‘টাকা লাগানো’, ‘ম্যাচ ধরা’ আরও যেসব নামে অনলাইন ও অফলাইন বিপিএল জুয়া

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, ঢাকা, বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বিপিএল বাংলাদেশের আলোচিত একটি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই একে ঘিরে বিতর্ক চলছে।

কোনও আসরেই বিতর্ক পিছু ছাড়েনি।

মাঠ ও মাঠের বাইরে নানা ধরনের ঘটনা তো আলোচনায় ছিলই, তার সাথে লক্ষ্য করা গেছে দেশের নানা প্রান্তে এবং অনলাইন মাধ্যমে বেটিং বা জুয়ার আসর।

যে জুয়া ম্যাচ হারা-জিতা থেকে শুরু করে, কোন ওভারে কতো রান হবে, কে কখন ব্যাটিংয়ে নামছে এসব নিয়েও হয়ে আসছে।

তবে শুধু বিপিএল নয়, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ, নারীদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, দ্য হান্ড্রেড, বিশ্বের প্রায় সব ক্রিকেট লিগ নিয়েই বাংলাদেশের জুয়ার আসরগুলোতে বড় অঙ্কের বাজি ধরা হয়ে থাকে।

এবারের বিপিএলে বিতর্ক শুরু হয়েছে সাকিব আল হাসানের মাধ্যমে, শেষও হচ্ছে তার মাধ্যমে।

সাকিব আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে নাখোশ হয়ে তার দিকে তেড়ে যাচ্ছেন, কখনো কখনো জরিমানা গুণছেন, টেলিভিশনে টকশোতে কিংবা পত্রিকার কলামে বিশ্লেষকরা নানা ধরনের মতামত দিচ্ছেন।

আবার সাকিব রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচে ব্যাট করতে নামেননি, কেন নামেননি এটা নিয়েই যত গুঞ্জণ।

এর আগেও লিগ পর্বের ম্যাচে সাকিব একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ব্যাট করতে নামেননি।

ব্যাপারটিকে একেবারে সরলভাবে ভাবতে নারাজ বাংলাদেশের ক্রিকেট সাংবাদিক দেবদুলাল চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, “এই ঘটনার পেছনের ঘটনা আছে কী নেই, সেটা আমাদের জায়গা থেকে বলা মুশকিল। ঘটনা যদি ঘটে থাকে সেটাও আমরা আদৌ কখনো জানবো কি না সেটাও বলা মুশকিল।”

এই জানা-অজানার অনুমান নিয়েই বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছে জুয়ার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে বলছে পুলিশ।

'টাকা লাগানো' বা 'ম্যাচ ধরা' জুয়ার যত অভিনব নাম

ঢাকার ব্যস্ত বাস টার্মিনাল গাবতলীর অদূরে দারুসসালাম টাওয়ার, পাশে মসজিদের গলি ধরে টানা দুই থেকে তিনটি চায়ের দোকান।

এখানে সকাল থেকেই এসব ঘটনা এবং ঘটনার কার্যকারণ নিয়ে ‘অপেশাদার’ বিশ্লেষণ শোনা যায়। এই বিশ্লেষকদের একজন রাসেল হক, পেশায় চায়ের দোকানদার।

চায়ের দোকান থেকে যা আয় করেন তার একটা বড় অংশ বরাদ্দ থাকে তার ‘ক্রিকেট জ্ঞান বিক্রি’র কাজে।

দোকানে চা সিগারেট বিক্রি করার পাশাপাশি তিনি ইংল্যান্ডের ১০০ বলের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট 'দ্য হান্ড্রেড' থেকে শুরু নারীদের বিগ ব্যাশের সব ক্রিকেট ম্যাচ ফলো করেন এবং বেশিরভাগ ক্রিকেটারের নামও জানেন।

শুধু তাই নয়, কে কোন ম্যাচে কতো করেছিলেন, সামনের ম্যাচে তার কেমন করার সম্ভাবনা এসবও তিনি আঁচ করে থাকেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের সকল তথ্য তার ঠোঁটের আগায়।

ক্রিকইনফো, ক্রিকবাজ সবসময়ই মোবাইলের ওয়েব ব্রাউজারে বুকমার্ক করে রাখা, কোনও কোনও পোর্টালের অ্যাপ্লিকেশনও নামিয়ে নোটিফিকেশন অন রেখেছেন তিনি, যাতে কোনও খেলা মিস না হয়।

অর্থাৎ মি. হকের ক্রিকেট জ্ঞান একেবারেই নিরর্থক নয়, বরং অর্থবহুল।

তিনি এই জ্ঞান কাজে লাগান বিভিন্ন ম্যাচ নিয়ে 'জুয়া' খেলার জন্য।

যদিও শব্দটাকে জুয়া বলতে তার আপত্তি রয়েছে।

তার ভাষায়, তিনি ‘টাকা লাগান’ এমন সব ম্যাচে যেখানে তুলনামূলক দুর্বল দল বা যেসব দলের জয়ের সম্ভাবনা কম তারা জিতে যেতে পারে বলে তিনি অনুমান করেন।

এসব ম্যাচে যদি তার অনুমান সঠিক হয় সেক্ষেত্রে যে পরিমাণ টাকা তিনি বাজি ধরেন তার চেয়ে চার থেকে পাঁচগুণ টাকা পেয়ে থাকেন।

এই টাকা সবসময় নগদ লেনদেন হয় না, একটা ম্যাচ খেলার পর সেই ম্যাচে হেরে যাওয়া প্রতিপক্ষ আবার অপেক্ষা করেন পরের ম্যাচ খেলার।

সেটায় প্রতিপক্ষ জিতে গেলে একে বলে ‘কাটাকাটি’।

ম্যাচ বাই ম্যাচ জুয়া খেলার যে ধরন এটাকে বাংলাদেশের জুয়াড়িরা 'ম্যাচ ধরা' বলে থাকেন।

অর্থাৎ এক্ষেত্রে অর্থের লেনদেনের প্রয়োজন হয় না।

এই এলাকার অদূরেই মাজার রোড থেকে মোহাম্মদপুর যাওয়ার রাস্তায় লেক পার হলেই দেখা যায় সারি সারি চায়ের দোকান, এমনি সময় যেখানে টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা দেখে সময় কাটিয়ে দেন ক্রেতারা।

কিন্তু যদি খেলা থাকে তাহলে সিনেমা বাদ, খেলা নিয়েই চলে যত আলাপ এবং টাকার লেনদেন।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগকে কেন্দ্র করে এখানেও বসেছে জুয়ার আসর।

এখানে আয়োজনটা আরও বড়, আরও বেশি মানুষ এখানে জড়ো হন প্রতি সন্ধ্যায়। রাত পর্যন্ত চলে এসব আসর।

তবে এই আসরের একটা বড় কেন্দ্র মিরপুর স্টেডিয়াম ঘিরে, যদিও স্টেডিয়ামের ভেতরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এন্টি করাপশন ইউনিট তৎপর থাকে।

কিন্তু স্টেডিয়ামের বাইরে তাদের এখতিয়ার নেই।

চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সেলুন কিংবা ফাঁকা খেলার মাঠে গোল হয়ে জড়ো হন অনেকে।

ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে এই জুয়া খেলার ট্রেন্ড ঢাকায় যতটা জেলা শহরেও একই রকম।

ঝালকাঠি, কক্সবাজারে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ইয়ুথ ক্লাবের নাম দিয়ে দপ্তর খুলেও জুয়ার আসর দেখা গেছে।

সামনাসামনি যারা খেলা নিয়ে বাজিতে ঠিক সাহসী হয়ে উঠতে পারেন না, তারা ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারেন।

অগণিত ওয়েবসাইট ও পেইজ আছে অনলাইনে।

জুয়া নিয়ে সংঘর্ষ, অভিযান, হতাহত

এসব জুয়া খেলা নিতান্তই খেলা থাকেনি অনেক সময়।

দুই হাজার সতের সালের নভেম্বর মাসে ঢাকার বাড্ডা এলাকায় এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নিহত হয়েছিল।

সেসময় পুলিশ বিবৃতি দিয়েছিল, বিপিএলের জুয়ায় বাঁধা দেয়া নিয়ে দেনদরবারেই খুন হয়েছিল সেই শিক্ষার্থী।

সেসময় অভিযান চালিয়ে অন্তত ৫০জনকে আটকও করেছিল পুলিশ।

কর্তৃপক্ষ কী বলছে?

পৃথিবীর অনেক দেশে এই বেটিং অবৈধ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সব ধরণের জুয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আর কর্তৃপক্ষও সব ধরণের বেটিং বা জুয়ার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

তবে সেটিকে যে আইনের মাধ্যমে ঠেকানো মুশকিল সেটিও স্বীকার করছে কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, “জুয়া বাংলাদেশে আনঅফিসিয়ালি এমনভাবে খেলা হয়, আইন করে এটা রোখা মুশকিল। এটা সামাজিক অপরাধ হিসেবে দেখা হবে সামনে। কারণ অনেকে ভুক্তভোগী হচ্ছেন, তারা ওই টাকা তোলার জন্য আবারও আসরে বসছেন।”

ছয় বছর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে মিরপুর স্টেডিয়াম থেকে ৭৭ জন জুয়াড়িকে ধরে স্টেডিয়াম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বিসিবি কর্তৃপক্ষ তখন বলেছিল, মাঠের বাইরে এসব কর্মকাণ্ড আটকানো কঠিন।

সে সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ডিরেক্টর জালাল ইউনুস বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “যারা সরাসরি মাঠে বসে ম্যাচ দেখছেন, তার তুলনায় যারা বাংলাদেশের বাইরে বসে টিভিতে খেলা দেখছেন - তারা খেলাটা আসল সময়ের চাইতে কয়েক সেকেন্ড পরে দেখতে পান।

সময়ের এই ব্যবধানকে কাজে লাগিয়েই জুয়াড়িরা কোন বলে কে আউট হবে বা কে বাউন্ডারি মারবেন ইত্যাদি নিয়ে বেটিং করছে।”

এর বাইরে বিভিন্ন সময় পুলিশও জুয়া ঠেকাতে অভিযান চালিয়েছে।

দুই হাজার বাইশের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে একটি সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন ডিবি প্রধান বলেছিলেন, “কেবল মোবাইলে লেনদেন করে অনলাইন জুয়ায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা এদিক সেদিক হয়েছে।”

তিনি আরও বলেছিলেন, “কয়েকটি চক্র এ আসরগুলোর এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ও বিপিএলের সময় তারা আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।”

কিন্তু এতসবের পরও বেটিং বন্ধ করা যায়নি।

বরং বেটিং সংক্রান্ত ওয়েব পেইজের কোনও কোনওটি সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকটি সিরিজের স্পন্সরও ছিল।

কিছু ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও টাকার লেনদেন করা যায়, এক্ষেত্রে ৫০০ থেকে ১০০০ হাজার টাকার মতো জমা দিয়ে খাতা খুলতে হয়।