খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের তিন মেয়াদে আলোচিত ১০টি ঘটনা

বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ছিলেন

ছবির উৎস, FARJANA K. GODHULY/AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ছিলেন
    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ছিলেন।

১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কখনো কোনো আসনে পরাজয়ের মুখ দেখেননি তিনি।

এমনকি যেসব নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারেনি সে সময়ও যতটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন সবগুলোতেই জয় লাভ করেছিলেন খালেদা জিয়া।

এই পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে ২৩ টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রত্যেকটিতেই জয় লাভ করেন তিনি।

ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, লক্ষীপুরের বিভিন্ন আসন রয়েছে এই তালিকায়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সদ্য প্রয়াত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চার দশকের পথচলায় যেমন ছিল ক্ষমতার উত্থান ও পতন, কারাবাসেসর ইতিহাস রয়েছে, তেমনি ছিল প্রবল রাজনৈতিক বৈরিতাও।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার নেওয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্ত যেমন: দশম শ্রেণি পর্যন্ত নারী শিক্ষা অবৈতনিক করা, ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি চালু, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনসহ নানা পদক্ষেপ তাকে অন্যদের চেয়ে পৃথক করেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তেমনি তার মেয়াদে জঙ্গি উত্থান, দুর্নীতির শীর্ষস্থানে থাকা, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বেশ কিছু ঘটনা নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে।

এছাড়া জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক নানা দলের সাথে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির সম্পর্ক নিয়েও সমালোচনা রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এই লেখায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার তিন মেয়াদের দশটি আলোচিত ঘটনা তুলে ধরা হলো।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
খালেদা জিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথম মেয়াদে খালেদা জিয়া দ্বাদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনেন।

সংসদীয় গণতন্ত্র ফেরান খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে অভিষেক আশির দশকে। সে সময় জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন চলছিল।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনবার গ্রেফতার হয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

এরশাদ সরকার পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে বিএনপি।

পরের মাসেই ২০শে মার্চ, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ গ্রহণ করে ইতিহাস গড়েন মিসেস জিয়া।

এর আগে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠন করে রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

আবার ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পুনঃপ্রবর্তন করে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু ছিল।

১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথম মেয়াদে খালেদা জিয়া দ্বাদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনেন।

মেয়ে শিক্ষার্থীরা স্কুল ছুটির শেষে বের হচ্ছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম মেয়াদে খালেদা জিয়া অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন, দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে ছাত্রীদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।

বিনামূল্যে নারী শিক্ষা

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম মেয়াদেই শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন খালেদা জিয়া।

যা দেশের নারী শিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এই মেয়াদেই অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন, দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে ছাত্রীদের লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন খালেদা জিয়া।

একইসাথে ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি প্রবর্তন এবং শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চালু করা হয়।

বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞান কোষ বাংলাপিডিয়াতে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার আমলে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির হার ৯৭ শতাংশে উন্নীত করা হয় এবং পরবর্তীতে ছাত্রীদের শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক করা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, " টিউশন ফ্রি শুধুমাত্র সরকারি স্কুলের জন্য। সরকারি প্রাথমিক স্কুল বরাবরই ফ্রি ছিল। সেটা তিনি মাধ্যমিক পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। দেশের বিশাল অংশের বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ পেতো না।"

ভ্যাট চালু

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে অর্থনীতিতে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল ভ্যাট কার্যকর।

যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অধ্যাদেশ জারি করে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।

কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সেটিকে আইনে পরিণত করে ও বাস্তবায়ন করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভ্যাট চালু করাকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে দেখা হয়। কারণ এটি সরকারের জন্য করের আওতা বৃদ্ধি ও রাজস্ব অনেক বাড়িয়ে দেয়।

যদিও সেই সময় ব্যবসায়ীদের অনেকে এর বিরোধিতা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও বিএনপি সরকার ভ্যাট ব্যবস্থা কার্যকর করেছিল।

১৫ ই ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা

প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।

ওই আন্দোলন সত্ত্বেও ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছিল বিএনপি।

এক দলীয় নির্বাচনের অভিযোগ এনে অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন বর্জন করে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে এই নির্বাচন বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে অধিক পরিচিত।

বিরোধী দলহীন ওই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তবে এই সংসদ টিকেছিল কেবল মাত্র ১২ দিন।

হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি, পুলিশের কঠোর অবস্থান

ছবির উৎস, BANGLADESH-STRIKE

ছবির ক্যাপশান, ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ব্যাপক প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়া দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন, এই ষষ্ঠ সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল পাস করা হয়।

কিন্তু পরে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ব্যাপক প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দেন খালেদা জিয়া।

পরে ১৯৯৬ সালের ৩০ শে মার্চ একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি।

পরবর্তীতে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ ই জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী লীগের কাছে পরাজিত হয়।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার আসনে বসেছিলেন।

পরিবেশ সংরক্ষণে পলিথিন নিষিদ্ধ

বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ চার-দলীয় জোট সংসদে দুই-তৃতীয়াংশেরও অধিক আসনে জয় লাভ করে।

১০ই অক্টোবর খালেদা জিয়া তৃতীয় বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

তৃতীয় এই মেয়াদে পরিবেশ সংরক্ষণে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জোট সরকার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছিল।

এর মধ্যে ২০০২ সালে পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত ছিল সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য।

বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশ সে সময় এই সিদ্ধান্ত নেয়।

এই পদক্ষেপ পরিবেশ আন্দোলনে দৃষ্টান্ত গড়ে তোলে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয় খালেদা জিয়ার সরকারের এই পদক্ষেপ।

গামছা দিয়ে দুইজনের চোখ বাঁধা, তাদের দুইপাশে সেনা বাহিনীর দুইজন সদস্য।

ছবির উৎস, সংবাদপত্র থেকে নেয়া

ছবির ক্যাপশান, সংবাদপত্রে ছাপা হওয়া অপারেশন ক্লিনহার্টের একটি চিত্র

অপারেশন ক্লিনহার্ট

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছর ২০০২ সালে আইন - শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়।

এক বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।

সন্ত্রাস নির্মূলে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

এমন প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালের ১৬ই অক্টোবর মধ্যরাত, কার্যত ১৭ই অক্টোবর থেকে সারাদেশে একযোগে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী।

যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছিল যে, এটি সেনাবাহিনী-পুলিশ-বিডিআরের যৌথ অভিযান।

প্রকৃতপক্ষে পুরো অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী। এই অভিযানই অপারেশন ক্লিন হার্ট নামে পরিচিত।

এই অভিযান নিয়ে সেসময় নানা অভিযোগ উঠেছিল।

সেনাবাহিনী বিভিন্ন জায়গায় যাদের আটক করে তাদের মধ্যে অন্তত ৪০ জনের বেশি ব্যক্তির হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ তার বইতে লিখেছেন, হিসেব ভেদে এই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪০ থেকে ৬৫ জন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সে সময় মিডিয়াতে ক্রসফায়ার শব্দ উল্লেখ করে অনেকেই এই অপারেশন ক্লিন হার্টে মারা গেছে বলে খবর প্রকাশ করে।

"এদের মধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছিল। অপারেশন ক্লিন হার্টের ভিকটিম তার দলের অনেকেই হয়েছিল সেসময়। তখন সমালোচনা হয়েছিল, খালেদা জিয়া দলের বিরুদ্ধে গেছেন। দলের কেউ হলেও ছাড় দেননি তিনি " বলেন মি. আহমদ।

সেনাবাহিনী ৮৪ দিন অভিযান পরিচালনার পর তাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

জারি করা হয় 'যৌথ অভিযান দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ২০০৩'। এর মাধ্যমে অপারেশন ক্লিনহার্টের অবসান ঘটে।

হেফাজতে যেসব মৃত্যু হয়েছে তাদের পরিবারের বিচার চাওয়ার পথও বন্ধ করা হয় এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে।

পরবর্তীতে ২০১২ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের জন্য দায়মুক্তির এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

এই রিটের পরিপ্রেক্ষিতেই হাইকোর্ট অপারেশন ক্লিন হার্টকে দায়মুক্তি দিয়ে জারি করা ওই অধ্যাদেশ অবৈধ ঘোষণা করে।

র‍্যাবের কয়েকজন সদস্য, হাতে অস্ত্র

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০০৪ সালে র‍্যাব গঠিত হয়

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) গঠন

২০০২ সালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় অপারেশন ক্লিন হার্ট পরিচালনার পরেও খুব বেশি উন্নতি হয়নি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০৩ সালে অপরাধ দমনের জন্য বড় অভিযান পরিচালনায় পুলিশ সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করে।

শুরুতে এই বাহিনীল নাম ছিল র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটিলিয়ন টিম বা র‍্যাট।

কিন্তু এই বাহিনীও পুলিশের অন্যান্য বাহিনীর তুলনায় আলাদা ভূমিকা রাখতে পারছিল না বলে বিবিসি বাংলার ২০২১ সালে প্রকাশিত এক খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। বাহিনীর নাম নিয়েও নানা সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।

পরে সরকার একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের চিন্তা করে যাতে সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও অন্তর্ভূক্ত করার কথা ভাবা হয়।

পরে ২০০৪ সালের ২৬শে মার্চ র‍্যাব গঠন করা হয়। বিভিন্ন বাহিনী থেকে এই বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, শীর্ষ জঙ্গি বিরোধী অভিযান, চরমপন্থিদের দমনের কারণে বাহিনী হিসেবে র‍্যাব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সেসময়। রাতারাতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিও ঘটে।

কিন্তু পরবর্তীতে তথাকথিত 'ক্রসফায়ারের' কারণে বাহিনী হিসেবে র‍্যাব সমালোচনার মুখে পড়ে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় থেকে বিএনপির ক্ষমতার মেয়াদ ২০০৬ সালে শেষ হওয়া পর্যন্ত র‍্যাবের সাথে বন্দুক যুদ্ধে ৩৮০ জন নিহত হয়েছে।

যদিও বিরোধী দলে যাওয়ার পরে বিএনপি র‍্যাবের বন্দুকযুদ্ধের ব্যাপক বিরোধীতা করে।

বিস্ফোরণের পর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে মানুষের সেন্ডেল, জুতা পড়ে থাকতে দেখা যায়। অবিস্ফোরিত গ্রেনেডও রয়েছে। দূরে কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার এক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলো ২৪ জন।

জঙ্গি তৎপরতা, একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা

খালেদা জিয়া তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়।

জেএমবি ও হুজিসহ ইসলামি মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটতে দেখা গেছে।

২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার এক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলো ২৪ জন।

এই ঘটনা একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা হিসেবে পরিচিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদের সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত ২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড ও বোমা হামলা।

"এটার কোনো ভালো তদন্ত হয় নাই। বলবো যে খুব হেলাফেলা করা হয়েছে এটা নিয়ে। তো এটার ফলে যেটা হয়েছে, দুই নেত্রীর মধ্যে রিকনসিলিয়েশনের আর কোনো জায়গাই থাকে না," বলেন মি. আহমদ।

২০০৫ সালের ১৭ই অগাস্ট বাংলাদেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা হয়।

ওই হামলায় দুই জন নিহত আর বহু মানুষ আহত হয়েছিল।

একযোগে হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজেদের সংঘবদ্ধ উপস্থিতির ঘোষণা করেছিল জঙ্গিরা।

সেদিন নিজেদের একটি প্রচারপত্র বা লিফলেটও ছড়িয়ে দিয়েছিল তারা।

পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছিল, জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) নামের একটি জঙ্গি গোষ্ঠী ওই হামলা করে।

বিবিসি বাংলার ২০২০ সালের ১৭ই অগাস্টের এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশিত হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জেএমবির বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে এতে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে গঠিত হয় জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি। তবে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দুই বছর প্রশিক্ষণ ও সংগঠনের দাওয়াতি কার্যক্রমের পরে ২০০১ সালে প্রথম জেএমবি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে।

জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা আমির শায়খ আবদুর রহমান গ্রেপ্তারের পর জবানবন্দিতে এমন তথ্য দিয়েছিলেন বলে ওই খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নাকচ করে দেয়।

জেএমবির আরেক নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই রাজশাহী ও নওগাঁ জুড়ে তাণ্ডব চালালে আলোচনায় উঠে আসে।

সেই সময় 'বাংলা ভাই' মিডিয়ার সৃষ্টি বলে মন্তব্য করেছিলেন বিএনপি-জামাত নেতৃত্বাধীন সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০০৫ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি জেএমবি ও জেএমজেবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে খালেদা জিয়ার সরকার।

কিন্তু এরপরেও ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ১৫৯টি মামলা হয় ৬৩ জেলায়।

তবে ২০০৫ সালের ১৪ই নভেম্বর ঝালকাঠিতে জঙ্গিদের বোমা হামলায় দুইজন বিচারক নিহত হওয়ার মামলায় পরবর্তীতে জেএমবির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

সেই মামলাতেই ২০০৬ সালের ছয়ই মার্চ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত।

ওই বছরেরই ১৬ই অক্টোবর একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০০৭ সালের ২৯শে মার্চ মধ্যরাতে জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ জেএমবির শীর্ষ ছয় নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

দশট্রাক অস্ত্র মামলায় লুৎফুজ্জামান বাবরকে আদালতে হাজিরা দিতে নেওয়া হয়েছে। হাত নাড়ছেন তিনি। সাথে পুলিশ ও আইনজীবী রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় করা মামলায় গত বছরের ডিসেম্বরে মৃত্যুদণ্ড থেকে হাইকোর্টের রায়ে খালাস পান লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ছয় জন।

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা

২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি - জামায়াতে ইসলামীর জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় যে ঘটনা সরকারের মধ্যে প্রবল অস্বস্তি তৈরি করেছিল তার মধ্যে অন্যতম ১০ ট্রাক সমপরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি।

সেসময় ওই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আটক করা হয় ২০০৪ সালের পহেলা এপ্রিল রাতে।

দুটি বড় ট্রলারে করে এসব অস্ত্র সমুদ্রপথে আনা হয় চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার বা সিইউএফএল জেটিতে।

সে সময় সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, সিইউএফএল জেটিতে এসব অস্ত্র খালাস হবার সময় পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সহায়তায় সেগুলো আটক করা হয়।

উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ছিল চীনের তৈরি একে-৪৭ রাইফেল, সেমি অটোমেটিক রাইফেল, রকেট লঞ্চার, রকেট শেল, পিস্তল, হ্যান্ড গ্রেনেড, বিপুল পরিমাণ গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্য।

বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের সেই ঘটনা ভারতের সাথে তৎকালীন বিএনপি সরকারের মধ্যে শীতল সম্পর্কের সূচনা করেছিল বলে পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন।

সে সময় দেশটির তৎকালীন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, ভারতের চাপে পড়েই বিএনপি সরকার সেসব অস্ত্র আটক করে। অন্যথায় সেসব অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে যেত।

বিএনপি অবশ্য বরাবরই দাবি করে করে, সরকার তখন ব্যবস্থা নিয়েছিল বলেই সেসব অস্ত্র আটক করা হয়েছে। সরকার যদি চাইতো তাহলে সেগুলো ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে যেত।

কিন্তু অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার পর থেকে বিএনপি সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায় বলে বিবিসি বাংলার ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এ ঘটনায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে অস্ত্র চোরাচালানের অভিযোগ এনে দুটি মামলা হয়।

২০১৪ সালের ৩০শে জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এই মামলার রায় দেয়।

এর মধ্যে অস্ত্র চোরাচালান মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে জোট সরকারের সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী (অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর), সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত।

অস্ত্র আইনে করা অন্য মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয় একই আসামিদের।

পরে অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনায় করা মামলায় গত বছরের ডিসেম্বরে মৃত্যুদণ্ড থেকে হাইকোর্টের রায়ে খালাস পান লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ছয় জন।

আর এ বছরের জানুয়ারিতে অস্ত্র আইনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ছয় জন খালাস পেয়েছেন হাইকোর্টে।

পাশাপাশি ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াসহ পাঁচজনের সাজা কমানো হয়েছে।

একজন ব্যক্তির হাতে থাকা ব্যাগভর্তি টাকা, উপচে ছড়িয়ে পড়েছে টাকা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার এই তৃতীয় মেয়াদে টানা চার বছর দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল

চার বার দুর্নীতিতে শীর্ষে দেশ

আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এর মধ্যে ২০০১ সাল ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছর।

ওই বছর দুর্নীতির সূচকের সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।

২০০২ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার এই তৃতীয় মেয়াদে টানা চার বছর দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল বলে জানান মি. আহমদ।