রংপুরের তারাগঞ্জে দলিত সম্প্রদায়ের দুই জনকে হত্যা, কী ঘটেছিলো সেখানে

ছবির উৎস, Sharier Mim
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরের তারাগঞ্জে দলিত সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তিকে 'ভ্যান চোর সন্দেহে' পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চার জনকে আটকের কথা জানিয়েছে সেখানকার পুলিশ। কিন্তু কেন এই ঘটনা ঘটলো তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
নিহতরা হলেন- তারাগঞ্জের কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুর এলাকার বাসিন্দা রুপলাল দাস এবং তার একজন নিকটাত্মীয় মিঠাপুকুর উপজেলার বালুয়াভাটা গ্রামের প্রদীপ দাস ।
এর মধ্যে রূপলাল দাস পেশায় মুচি এবং প্রদীপ দাস পেশায় ভ্যানচালক। তারা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।
তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ ফারুক জানিয়েছেন, গণপিটুনিতে ওই দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে এবং এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। "যাদের আটক করা হয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে আশা করছি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
স্থানীয়রা বলছেন, নিহত রূপলাল দাস তারাগঞ্জ বাজারেই মুচির কাজ করতেন এবং এলাকায় তিনি ছিলেন খুবই পরিচিত মানুষ।
তাদের মতে, সে কারণেই তাকে হত্যার প্রতিবাদে রবিবারই তার মৃতদেহ নিয়ে তারাগঞ্জের প্রধান সড়ক অবরোধ করেছে এলাকাবাসী।
রূপলাল দাসের কন্যা নূপুর রবি দাস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের পর ভ্যান চুরি ও মাদকসহ নানা বিষয় বলা হলেও তারা মনে করছেন 'এটি পরিকল্পিত ছিলো এবং অন্য কোনো কারণে' ঘটনাটি হয়ে থাকতে পারে।
কিন্তু 'অন্য কারণ' সম্পর্কে বিস্তারিত আর কোনো কিছু তিনি না জানালেও ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছেন, এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, ভিন্ন একটি এলাকায় এ ধরনের 'তাৎক্ষণিক ঘটনা' সেখানকার মানুষজনকে বিস্মিত করেছে।

ছবির উৎস, Sharier Mim
ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
পুলিশ, নিহতদের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং ঘটনাস্থলে পরে গিয়েছেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা হলো- রূপলাল দাসের মেয়ে নূপুর দাসের জন্য বিয়ের আলোচনা হচ্ছিলো মিঠাপুকুর উপজেলার এক পরিবারের সঙ্গে।
রোববার এ বিষয়ে দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার কথা। এ নিয়ে কথা বলার জন্য মিঠাপুকুর থেকে নিজের ভ্যান নিয়ে কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুরে রূপলাল দাসের বাড়িতে আসছিলেন প্রদীপ দাস। কিন্তু তারাগঞ্জ উপজেলা সয়ার ইউনিয়নে এসে কুর্শা যাওয়ার রাস্তা হারিয়ে তিনি রূপলাল দাসকে ফোন দেন।
নূপুর দাস বলছেন, "জামাইবাবুকে (প্রদীপ দাস রূপলাল দাসের ভাগ্মী জামাতা) আনতে বাবা বের হয়ে যান। জামাইবাবুর ভ্যানেই তারা বাড়ির দিকে আসছিলেন"।
কিন্তু তাদের ভ্যান কাজীরহাট সড়কের বটতলা নামক একটি জায়গায় আসলে তাদের কয়েকজন থামান এবং এরপরই গণপিটুনির ঘটনা ঘটে, যাতে দুজনই গুরুতর আহত হয়ে প্রাণ হারান।
স্থানীয় এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, এ সময় প্রথমে জমায়েত হওয়া ব্যক্তিরা রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে 'ভ্যান চোর' হিসেবে আখ্যায়িত করতে থাকে। রূপলাল দাস এ সময় তাদের বিষয়ে জানার জন্য বারবার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বা মেম্বারকে ফোন দিতে বলেন। কিন্তু জমায়েত হওয়া ব্যক্তিরা তাতে কান দেয়নি।
ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে এসেছে। সেখানেও দেখা গেছে রূপলাল দাস হাত জোর করে প্রাণ ভিক্ষা চাইছেন।
স্থানীয় একজন বলেছেন, "তিনি বার বার বলছিলেন আমি চোর না, আমি ডাকাত না। আমি জুতা সেলাই করি"।
এর মধ্যেই আরো লোকজন জমায়েত হয়ে তাদের গণপিটুনি দিতে শুরু করে এবং মারতে মারতেই বুড়িরহাট স্কুলের মাঠে নিয়ে যায়। এক পর্যায়ে তারা জ্ঞান হারালে হামলাকারীরা চলে যায়। এর প্রায় দু ঘন্টা পর পুলিশ খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে তারাগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে যায়।
হাসপাতালে নেয়ার পরই চিকিৎসকরা রূপলাল দাসকে মৃত ঘোষণা করেন। আর রবিবার সকালে মারা যায় প্রদীপ দাস। তাদের মৃত্যুর খবরে কুর্শা ইউনিয়নের লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

ছবির উৎস, Getty Images
এক পর্যায়ে মৃতদেহ নিয়ে সেখানকার মানুষ তারাগঞ্জ-কাজীরহাট সড়ক অবরোধ করে ও মানববন্ধনে অংশ নেয়।
দলিত সম্প্রদায়ের রংপুর বিভাগীয় সভাপতি মনিলাল দাস বিবিসি বাংলাকে বলছেন, "এ হত্যার প্রতিবাদে যে প্রতিবাদ ও বিশাল মানববন্ধন হয়েছে সেটিই প্রমাণ করে ভ্যান চুরির যে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটি মোটেও সঠিক নয়"।
কিন্তু ভ্যান চুরির প্রসঙ্গ কিভাবে আসলো—এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে যে, কিছুদিন ধরেই ভ্যান চুরির ইস্যুটি এলাকায় আলোচিত ছিলো। এর কারণ হলো জুলাইয়ের শেষ দিকে সেখানে একটি শিশু হত্যা ও ভ্যান চুরির একটি ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ ছিলো।
রূপলাল ও প্রদীপ দাসের ভ্যান বটতলা এলাকায় আসার পর কয়েকজন লোক ভ্যান ঘিরে ধরে। তারা ওই ভ্যানে রাখা একটি বস্তা থেকে কয়েকটি বোতল বের করেন এবং এসব বোতলে চোলাই মদ রাখার অভিযোগ করেন।
প্রসঙ্গত, দলিত সম্প্রদায়ের অনেকে নিজেদের ঘরে তৈরি চোলাই মদ সেবন করে থাকেন। এটি এই সম্প্রদায়ের অনেকে স্বাভাবিক জীবনাচরণের অংশ বলেও মনে করে থাকেন।
ভ্যানের বোতলে থাকা তরল পদার্থের ঘ্রান নিয়ে কয়েকজন তাৎক্ষণিক অসুস্থ বোধ করার দাবি করলে উপস্থিত অন্যরা আরও মারমুখী হয়ে ওঠে।
তবে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, রূপলাল ও প্রদীপ দাসের ভ্যান বটতলায় পৌঁছার আগেই সেই ভ্যানে তিনজন নারী ছিলেন।
বটতলায় আসার পর তিন নারী ভ্যান থেকে নেমে যান এবং এরপর তারাই কাছে থাকা স্থানীয় কয়েকজনের সাথে কথা বলার পর লোকজন ভ্যানটি ঘিরে ধরে 'ভ্যান চুরি' ও ভ্যানে চোলাই মদ রাখার অভিযোগ করে মারতে শুরু করেন।
পরিবার ও স্থানীয়রা যা বলছে
নিহত রূপলাল দাসের মেয়ে নূপুর দাসের দাবি, এই ঘটনার চুরি, ছিনতাই কিংবা মাদক- এর কোনো সম্পর্কই নেই।
"বাবাকে এই এলাকার সবাই চিনে। চুরি, ছিনতাই বা মাদক হলেও এতো রাতে একটা গ্রামে এত লোক জমায়েত হয়ে দুজনকে এভাবে মেরে ফেলবে?" বলছিলেন তিনি।
তিনি বলেন ভ্যান চুরির সন্দেহের কথা বলা হচ্ছে অথচ ভ্যানটা তার জামাইবাবুর।
"জামাইবাবুকে রিসিভ করে আনার জন্যই বাবা গিয়েছিলো। যা বলা হচ্ছে এগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়। এখানে অন্য কারণ থাকতে পারে। আগেও বাবাকে হুমকি দিয়েছিলো কিছু লোক। তারও হয়তো শত্রু ছিল, যা আমরা জানি না," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
নিহত রূপলাল দাস যেই ইউনিয়নের অধিবাসী সেই কুর্শা ইউনিয়ন পরিষদের একজন মেম্বার মোঃ কাজী মনির উদ্দিন।
তিনি বলছেন, নিহত রূপলাল তারাগঞ্জে মুচির কাজ করতেন এবং তিনি তাদের পরিচিত ছিলেন।
"আমি যতটা জানি লোকটা ভালো ছিলো। এখন কেন অন্য এলাকায় এই ঘটনা ঘটলো তা আমরা বুঝতে পারছি না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
আবার ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেটি উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে।
সেই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোঃ মিতাউর রহমান জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারাগঞ্জ বাজারেই মুচির কাজ করে আসছিলেন রূপলাল দাস।
"তাকে অন্যায়ভাবেই মারা হয়েছে। আমার মনে হয় চুরির অভিযোগ ঠিক নয়। লোকজনের কাছ থেকে যা শুনেছি তাতে সন্দেহের বশে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে পুলিশ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছেন, মনিলাল দাস। তিনি বলছেন, রূপলাল দাসকে ভালো মানুষ হিসেবে জেনে আসছিলেন তারা।
"নিহতরা দুজনই বংশানুক্রমিক দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। এ ভাবে তাদের মেরে ফেলা মেনে নেয়া যায় না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে পুলিশের হাতে দিতে পারতো। কিন্তু তা না করে মেরে ফেলে চলে গেছে হামলাকারীরা। তাই এর প্রকৃত কারণ পুলিশকেই খুঁজে বের করতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তারাগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ ফারুক বলছেন, এ ঘটনায় নিহত রূপলাল দাসের স্ত্রী মামলা করেছেন।
"ইতোমধ্যেই আমরা তদন্ত শুরু করেছি। চার জনকে আটক করেছি। আশা করছি জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে হত্যার কারণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।








