অধ্যাপক ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান করতে চায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

শেখ হাসিনার পতনের পর দেশ পরিচালনার জন্য গঠিত হতে যাওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।

মঙ্গলবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় প্রধান উপদেষ্টার নাম প্রস্তাব করেছেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মি.ইসলাম।

ওই সময় তার সঙ্গে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এবং আবু বাকের মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন।

“আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে সর্বজন গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে,” ভিডিও বার্তায় বলেন মি. ইসলাম।

দ্রুত সময়ের মধ্যে এ সরকার গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হওয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যেই তারা অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও জানিয়েছেন মি. ইসলাম।

“ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। তিনি ছাত্র-জনতার আহ্বানে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে এই গুরু দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছেন,” বলেন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।

উপদেষ্টা পরিষদের বাকি সদস্যদের নাম দ্রুতই প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

উল্লেখ্য যে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উপর সহিংসতা বন্ধে সম্প্রতি জাতিসংঘসহ বিশ্বনেতাদের তৎপর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সেগুলোর তদন্তও দাবি করেছিলেন তিনি।

জনরোষের মুখে সোমবার শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর শুনে এক প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক ইউনূস 'বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে' বলে মন্তব্য করেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশজুড়ে মানুষ উদযাপন করছে। তারা যেন দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছে।

“আমরা এখন নতুন করে শুরু করতে চাই এবং আমাদের জন্য একটি সুন্দর দেশ গড়ে তুলতে চাই। এই প্রতিশ্রুতিই আমরা দিতে চাই। আমাদের ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেবেন শিক্ষার্থী ও তরুণেরা,” দ্য প্রিন্টকে বলেন অধ্যাপক ইউনূস।

তবে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হবেন না বলে তখন জানান।

“রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার মতো মানুষ আমি না,” বলেন মি. ইউনূস।

আরও পড়তে পারেন:

এর আগে, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন অধ্যাপক ইউনূস। যদিও উদ্যোগটি শুরুর দশ সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সেখান থেকে সরে আসেন।

সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়াএক সাক্ষাৎকারে শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনূস বলেছিলেন, তার রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ ভুল ছিলো।

এদিকে, সোমবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে সমন্বয়করা জানিয়েছিলেন যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবেন তারা।

এর কয়েক ঘণ্টা পর অধ্যাপক ইউনূসের নাম ঘোষণা করা করা হলো।

ছাত্র-নাগরিকের সমর্থিত সরকার ছাড়া তারা অন্য কোনো ধরনের সরকারকে সমর্থন দিবেন না বলেও জানিয়েছেন সমন্বয়করা।

“আমরা রক্ত দিয়েছি, শহীদ হয়েছি। আমাদের যে প্রতিশ্রুতি একটি নতুন বাংলাদেশ গঠন করার জন্য সেটিকে আমাদের অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং অবশ্যই ছাত্র জনতার প্রস্তাবিত সরকার বাদে কোনো ধরনের সরকার কিন্তু মেনে নেওয়া হবে না,” বলেন মি. ইসলাম।

অরাজকতা বন্ধের আহ্বান

সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে অরাজকতা দেখা যাচ্ছে, সেটি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

“দেশে যে অরাজকতা চলছে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা চলছে সেজন্য আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে আহ্বান জানাচ্ছি দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে,” ভিডিও বার্তায় বলেন সমন্বয়ক মি. ইসলাম।

এক্ষেত্রে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য তারা নিজেরাও মাঠে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।

“অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিকামী ছাত্র জনতাকে রাজপথে থেকে তাদের যে অভ্যুত্থান সে অভ্যুত্থানকে রক্ষা করতে হবে,” ভিডিও বার্তায় বলেন মি. ইসলাম।

উল্লেখ্য যে, শেখ হাসিনা পদত্যাগের পর ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ নানা ঘটনা ঘটেছে।

ভাঙচুর করে মালামাল লুট করা হয়েছে গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রধান বিচারপতির বাসভবনে।

আগুন দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের অসংখ্য বেসরকারি স্থাপনায়।

সোমবার সহিংসতায় সারা দেশে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

একইসঙ্গে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে হামলার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।

আরও পড়তে পারেন:

এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় পাহারা বসানোর জন্য সাধারণ ছাত্র-জনতার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

“আমাদের সংখ্যালঘু কমিউনিটিকে আমাদের রক্ষা করতে হবে এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং এই দেশকে রক্ষা হবে আমাদের,” বলেন মি. ইসলাম।

এর আগে, সোমবার রাতে সারা দেশে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।

“আমরা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিবো না। যারা অন্যায় করেছে, ফ্যাসিজমের সাথে জড়িতদের একটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনবো,” বলেন সমন্বয়ক মি. ইসলাম।

একইসঙ্গে, তারা অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাই হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।

“কোনো সাম্প্রদায়িক উস্কানি, নাশকতা বা বিভাজনের চক্রান্ত হলে তা রুখে দিতে হবে। বিজয়ের প্রথম ধাপ পূর্ণ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপও পূর্ণ হবে। জীবনের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। শান্তিপূর্ণ অবস্থান ও দেশ গঠনের জন্য প্রস্তুত হন,” সোমবার বলেছিলেন আন্দোলনকারীদের অন্যতম সমন্বয়ক মি. ইসলাম।