়েত।
পঞ্চায়েত প্রধান বিবিসিকে বলেছেন, "আমরা গ্রামের সর্বত্র সিসিটিভি লাগিয়েছি এবং সিসিটিভিতে মাইক্রোফোনও রয়েছে। সাধারণত যখন কোনও ব্যক্তি প্রকাশ্যে গালিগালাজ করেন, তখন তিনি উচ্চস্বরেই গালিগালাজ করে থাকেন। এরপর এই বিষয়টা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হবে, যাচাই করা হবে।"
"দ্বিতীয়ত যখন কোনো ঝগড়া শুরু হয় তখন তা দু'জনের মধ্যে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেখানে দশ-বারো জন জড়ো হয়। তারপর তারাই (জড়ো হওয়া ভিড়ের মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা) বলে দিতে পারবেন কে কাকে গালি দিয়েছে।"

নাবালকদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধি-নিষেধ
গ্রামবাসী মনে করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে এই ধরনের পদক্ষেপ (নারীদের অসম্মানসূচক কথা বললে জরিমানা করার সিদ্ধান্ত) গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়ন করা উচিত।
গ্রামসেবকের পদে কর্মরত প্রতিভা পিসোটে বলেন, "আমরা বড়রা যখন গালি দেই বা অনুপযুক্ত ভাষা ব্যবহার করি তখন বাচ্চারা সেটা অনুকরণ করে।"
"সুতরাং আমরা যদি নিজেদের (শুধরানো) দিয়ে শুরু করি এবং এটা (গালি দেওয়া) বন্ধ করার চেষ্টা করি তবে অবশ্যই বিষয়টার উপর লাগাম টানা সম্ভব হবে।"
নারীদের গালি দেওয়া নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি, গ্রাম পঞ্চায়েতের তরফে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টার পর্যন্ত স্কুলের পড়ুয়াদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রামের অভিভাবকদের।

ছবির উৎস, kiran sakale
মঙ্গল চামুটের ছেলে ওই গ্রামের স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
গ্রাম পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে মঙ্গল চামুটে বলেন, "আমরা আমাদের বাচ্চাদের বলেছি যে গ্রাম পঞ্চায়েত সাত থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"
"এরপর বাচ্চারা নিজেরাই বলে- আমাদের পড়াও, সেটার ছবি তুলে দাও আর সেই ছবি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পোস্ট কর। এতে তারা শুধুমাত্র এটা বলে না যে- আমাদের ছবি তুলে দাও।"
"তবে এমনটা নয়, যে তারা পড়তে বসে, আমরা ছবি তুলে দিই আর তারা পড়া ছেড়ে উঠে যায়। রাত নয়টা পর্যন্ত আমরা ওদের পড়াই।"
পঞ্চায়েত প্রধান শরদ আরগাড়ে এমনই এক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানো সৌন্দালা গ্রামের বাচ্চাদের পড়াশোনার ছবি দেখিয়েছিলেন আমাদের।
গ্রাম পঞ্চায়েতের এই অভিনব পদক্ষেপকে যেমন স্বাগত জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা, তেমনই অন্যান্য গ্রামগুলোতেও অনুপযুক্ত ভাষা ব্যবহার বন্ধ করার জন্য এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন যাতে কোনও মা-বোনেরা আর অপমানিত না হন।








