অন্তরালের আলোচনায় 'যুদ্ধবিরতি' ও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা লঙ্ঘনের অভিযোগ

গত ১২ দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত চলছে। পরিস্থিতি নাটকীয়তায় মোড় নেয় যখন মধ্যরাতে কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা চালায় এবং এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েল-ইরানের যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার কথা জানান।

একটি উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই মাত্র কয়েক ঘণ্টায় চরম সংঘাতপূর্ণ অবস্থা থেকে দুই দেশ কীভাবে যুদ্ধবিরতি রাজি হলো কিংবা আড়ালে কী হয়েছিল সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।

বিবিসি ফার্সি সার্ভিসের খবর বলা হয়, ট্রাম্প কাতারের আমিরকে ইরানকে যুদ্ধবিরতির জন্য রাজি করাতে বলেছিলেন এবং এই মধ্যস্থতা ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে।

কীভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে তার একটা ব্যাখ্যাও পাওয়া গেছে ওই খবরে।

মঙ্গলবার সকালে যখন যুদ্ধবিরতিতে সম্মতির কথা দুই দেশই জানিয়েছে, তখন উভয় দেশই নিজেদের অর্জনের কথাই বলেছে।

বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট তার বিশ্লেষণে বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি টানা ১২দিন পর দুই দেশের সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেবে।

তিনি বলেছেন, "বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধের শুধু প্রথম অধ্যায়ের ইতি ঘটেছে। এটা নিঃসন্দেহে ইরান ও ইসরায়েলের মতো চিরশত্রুদের মধ্যে শান্তির সূচনা নয়"।

যুদ্ধবিরতির কথা দুই দেশের পক্ষ থেকে বলার পরও মঙ্গলবার বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে ইসরায়েলে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দাবি করে, তারা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। তবে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা অস্বীকার করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

মার্কিন ঘাটিতে হামলার পরই আলোচনা শুরু?

গত ১৩ই জুন থেকে ইসরায়েলের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছিলো ইরান। তবে শনিবার রাতে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বিমান হামলার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় দেশটি।

এর জবাবে সোমবার রাতেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

এ সময় কাতারের রাজধানী দোহার আকাশে বিকট শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে প্রতিহত করার সময় আকাশে আলোর চোখ ধাঁধানো ঝলক ধরা পড়েছে সেই সময়ে তোলা ভিডিওগুলিতে।

ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সংঘর্ষের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মাত্রা সম্প্রতি নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় আট হাজার মার্কিন নাগরিক রয়েছেন।

এটি ওই অঞ্চলে সমস্ত বিমান অভিযানের মার্কিন সামরিক সদর দফতর। কিছু ব্রিটিশ সামরিক কর্মীও 'রোটেশনে' ওই ঘাঁটিতে কাজ করেন।

কাতার সরকার জানিয়েছে, ইরানের তরফে চালানো হামলায় কারও মৃত্যু হয়নি বা কেউ আহতও হননি। ওই ঘাঁটিটি আগেই খালি করে দেওয়া হয়েছিল।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক স্টেফান ফ্রুহলিং বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে ইরানের পাল্টা হামলার উদ্দেশ্য ছিল মূলত "প্রতীকী"।

তিনি বলেন, "এই সতর্কতার মাধ্যমে ইরান বোঝাতে চেয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বড় সংঘাতে জড়াতে চায় না।"

ফ্রুহলিংয়ের মতে, ইরানের পক্ষ থেকে সময় ও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে আগাম জানানো হয়েছে যাতে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারে।

তিনি যোগ করেন, এই সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারকে এক ধরনের বার্তা যে ইরান সংঘাত সীমিত রাখতে চায় শুধু ইসরায়েলের সঙ্গেই। কারণ, সংঘাত বাড়লে তারা সামরিকভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে।

যেভাবে যুদ্ধবিরতিরে রাজি হলো দুই দেশ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, সোমবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে ফোনালাপের যুদ্ধবিরতির প্রসঙ্গ তোলেন।

আর তার প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা ইরানের সঙ্গে কথা বলেন বলেও ওই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিবিসির পারসিয়ান সংবাদদাতা বলেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের আমিরকে মধ্যস্থতা করতে এবং ইরানকে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাজি করাতে বলেছিলেন।

মার্কিন সরকারি কর্মকর্তার বরাতে এই খবরে বলা হয়, একই সময়ে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর জন্য কাতারি প্রধানমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করছিলেন।

ওই কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেছেন, ইসরায়েল এই শর্তে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে রাজি হয়েছে যে ইরান নতুন আক্রমণ শুরু করবে না। তেহরান চুক্তিটি মেনে চলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে বলে ওই একই সূত্র জানিয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেছেন যে ইরানি পক্ষের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যোগাযোগ হয়েছে এবং এতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের অংশগ্রহণ ছিল।

যুদ্ধবিরতি 'মিনতি' করে নিয়েছে ট্রাম্প, দাবি ইরানের

মঙ্গলবার ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম এই যুদ্ধবিরতির কথা জানান।

ইরানের স্থানীয় সময় ভোরে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লিখেন, স্থানীয় সময় ভোর চারটা পর্যন্ত ইসরায়েলের 'আগ্রাসন' প্রতিহত করার জন্য সর্বোচ্চ লড়াই করেছে ইরান।

এজন্য তিনি দেশের সামরিক বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, স্থানীয় সময় ভোর চারটার পর যদি তার দেশের ওপর আর হামলা না হয়, তাহলে ইরানও আর পাল্টা হামলা চালাবে না।

তবে মি. আরাঘচির এই স্ট্যাটাসের আগ পর্যন্ত ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে একটি 'দাবি' হিসেবেই দেখা হচ্ছিলো।

কেননা, মি. আরাঘচির এই ঘোষণার পরও সকাল থেকে কয়েক দফায় ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

এই হামলায় অন্তত চারজন নিহতের খবরও জানায় ইসরায়েলের ফায়ার সার্ভিস।

এর কিছুক্ষণ পরে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে লিখেছেন, 'যুদ্ধবিরতি এখন থেকে কার্যকর হয়েছে, অনুগ্রহ করে কেউ এটি লঙ্ঘন করবেন না"।

যদিও ঠিক একই সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিউজ চ্যানেল আইআরআইএনএন জানিয়েছে, কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের 'সফল' হামলার পর এই যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির জন্য 'মিনতি' করেছিলেন এবং এই বিবৃতিটি উপস্থাপক পড়ে শোনান।

বিবৃতিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি সেনাবাহিনীর প্রশংসা করা হয় এবং ইরানিদের প্রতিরোধকে সম্মানও জানান হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ ইসরায়েলের

সোমবার গভীর রাত থেকে ইসরায়েল ইরান দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এরমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোরে যুদ্ধবিরতির কথা জানান।

এর পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও যুদ্ধবিরতির কথা জানিয়েছিল।

কিন্তু ইসরায়েলের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা পর্যন্ত ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মতির কথা জানিয়েছে ইসরায়েল সরকার।

এই বিবৃতিতে বলা হয়, ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে ইসরায়েল এর কঠোর জবাব দেবে।

ইসরায়েল সরকার বিবৃতিতে জানায়, ইরানের চালানো হামলায় তাদের লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় তারা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।

বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ইসরায়েল "ইরানের সামরিক নেতৃত্বের ওপর গুরুতর আঘাত হেনেছে এবং ইরানের কেন্দ্রীয় সরকারের অন্তত কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে।"

এটিকে তাদের সফলতা হিসেবেই বর্ণনা করা হয় বিবৃতিতে। একই সাথে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে সরকারী লক্ষ্যবস্তুতে মারাত্মক হামলা চালিয়ে শত শত আধা সামরিক বাহিনীকে নির্মূল করেছে, বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।

একই সাথে ইসরায়েল বিবৃতিতে জানায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও একজন জ্যেষ্ঠ পারমাণবিক বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে তারা।

বিবৃতির শেষে প্রতিরক্ষায় সহায়তা এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূলে অংশগ্রহণের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানায় ইসরায়েল।

এদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে।

তারা বলেছে যে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা "হুমকি প্রতিহত করার জন্য কাজ করছে"। সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকতে বলেছে তারা।

দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ একটি বিবৃতি জারি করেছেন, যেখানে তিনি ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীকে "তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে তীব্র হামলা চালিয়ে ইরানের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জোরালো জবাব দেওয়ার" নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা অস্বীকার করে খবর প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গত কয়েক ঘণ্টায় ইসরায়েলের দিকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথা অস্বীকার করেছেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ আবদুর রহিম মুসাভি।

এছাড়া ইরানের উত্তরাঞ্চলে একটি হামলাকে 'সন্ত্রাসী হামলা' অভিহিত করে ইরানি গণমাধ্যম দাবি করছে, এই হামলার পেছনে ইসরায়েলের হাত রয়েছে। ওই হামলায় ৯ জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হওয়ার খবর জানানো হয়েছে।

এদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছে, "পরবর্তী যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরান একটি সিদ্ধান্তমূলক, দৃঢ় এবং সময়োপযোগী প্রতিক্রিয়া দেখাবে"।