রাশিয়ায় ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের উপাসনালয়ে হামলা, পুলিশসহ নিহত ২৩ জন

কালো পোশাক পরা একদল লোক পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে
ছবির ক্যাপশান, কালো পোশাক পরা বন্দুকধারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে

রাশিয়ার উত্তর ককেশাস অঞ্চলে অবস্থিত দাগেস্তান প্রজাতন্ত্রের দু’টি শহরে ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের চারটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা চালিয়েছে একদল বন্দুকধারী।

একইসঙ্গে, পুলিশের একটি তল্লাশিচৌকিতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় কমপক্ষে ২৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৫ জন পুলিশ সদস্য এবং ছয় জন হামলাকারী রয়েছে বলে জানা গেছে।

হামলায় অন্তত এক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন।

রোববার দাগেস্তানের সবচেয়ে বড় শহর মাখাচকালা এবং দেরবেন্ত শহরে হামলার এসব ঘটনা ঘটে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে অতীতে দাগেস্তানে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার নজির রয়েছে।

এমন এক সময়ে এসব হামলার ঘটনা ঘটলো, যখন দেরবেন্ত এবং মাখাচকালা শহরে গির্জায় অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব পেন্টেকস্ট চলছিলো।

বন্দুকধারীরা দু’টি গির্জা এবং দু’টি সিনাগগকে লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা চালায়।

এতে মাখাচকালার একটি গির্জায় একজন ধর্মযাজকও নিহত হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।

হামলার এই ঘটনাকে 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড' আখ্যা দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে রুশ প্রশাসন।

আরও পড়তে পারেন:
হামলার পর উপাসনালয় গুলোতে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, হামলার পর উপাসনালয় গুলোতে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়

এদিকে, হামলার পর ঘটনাস্থলের বেশকিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে বেশ কয়েকটি ভবনে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।

এছাড়া মাখাচকালা শহরের একটি ভিডিওতে কালো পোশাক পরা কয়েকজন ব্যক্তিকে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছেও দেখা গেছে।

ঘটনার পর জরুরি সেবা সংস্থার সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছেন।

বন্দুকধারীদের হামলায় ১৫ জন পুলিশ সদস্য মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দাগেস্তান প্রজাতন্ত্রের নেতা সের্গেই মেলিকভ।

অন্যদিকে, হামলায় অংশগ্রহণকারী ছয় ব্যক্তি নিহত হয়েছেন এবং বাকীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দাগেস্তানের দেরবেন্ত শহর ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষের একটি প্রাচীন আবাসস্থল।

বন্দুকধারীরা সেখানকার একটি সিনাগগ এবং একটি গির্জায় হামলা চালায়।

হামলার পর উপাসনালয়গুলোতে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়।

গত মার্চে মস্কোর ক্রোকাস সিটি হলের একটি কনসার্টে হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছিলো

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, মার্চে মস্কোর ক্রোকাস সিটি হলের একটি কনসার্টে হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছিলো
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামের একটি বেসরকারি সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, দেরবেন্তের একটি ভবনে বন্দুকধারীদের কয়েকজনকে ঘিরে রেখেছে পুলিশ।

এছাড়া মাখাচকালা শহরের নিকটবর্তী সার্গোকালিনস্কি জেলার প্রধান মাগোমেদ ওমরভকে পুলিশ আটক করেছে।

রোববারের হামলার ঘটনার সঙ্গে তার দুই ছেলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

রাশিয়ার দারিদ্রপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে দাগেস্তান অন্যতম। এটি রাশিয়ার মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোরও একটি।

এর আগে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ‘ককেশাস আমিরাত’ নামের একটি ইসলামপন্থী সশস্ত্র সংগঠন দাগেস্তান এবং এর পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি রুশ প্রজাতন্ত্রে হামলা চালায়।

সংগঠনটি পরবর্তীতে নিজেদের নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামিক আমিরাত অব দ্য ককেশাস’ রাখে।

এর আগে, মার্চে মস্কোর ক্রোকাস সিটি হলের একটি কনসার্টে হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছিলো।

এ ঘটনার জন্য মস্কো ইউক্রেনকে দোষারোপ করলেও পরবর্তীতে হামলার দায় স্বীকার করেছিলো সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট আইএস।

এরপর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, “রাশিয়া ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।”

মূলতঃ তারপরেই হামলাকারীদের গ্রেফতারে জোরালোভাবে অভিযান শুরু করে রুশ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

পরবর্তীতে মস্কো হামলায় জড়িত সন্দেহে গত এপ্রিলে দাগেস্তান থেকে চারজনকে গ্রেফতার করেছিলো রুশ গোয়েন্দারা।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

মস্কো হামলার তিন মাস

প্রায় তিন মাস আগে, ২২শে মার্চ মস্কোর ক্রোকাস সিটি হলের একটি কনসার্ট ভেন্যুতে হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে দেড়শোর কাছাকাছি মানুষ নিহত হন।

ক্রোকাস সিটি হলটি মস্কো শহরের উপকণ্ঠে এবং ক্রেমলিন থেকে ১২ মাইল দূরে।

হামলার দিন সন্ধ্যায় বন্দুকধারীরা যখন হামলা শুরু করে তখন সেখানে রক গ্রুপ পিকনিকের একটি কনসার্ট শুরুর প্রস্তুতি চলছিল।

ভিডিওতে দেখা যায়, কনসার্ট হলে ঢোকার আগে থেকেই কমপক্ষে চারজন এলোপাথাড়ি গুলি করে।

একজন নারী বলছিলেন যে, যখন গুলির শব্দ শোনা যায় তখন মিলনায়তনের ভেতরে তিনিসহ অন্যরা মঞ্চের দিকে এগুচ্ছিলেন।

“আমি অস্ত্রসহ এক ব্যক্তিকে দেখলাম একটি স্টলে এবং সে সময় গোলাগুলি হচ্ছিলো। তখন আমি হামাগুড়ি দিয়ে একটি লাউডস্পিকারের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করি,” তিনি বলছিলেন রাশিয়ার একটি টিভিকে।

এক পর্যায়ে হলের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয়া যায়। আগুন পরে সামনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সাত তলা ভবনের ওপরের দুই তলার কাঁচ উড়ে যায়।

রাশিয়ার তদন্ত কমিটি বলেছে, “সন্ত্রাসীরা কনসার্ট হল প্রাঙ্গণে আগুন দেয়ার জন্য দাহ্য জাতীয় তরল পদার্থ ব্যবহার করেছে। সেখানে দর্শকরা ছিলো, যাদের অনেকেই আহত হয়েছে”।

মস্কো হামলায় গ্রেফতার ২৫ বছর বয়সী তাজিক নাগরিক ফরিদুনি শামসিদ্দিন

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, মস্কো হামলায় গ্রেফতার ২৫ বছর বয়সী তাজিক নাগরিক ফরিদুনি শামসিদ্দিন

পরে হেলিকপ্টার এনে ১৬০ টন পানি দেয়া হয়, কিন্তু তারপরেও আগুন পুরোপুরি নেভাতে ১০ ঘণ্টার মতো সময় লেগেছে। এর মধ্যে সন্দেহভাজনরা সরে পড়ে।

পুরো হামলার ঘটনাটি ছিলো ২০ মিনিটের মতো। এতে নিহত হন শতাধিক মানুষ এবং আহত হন বহু মানুষ।

অনেকেই নিহত হন গুলিতে। কিছু মানুষ নিহত হন ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়।

হামলার পর ফরিদুনি শামসিদ্দিন, দালেরদজন মিরজোয়েভ, সাইদাক্রামি মুরোদালি রাচাবালিদোজা এবং মুহাম্মদ সোবির ফায়জভ নামে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়।

তারা সবাই তাজিকিস্তানের নাগরিক বলে জানানো হয়েছিলো।

রাশিয়া কেন হামলার লক্ষ্যবস্তু?

আইএস-কে যে রাশিয়ায় হামলা চালিয়েছে, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

আইএস-কে কয়েকটি রাষ্ট্র বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইসরায়েল, এবং ইহুদি, খ্রিস্টান, শিয়া মুসলিম, তালেবান এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের সমস্ত শাসককে শত্রু হিসেবে গণ্য করে।

মূলত: তারা যাদেরকে 'ধর্মত্যাগী' মনে করে, তারাই তাদের শত্রু। আর সে তালিকায় প্রথমদিকেই রয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়ার সাথে ইসলামিক স্টেটের শত্রুতা শুরু হয়েছিলো গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক এবং ২০০০ সালের প্রথম দিকে চেচনিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে।

মস্কোর সেনারা তখন চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনিকে রীতিমত ধ্বংস করে দিয়েছিল।

সবশেষ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সাথেও নিজেকে জড়িয়েছে রাশিয়া। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে যুদ্ধ করছে রুশ সেনারা।

মস্কোর ক্রোকাস সিটি হলে কনসার্টেও বন্দুকহামলার পর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিলো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মস্কোর ক্রোকাস সিটি হলে কনসার্টেও বন্দুকহামলার পর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিলো

রুশ বিমান বাহিনীর সদস্যরা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অবস্থানকে লক্ষ্য করে অগণিত বোমা হামলা চালায়।

এভাবে ইসলামিক স্টেট গ্রুপ এবং আল-কায়েদার বিপুল সংখ্যক যোদ্ধাকে তারা হত্যা করে।

আইএস-কে আফগানিস্তানে রাশিয়াকে তালেবানের মিত্র হিসাবে দেখে। মূলত: এ কারণেই তারা ২০২২ সালে কাবুলে রুশ দূতাবাসে হামলা চালিয়েছিলো।

এছাড়া ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছর তৎকালীন সোভিয়েত সৈন্যরা যেভাবে আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব চালিয়েছিলো, সেটি নিয়েও আইএস-কে’র মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

আইএস-কে রাশিয়াকে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে দেখে। মস্কো হামলার পর পোস্ট করা ভিডিওতে তারা খ্রিস্টানদের হত্যার কথা উল্লেখ করেছে।

তাজিকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশের অভিবাসী শ্রমিকরা মাঝে মধ্যেই রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এফএসবি) সদস্যদের হাতে হয়রানির শিকার হয়ে থাকে।

সেই রাশিয়াকে এখন আইএস-কে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে।

কারণ প্রতিবেশি ইউক্রেনের সাথে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে থাকায় সহজেই দেশটিতে অস্ত্র পাওয়া যায় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও খুব একটা জোরালো ছিল না।