আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
এনসিপির নেত্রীদের পদত্যাগ বা সরে দাঁড়ানো, জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যই কী কারণ
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে এনসিপির আসন নিয়ে সমঝোতার প্রেক্ষাপটে দলটির নারী সদস্যদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পরিচিত মুখ ও সম্মুখ সারির অন্তত দুজন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। কেউ কেউ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের যে নারী সদস্যরা এনসিপি গঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, তারা যখন এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, তা দলটিকে অস্বস্তিতে এবং এক ধরনের সংকটে ফেলেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
যদিও এনসিপি নেতৃত্ব পরিস্থিতিটাকে তাদের দলের জন্য সংকট হিসেবে স্বীকার করতে রাজি নন।
কিন্তু এই জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেত্রী তাসনিম জারা এবং তাজনূভা জাবীন ইতিমধ্যে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন।
বারই ফেব্রয়ারির নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিলেও এখন ভোট থেকেই সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন কয়েকজন।
দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি দলের ও নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয় থাকবেন না।
অন্যদিকে, এনসিপির ত্রিশ জন কেন্দ্রীয় নেতা জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে শীর্ষ নেতার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।
দল থেকে পদত্যাগ, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো অথবা দলে নিস্ক্রিয় হয়ে যাওয়া-এসব সিদ্ধান্ত এনসিপির যে নারী সদস্যরা নিয়েছেন, তারা গত দুদিনে সামাজিক মাধ্যমে কারণ ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন।
ফলে গণমাধ্যমে যেমন সেই ঘটনাপ্রবাহ খবর হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে, সামাজিক মাধ্যমেও চলছে নানা আলোচনা।
তাদের কারও কারও বক্তব্যে এসেছে যে, এনসিপি মধ্যপন্থার আদর্শের দল হবে। সেখানে জামায়াতের সাথে ঐক্য সেই অবস্থানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এই নারী সদস্যদের বাইরে যে ত্রিশ জন কেন্দ্রীয় নেতা তাদের আপত্তি জানিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন, সেই স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও এনসিপির মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।
এনসিপির শীর্ষস্থানীয় ছয়জন নেত্রীও দলটির শীর্ষ নেতার সাথে দেখা করে তাদের আপত্তি জানিয়েছেন।
'জামায়াতের সাথে ঐক্য পরিকল্পিত'
জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্যের ঘোষণা দেওয়ার দুদিন আগে গত বৃহস্পতিবার এনসিপির শীর্ষস্থানীয় ছয়জন নেত্রী দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় এক বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর সাথে আসন সমঝোতা নিয়ে তাদের আপত্তি জানান।
কয়েকটি পত্রিকায় এ খবর প্রকাশ হয়েছে।
ওই বৈঠকে তাসনিম জারা, সাজনূভা জাবীন, নুসরাত তাবাসসুম, মনিরা শারমিন, সামান্তা শারমিন এবং নাহিদা সারোয়ার নিভা উপস্থিত ছিলেন।
সেই বৈঠকেই জামায়াতের সাথে জোট হলে পদত্যাগের হুমকি দিয়েছিলেন নারী নেত্রীদের কেউ কেউ।
তাদের হুমকি বা আপত্তিকে আমলে নেয়নি এনসিপি নেতৃত্ব। তারা আসন সমঝোতা করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয়েছেন।
সেই এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ডা. তাসনিম জারা। তিনি ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকার এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। তিনি এলাকায় দুই দিন ধরে সেই স্বাক্ষর সংগ্রহ করে সোমবার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
সোমবার খিলগাঁওয়ে যেখানে মিজ জারা স্বাক্ষর সংগ্রহ করছেন, সেই স্থানে তার সাথে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতার সাথে কথা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর জোটের সাথে এনসিপির আসন সমঝোতার কারণেই পদত্যাগ করেছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাব দেননি মিজ জারা।
তবে দলটির আরেক নারী নেত্রী দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এর কারণ ব্যাখ্যা করে নিজের ফেসবুক পাতায় পোস্ট দেন তাজনুভা জাবীন।
মিজ জাবিনকে বিবিসি বাংলা বেশ কয়েকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি তিনি।
প্রায় ১৩শ শব্দের ফেসবুক পোস্টে তাজনূভা জাবীন শুরুতে লিখেছেন, জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বা নারী বিষয়ের কারণের চেয়েও যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী ঐক্য হয়েছে, তা ভয়ঙ্কর।
"এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে " লিখেছেন মিজ জাবিন।
মিজ জাবিন এনসিপির আদর্শিক অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কথাও তুলে ধরেছেন তার এই পোস্টে।
মিজ জাবিন দাবি করেন, ধীরে ধীরে রাজনীতি করে সব অপশনকে বাদ দেওয়া হয়েছে যাতে জামায়াতের সাথে জোট করা ছাড়া কোন উপায় না থাকে। এটি পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন তাজনূভা জাবীন।
"কিন্ত যারা এই দেশ, এই সংসদই চায় নাই- তাদের সাথে সমঝোতায় একদম শুরুতেই এমপি হতে চাওয়া, বা যারা এদের কল্যাণে এমপি হওয়ার জন্য হাভাইত্তার মতো করছে তাদের নেতৃত্ব মানা আমার পক্ষে ঠিক গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর অসম্ভব।
"এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি। আমার নেতা হবে মাজাওয়ালা, জুলাই রাজনীতির ধারক। কিন্তু পুরো জুলাইকে নিয়ে রাজনৈতিক কৌশলের নাম করে তুলে দিচ্ছে জামায়াতের হাতে " লিখেছেন মিজ জাবিন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রথম থেকেই এনসিপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
ফলে শেষ মুহূর্তে এসে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটে যেতে এনসিপি ৩০টি আসনের সমঝোতা করে।এটি দলের বাকিদের নির্বাচন করতে না দেওয়ার কৌশল বলেও মন্তব্য করেছেন মিজ জাবিন।
এদিকে, জামায়াতের জোটে এনসিপির যোগ দেওয়া নিয়ে আপত্তি থাকলেও দল থেকে পদত্যাগ করেননি এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।
তিনি এ-ও মন্তব্য করেন, জামায়াতের সাথে সমঝোতায় এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।
নিজের ফেসবুক পেইজে মিজ শারমিন লিখেছেন, "বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্ভরযোগ্য মিত্র না। তার রাজনৈতিক অবস্থান বা দর্শনসহ কোন সহযোগিতা বা সমঝোতায় যাওয়া এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে বলে আমি মনে করি।"
মিজ শারমিন মনে করেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির এত দিনের অবস্থান অনুযায়ী তার মূলনীতি, রাষ্ট্রকল্প জামায়াত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
'রাজনীতি পরিবর্তনের বয়ান দিয়ে সিট ভাগাভাগি'
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে সময় সক্রিয় ছিলেন নুসরাত তাবাসসুম। পরে তিনি এনসিপিতে যোগ দেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিজ তাবাসসুম নিজ দলের জামায়াতের সাথে জোট গঠনের সমালোচনা করে নির্বাচনকালীন সময়ে দলের সকল কার্যক্রম থেকে নিজের নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, "আজ ২৮/১২/২০২৫, ঠিক ১০ মাস পর জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোটে বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, আমি মনে করি এনসিপির সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারকেরা নিজেরাই এনসিপির মূল বক্তব্য থেকে চ্যূত হয়েছেন।"
মিজ নুসরাত অবস্থা পুনর্বিবেচনা করে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন।
এদিকে, নওগাঁ - ৫ আসন থেকে এনসিপির মনোনয়ন পাওয়া মনিরা শারমিন দল থেকে পদত্যাগ না করলেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
মিজ শারমিন নিজের ফেসবুক পেইজে এই সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, মনোনয়ন পাওয়ার আগে তিনি জানতেন না যে, এনসিপি জামায়াতের সাথে ত্রিশ আসনের সমঝোতা করবে। যেহেতু দলের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে তাই নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন।
মিজ শারমিন লিখেছেন, "আমি ক্ষমতার রাজনীতি করতে আসি নাই। রাজনীতি পরিবর্তনের বয়ান দিয়ে সিট ভাগাভাগি করে ক্ষমতায় যেয়ে নিজেদের দলের প্রতি, মানুষের প্রতি বেইনসাফি করব না। জনতার কথা ও নতুন রাজনীতির কথা আপনাদের হয়ে বলতে থাকব ইনশাল্লাহ।"
এদিকে, রোববার সন্ধ্যায় দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলীয় জোটে যোগ দেওয়া কেবল নির্বাচনী সমঝোতা বলে মন্তব্য করেন।
দলটির শীর্ষ দুইজন নেত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে মি. ইসলাম বলেন, " কেউ দলে থাকবে কি না বা নির্বাচন করবে কি না সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়।"
'জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ট্যাগ নিতে চায় না, তাই প্রতিক্রিয়া'
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীর প্রতি জামায়াতের যে আদর্শগত ও নৈতিক অবস্থান জাতীয় নাগরিক পার্টির এই আসন সমঝোতায় সেটি প্রকাশ পেয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, "জামায়াতে ইসলামী কখনোই আসলে নারী প্রার্থীকে সরাসরি নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়নি। নারীর বিষয়ে জামায়াতের আদর্শগত ও নৈতিক যে অবস্থান, এটি সেটিরই একটি প্রকাশভঙ্গি।"
নারী সদস্যদের এনসিপি থেকে সরে যাওয়ার পেছনে সমঝোতামূলক ত্রিশ আসনে নারীদেরকে না রাখার কারণটিও মূখ্য বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের বড় ভূমিকা থাকলেও তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল এনসিপি গত দেড় বছরে সেই নারী নেত্রীদেরই যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি বলেও মনে করেন জোবাইদা নাসরীন।
"এনসিপির এই প্রক্রিয়া, পুরোটাই নারীবিহীনভাবে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পুরো রাজনীতিই এখন আসলে নারীদেরকে বাদ দিয়ে হচ্ছে " বলেন মিজ নাসরীন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সামগ্রিক রাজনীতিতে নেতিবাচক পুরুষ আধিপত্য প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
মিজ নাসরীন বলেন, " টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি বা নেতিবাচক পুরুষ আধিপত্যের প্রাধান্য আছে এনসিপিতে। এমনকি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দেড় বছরে সেটা আমরা লক্ষ্য করেছি।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, এই নারী সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নৈতিক অবস্থান থেকেই হয়তো জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচনী ঐক্যের বিরোধীতা করছে।
একইসঙ্গে অধ্যাপক আহমেদ উল্লেখ করেন, এই নেত্রীরা অবশ্য আগে কখনো জামায়াতের স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা নিয়ে কথা বলেননি।
"জামায়াতের বিষয়ে তাদের যদি এতোই এলার্জি থাকতো, তাহলে অনেক আগেই সরে যাওয়া দরকার ছিল। কারণ তাদের দলের মধ্যেও তো জামায়াতপন্থী লোক রয়েছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না''।
"আমার মনে হয় শেষ মুহূর্তে তারা জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যে ট্যাগ, এটা নিতে চান না। সেটা হতে পারে। সে কারণে এত প্রতিক্রিয়া,'' বলে মন্তব্য করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।