সরকারকে 'ব্যর্থ প্রমাণে চেষ্টার' অভিযোগ নিয়ে বিএনপিতে ক্ষোভ

দলের অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিচ্ছেন তারেক রহমান

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL

ছবির ক্যাপশান, দলের অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিচ্ছেন তারেক রহমান (ফাইল ছবি)
    • Author, সৌমিত্র শুভ্র
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে "রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে চেষ্টা করছে," সরকারের একজন উপদেষ্টার এমন মন্তব্যকে 'রাজনীতিবিরোধী' বলে অভিহিত করেছেন বিএনপি মহাসচিব।

কয়েক মাসে জুলাই অভ্যুত্থানের মিত্রদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিভেদ সামনে এলেও সরকারকে 'ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টার' সরাসরি অভিযোগ এর আগে শোনা যায়নি।

বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলামে সঙ্গে বৈঠকে একটি বিদেশি প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে সংস্কার ও নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।

এ সময় মি. ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো চাচ্ছে তাদের অধীনে সংস্কার হোক। তাই তারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। তারা সংস্কারের পরিবর্তে নির্বাচনকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছিল।

সংবাদটি প্রকাশের পর বিজ্ঞপ্তি পাঠানো জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ জসীম উদ্দিনকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে মি. জসীম উদ্দিন বলেছেন, তথ্য উপদেষ্টা ওই কথা বলেননি। তিনি (জসীম) অসাবধানতা বশত ভুল বক্তব্য দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছিলেন।

অবশ্য, আগের বার্তাটি নাকচ করে মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

নাহিদ ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে, মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, এ বিষয়ে উপদেষ্টার বক্তব্যই চূড়ান্ত বলে ধরে নিতে হবে।

"কারণ তিনি গণমাধ্যমের উদ্দেশে কোনো কথা বলেননি। একান্ত বৈঠকে কথা বলেছেন," যোগ করেন ওই কর্মকর্তা।

তথ্য উপদেষ্টা 'ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টার' সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম বলেন নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে এটি বিএনপিকে উদ্দেশ করেই বলা হয়েছে।

তাছাড়া, ওই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিএনপি'র তরফে আসা প্রতিক্রিয়াগুলোও একই ধারণা দেয়।

বিএনপি বলছে, সংস্কারের ক্ষেত্রে তারা সরকারকে সহযোগিতা করছে।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলের সাথে মতের ফারাক থাকলেও এতে জটিলতা হবে না।

বিএনপি কী বলছে?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

"এ ধরনের বক্তব্য রাজনীতিবিরোধী" উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন "রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে সমর্থন করছে"।

বৃহস্পতিবার লন্ডন থেকে ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।

বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদও তথ্য উপদেষ্টার অভিযোগকে নাকচ করে বলেন, তাদের মনোযোগ কাউকে ব্যর্থ প্রমাণ করার দিকে নয়।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলীয় এক অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, 'সরকারের সমালোচনা করা মানে সরকারকে ব্যর্থ করা নয়।'

"একজন উপদেষ্টার এ ধরনের কথা বলা সমীচীন নয়। কারণ, যে শেখ হাসিনা গণতন্ত্র আটকে দিয়েছিল… আপনাদের কথা সেই শেখ হাসিনার মতো হবে কেন," যোগ করেন তিনি।

বিকেলে আরেক অনুষ্ঠানে মি. রিজভী বলেন, নির্বাচনের কথা শুনলেই যেন রিঅ্যাকশন হচ্ছে কোনো জায়গায়।

বিএনপি'র এই প্রতিক্রিয়া দেখানো খুব স্বাভাবিক বলে মনে করেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন।

"আগের 'কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোও' এই টোনে বলতো। তেমন প্রতিধ্বনি বলে মনে হচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন অধ্যাপক নাসরীন।

বুধবার ব্রিটিশ গ্লোবাল পার্টনার্স গভর্ন্যান্স এর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম

ছবির উৎস, BSS

ছবির ক্যাপশান, বুধবার ব্রিটিশ গ্লোবাল পার্টনার্স গভর্ন্যান্স এর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম

ভিন্ন অবস্থানের কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া কি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে?

সংস্কারের ব্যাপারে একমত হলেও সেই সংস্কারের মাত্রা এবং প্রয়োজনীয় সময়ের প্রশ্নে সরকার ও বৈষম্যবিরোধীদের সাথে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি'র ভাবনা যে এক নয় সেটি বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে একাধিকবার উঠে এসেছে।

বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, নির্বাচনের জন্য জরুরি সংস্কার করতে কতটুকু সময় লাগবে, সেটা 'ক্যালকুলেশন' (হিসাব) করেই তারা সময়সীমার কথা বলেছেন।

"আমরা কাউকে ব্যর্থ প্রমাণ করার ব্যাপারে মনোযোগী নই," যোগ করেন মি. আহমেদ।

সরকার গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোতে বিএনপি তাদের মতামত জমা দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের উদ্যোগে সহায়তা করছে বলে দাবি দলটির।

জরুরি কিছু সংস্কার কার্যক্রম না করে নির্বাচন দিলে কার্যকর হবে না বলে মনে করেন সালাউদ্দিন আহমেদ। তবে, জরুরি সংস্কারগুলোই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে অভিমত তার।

"কারণ, নির্বাচিত পার্লামেন্ট ছাড়া অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্কার করা সম্ভব হবে না," বলেন মি. আহমেদ।

একটি দোকানে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছবি টাঙানো।

ছবির উৎস, SAUMITRA SHUVRA

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি শুধু জরুরি সংস্কার করে নির্বাচন দেয়ার পক্ষে

রাষ্ট্র সংস্কারে ছয়টি কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।

সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কারে কমিশনসমূহ গঠনের পর বিএনপির পক্ষ থেকে ওই বিষয়গুলোতে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করতে ছয়টি কমিটি গঠন করা হয়।

সালাউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এর মধ্যে চারটি কমিশনে নিজেদের সংস্কার প্রস্তাব জমা দিয়েছে বিএনপি।

কমিশনগুলোকে প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।

এরপর আবার রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা।

"সেখানে দেখা যাবে অধিকাংশ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হবে। যেসব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যাবে না সেখানে কথা বলা যাবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ।

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও মনে করেন, বিএনপি'র প্রস্তাবের সঙ্গে অনেক কিছু 'কমন' (অভিন্ন) থাকতে পারে।

"বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যখন কথা হবে তখন তো সব দলের অভিমতই আসবে,' বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অধ্যাপক নজরুল।

এর ফলে, মত বা অবস্থানের ফারাক থাকলেও জটিলতা হবে না বলে মনে করেন আইন উপদেষ্টা।

"আশা করবো শুধুমাত্র নিজের দলীয়টাতে সীমাবদ্ধ না থেকে, সবাই একটা কনসেনশাসের (ঐকমত্য) দিকে যেন লক্ষ্য রাখে," যোগ করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, সংস্কারও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ।

"বিএনপি অনেকদিন ধরে বলার চেষ্টা করছে বিরাজনীতিকরণ এবং মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে," বলছিলেন অধ্যাপক নাসরীন।

তিনি মনে করেন, সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক হচ্ছে না বলে দলগুলোকে দূরে রেখে সংস্কার এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা দৃশ্যমান হচ্ছে। যার বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে ঘটছে।