আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
কুষ্টিয়ায় লালন অনুসারী বৃদ্ধা নারীর ঘর নিয়ে আসলে কী হয়েছিলো
বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নে লালন অনুসারী এক বৃদ্ধার ঘর স্থানীয় একদল ব্যক্তি ভেঙ্গে দেয়ার ঘটনার পর শুক্রবার উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
“শুক্রবার সন্ধ্যায় উভয় পক্ষ এসেছিলো। আপাতত এর একটা সমাধান হয়েছে। যারা ঘর তুলতে বাধা দিয়েছিলো তারা বৃদ্ধা নারীকে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং তিনি কাছেই আরেকটা জায়গায় ঘর করবেন,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন কুষ্টিয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ সোহেল রানা।
বটতৈল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমানও বলেছেন যে, থানায় দু'পক্ষের সমঝোতার পর আজও এলাকাবাসী বসে সব ঠিকঠাক করেছে।
“এখন আর কোন সমস্যা নেই,” বলছিলেন তিনি।
অন্যদিকে ওই নারী ঘর তোলার সময় যার নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ করা হয়েছে, সেই এনামুল হক বলছেন, মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলার কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে বিশাল জমির মাঝে নির্জন একটি স্থানে কবরের পাশে ঘর তোলা হচ্ছিলো বলে এলাকাবাসী তাতে বাধা দিয়েছিলো।
“লালনে অনুসারী বলে তার ঘর তুলতে বাধা দেয়ার অভিযোগ মোটেও ঠিক নয়। এখানে আমরা সবাই লালন ভক্ত। ওই নারীর একটি ঘর আছে। কিন্তু সেখানে না থেকে তিনি খোলা জায়গায় নির্জন স্থানে তার স্বামীর কবরের পাশে ঘর তুলছিলেন। এটি অনেক নির্জন জায়গা এবং যে কোন সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটলে কে দায় নিবে,” বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন।
চায়না বেগম নামে ওই নারীর ভাই আয়াত আলীও বিবিসি বাংলার কাছে স্থানীয়দের সাথে সমঝোতার কথা নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, আগে যেখানে ঘর তোলার চেষ্টা করা হয়েছিলো তার থেকে দুশ গজ দূরে নতুন করে ঘর তোলা হবে এবং এতে তার বোনও রাজী হয়েছেন।
ঘটনাটি কী হয়েছিলো
পুলিশ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ওই এলাকার গাজীর উদ্দীন ফকির ছিলেন লালন শাহের অনুসারী। তিনি তার অনুসারীদের মধ্যে লালন ফকির বা লালন সাঁই নামেও পরিচিত।
কুষ্টিয়া ভিত্তিক লালন ফকির ছিলেন একাধারে একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক। তাঁর গানের মধ্যে সন্ধান পাওয়া যায় এক বিরল মানব দর্শনের। তাঁর লেখা গানের কোন পাণ্ডুলিপি ছিল না, কিন্তু গ্রাম বাংলায় আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তাঁর রচিত গান ছড়িয়ে পড়েছিলো লোকের মুখে মুখে।
সেই লালন শাহের অনুসারী গাজীর উদ্দীন ফকিরের স্ত্রী চায়না বেগমের দাবি, বহু বছর আগে তার স্বামী মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, কোথাও জায়গা না হলে তাকে তার কবরের পাশে থাকতে। তিনি নিজেও লালনের একজন অনুসারী।
তার স্বামীকে কবর দেয়া হয়েছিলো এমন একটি স্থানে যেখানে আশেপাশে কোন বসতি নেই এবং চার পাশে খোলা জায়গা জমি। সেখানে কবরের সাথেই তাদের নিজস্ব জায়গা আছে।
সম্প্রতি সেই জায়গায় চায়না বেগম ঘর তোলার উদ্যোগ নেন। ঘরের কাজ শুরুর পর স্থানীয় একদল ব্যক্তি এর বিরোধিতা শুরু করেন।
চায়না বেগম থানায় যে অভিযোগ করেছেন তাতে বলেছেন, বটতৈল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য এনামুল হক সহ একদল ব্যক্তি বুধবার সকাল ছয়টার দিকে তার ঘর ভাংচুর করেন এবং এতে তার লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি তাকে হত্যার হুমকি দেয়ার অভিযোগও এনেছেন।
ওই ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়ে যে মসজিদে ঘোষণা দিয়ে লোকজন জমায়েত করে ঘর ভাংচুর করা হয়েছে।
এনামুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, নির্জন জায়গায় ঘর তোলা হলে সেটি এলাকার মাদকসেবীদের আস্তানা হয়ে উঠতে পারে এবং তাতে ওই নারীর নিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে আশঙ্কা করে তারা ঘর তোলার বিরোধিতা করেছেন।
“আমরাসহ এলাকার সবাই ওনাকে বুঝিয়েছিলেন যে নির্জন জায়গায় ঘর না তুলে অন্য জায়গায় তোলার জন্য। তাছাড়া ওনার স্বামীর ঘর এখনো আছে। সেই ঘরটাকে সংস্কার করে দেয়ার কথাও বলেছিলো এলাকাবাসী। তিনি কোন কিছুতেই রাজী হননি। সে কারণে লোকজন তার ঘর তুলতে বাধা দিয়েছে,” বলছিলেন মি. হক।
থানায় দেয়া অভিযোগ পত্রে চায়না বেগম অভিযোগ করেছেন যে, মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করে তার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তবে মি. হক দাবি করেছেন যে, মাইকে ঘোষণা দিয়ে বা লালন অনুসারী হিসেবে হামলার কোন ঘটনা ঘটেনি।
যদিও স্থানীয় কয়েকজন নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন কয়েকজন গোঁড়া ধর্মান্ধ ব্যক্তি আছেন স্থানীয় একটি মসজিদ কমিটি সংলগ্ন এবং তারাই মূলত বৃদ্ধার ঘর তোলার বিরোধিতার সুর তুলেছিলেন।
“তাদের ভেবেছেন এই বৃদ্ধার ঘরও যদি লালন অনুসারীদের আখড়া হয়ে যায়। সেজন্য ঠেকানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন,” বলছিলেন স্থানীয় একজন, যিনি তার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ সোহেল রানা বলছেন, ৭৫/৭৬ বয়সী ওই নারী ভালো পরিবারের মানুষ এবং লালন ভক্ত।
“তার ঘর তোলার জায়গাটি নির্জন বলে স্থানীয় একদল এর বিরোধিতা করেছেন। খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়েছি। সবাইকে ডেকে কথা বলেছি। বিষয়টির সমাধান হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
জানা গেছে সমঝোতা অনুযায়ী ওই নারী ক্ষতিপূরণ পাবেন এবং আগে যেখানে ঘর তুলতে গিয়েছিলেন তার থেকে কিছুটা দূরে রাস্তার কাছে তার ঘর তোলায় স্থানীয়রা সহযোগিতা করবেন।