ঈদুল ফিতরের 'সবচেয়ে সুন্দর কেক' হিসেবে যে কেক খেতাব পেয়েছে

    • Author, চারুকেসি রামাদুরাই
    • Role, বিবিসি ফিচার

বিভিন্ন দেশ বা স্থানের ঐতিহ্যবাহী কেক তৈরি করা এক ধরনের চমৎকার শিল্পে পরিণত হয়েছে। কারণ এতে নানা ধরনের রং এবং বিভিন্ন স্বাদ জড়িয়ে থাকে।

তবে এখানে যে কেকের কথা বলা হবে তা অন্য যেকোনো প্রচলিত কেকের চাইতে একেবারেই আলাদা, এই কেকের ভেতরে লুকিয়ে আছে জটিল জ্যামিতিক নকশার একটি অনন্য বৈচিত্র্য।

একে অনেকটা কেলিডোস্কোপের সাথে তুলনা করা যায়, যেখানে একটি নকশা চারপাশে প্রতিফলিত হয়ে একটি প্রতিসম নকশা তৈরি করে।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর শহরের কাছেই রয়েছে ‘সেরি’ (শরিফা জয়নুন সংক্ষিপ্ত রূপ) নামের একটি ছোট বেকারি বা কেকের দোকান।

এর কর্ণধার শরিফা জয়নুন তার নিজ বাড়ির একটি অংশে এই বেকিং স্টুডিও চালু করেছেন।

সেখানে গেলেই এক ধরনের সুমিষ্ট, সমৃদ্ধ এবং মাখনের মতো ঘ্রাণ আপনাকে নাড়া দেবে। এটি হলো বিভিন্ন রঙিন স্তরযুক্ত কেকের ঘ্রাণ। যার স্থানীয় নাম কেক লাপিস। যার অর্থ লেয়ার কেক।

এই লোভনীয় সুগন্ধ মালয়েশিয়ায় আশ্চর্যজনক কিছু নয়। রমজানের শেষে এবং ঈদুল ফিতরের আগমন উপলক্ষে দেশটির মুসলমান সম্প্রদায় হরি রায়া নামে স্থানীয় এক উৎসব উদযাপন করে থাকেন।

এবং কেক লাপিস এই উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

সেরি একজন প্রকৌশলী হিসাবে তার একাডেমিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেও বর্তমানে তিনি পেশায় একজন বেকারি প্রস্তুতকারক।

তবে কেক বানানোর ক্ষেত্রে তিনি প্রকৌশলী জ্ঞানকে যুক্ত করেছেন।

যখন তিনি কেকের মিশ্রণটি পাত্রের ওপর হাত দিয়ে সমানভাবে ছড়িয়ে দেন, তখন সেই দৃশ্য দেখে মনে হবে এই লেয়ার কেক তৈরি করা কিছুটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানোর মতো।

রঙিন এবং জটিল নকশার এই বহু-স্তরযুক্ত মালয়েশিয়ান কেকটি প্রস্তুত করার জন্য শুধুমাত্র জ্ঞান এবং দক্ষতাই নয়, বরং প্রচুর ধৈর্য, নির্ভুলতা এবং স্থির হাতের প্রয়োজন।

ক্যারেন চাই নামে আরেকজন প্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করলেও বর্তমানে বেকারিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

তার বিভিন্ন নকশার কেক দেখে মনে হতেই পারে প্রকৌশল বিজ্ঞানের ডিগ্রি এই লেয়ার কেক তৈরির ক্ষেত্রে বেশ কাজে আসছে।

ক্যারেন চাই কুয়ালালামপুরের কাছে এক শান্ত শহরতলিতে তার নিজের রান্নাঘরে বেকিং স্টুডিও চালু করেছেন।

ফ্রান্সের প্যারিসের লে কর্ডন ব্লিউ-তে পেস্ট্রি আর্টের বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করার পর চাই যখন মালয়েশিয়ায় ফিরে আসেন, তখন তিনি তার মায়ের রেসিপি দিয়ে শুরু করেন।

তার মায়ের রেসিপি ছিল এই লেয়ার কেক। তিনি শুরুতে তার সব মনোযোগ লেয়ার কেক তৈরিতে ঢেলে দেওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এই স্তরবিশিষ্ট কেক প্রথমবার মালয়েশিয়ায় প্রতিবেশী ইন্দোনেশিয়া হয়ে সারাওয়াক রাজ্য হয়ে বোর্নিও দ্বীপে প্রবেশ করেছিল।

১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, ডাচ উপনিবেশকারীরা প্লেইন ইউরোপিয়ান স্পিট কেক প্রবর্তন করেন - যা দেখতে ময়দার স্তর দিয়ে তৈরি একটি ঘূর্ণায়মান কৌণিক চোঙের মতো।

ইন্দোনেশিয়ায় কেকটি তখন বাটাভিয়া (বর্তমানে জাকার্তা) নামে পরিচিত ছিল।

ইন্দোনেশিয়ানরা পরে এতে দারুচিনি, লবঙ্গ এবং জায়ফলের মতো স্থানীয় মশলা যোগ করে এই কেকটিকে ল্যাপিস লিজিটে পরিণত করে, যা প্রায়শই থাউসেন্ড লেয়ার কেক বা হাজার স্তরের কেক নামে পরিচিত।

১৯৭০-এর দশকে কেকটি প্রতিবেশী মালয়েশিয়ায় আসার পর, সারাওয়াক রাজ্যের মানুষেরা কেকটিকে একটি চমৎকার শিল্পকলায় উন্নীত করে।

যাতে যুক্ত হয় একাধিক স্তর এবং অজস্র রং। এর গন্ধ যতোটা সুমিষ্ট ততোটাই নরম এবং খেতে সুস্বাদু।

যদিও ক্লাসিক কেক ল্যাপিস প্রায়শই বাইরে থেকে দেখতে একটি সাধারণ রুটির মতো দেখায়, এটি কাটলে জটিল জ্যামিতিক প্যাটার্নের একটি ক্যালিডোস্কোপ বেরিয়ে আসে।

একে সারাওয়াক লেয়ার কেকও বলা হয়। কেক ল্যাপিসে সাধারণত ন্যূনতম ১২টি স্তর থাকে।

একটি বেকিং প্যানে প্রতি কয়েক মিনিট পর পর সাবধানে একের পর এক পাতলা বাটার বা মিশ্রণ যোগ করে কেক তৈরি করা হয়। যেন একটি স্তর থেকে আরেকটি স্তরকে ভিন্ন রঙে আলাদা করা যায়।

নিচের স্তরগুলো যেন পুড়ে না যায় তা নিশ্চিত করার জন্য ওভেনের প্রতিটি স্তর বেক করা হয়।

সাধারণ কেকগুলো বেকড হওয়ার পর দেখা যায় এর মিশ্রণটি ওপর থেকে হালকা হয়ে নিচের দিকে গাঢ় হয়েছে।

সেখানে এই রঙিন কেকগুলোয় ২০টি বা বেশি স্তরযুক্ত জ্যামিতিক প্যাটার্ন থাকে। এটা শেষ পর্যন্ত দেখতে কেমন হবে তা নির্ভর করে চূড়ান্ত প্যাটার্নের উপর।

কেকটি বেকড হওয়ার পর ঠান্ডা করা হয় এবং তারপর কেকটি মাঝ বরাবর আড়াআড়ি কেটে একেকটি টুকরার মাঝে ঘন জ্যাম বা কনডেন্সড মিল্ক লাগানো হয়। এরপর টুকরোগুলোকে আবার জোড়া দেয়া হয়।

এখানে জ্যাম বা কনডেন্সড মিল্ক আঠার মতো কাজ করে।

প্রায়শই, একটি জটিল প্যাটার্নের কেক তৈরির জন্য একাধিক ভিন্ন ভিন্ন নকশার লেয়ার কেক বেক করতে হয় এবং ওই প্রতিটি নকশার কেক থেকে আলাদা আলাদা টুকরো পুনরায় যোগ করা হয়।

ওই বিভিন্ন রঙের জ্যামিতিক প্যাটার্নটি পরে এক রঙের একটি পাতলা কেকের আবরণে ঢেকে দেয়া হয়। ওপরের ওই স্তরে কোনো রঙ বা প্যাটার্ন থাকে না।

অনেক সময় জ্যামিতিক প্যাটার্নের দুটি টুকরো জোড়া দেয়ার সময় মাঝে এক বা একাধিক এক রঙা কেকের স্তর যোগ করা হয়ে থাকে

যদি পুরো প্রক্রিয়াটি শুনতে বা পড়তে বিভ্রান্তিকর লাগে, তাহলে বেকারের জন্য এটি কেমন তা কল্পনা করুন।

এমনকি এই বেকারদের মধ্যে যারা সবচেয়ে অভিজ্ঞ তারাও কেক বেক করার আগে নকশার প্যাটার্নগুলো প্রথমে কাগজে এঁকে নেন।

ছবিতে পরিষ্কারভাবে প্রতিটি স্তরের ঘনত্ব এবং রঙ চিহ্নিত করা হয়। তারপরে তারা সেই নকশা অনুযায়ী ব্যাটার প্রস্তুত করেন এবং স্তর বসাতে থাকেন।

একটি জটিল জ্যামিতিক নকশা সম্পূর্ণ হতে আট ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, স্তর বিন্যাসের প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ভুল হওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যান্য সাধারণ লেয়ার কেকের চাইতে এই জটিল লেয়ার কেকটি তৈরি করা বেশ কঠিন, বলেছেন বেকার ক্যারেন চাই।

তিনি বলেছেন, এই কেক তৈরিতে যদি ভুল হয় তাহলে সেটি শুধুমাত্র কেকের টুকরোগুলো জোড়া দেয়ার পরেই বোঝা যায়। "তখন সমস্ত কঠোর পরিশ্রম পণ্ড হয়ে যায়।"

চাই তার মায়ের তৈরি ১৬-টুকরো নকশার কেকের ছবিগুলো দেখান। ওই কেকটি মূলত তার গণনার ত্রুটির ফলে তৈরি হয়েছিল।

" (আমার মা) ঘটনাক্রমে কয়েকটি অতিরিক্ত স্তর বেক করেছিলেন এবং সেই টুকরোগুলি ফেলে দিতে চাননি, তখন তিনি সেই টুকরোগুলো কেটে ফেলে আরেকটি ব্লক তৈরি করার চেষ্টা করেন, এবং তার ফলে এই নকশাটি বেরিয়ে আসে। সুতরাং, এটি এমন এক কেক যা আপনি অন্য বেকারি নির্মাতাদের কাছে পাবেন না।"

সেরি এবং চাই বলেছেন যখন কেক কাটার পর একটি নিখুঁত নকশা বেরিয়ে আসে তখন আমাদের এতো দীর্ঘ সময়ের কঠিন শ্রম দেয়া বেকিং প্রক্রিয়াটি স্বার্থক হয়।

চাই বলেন, "দুর্ভাগ্যবশত, এর কোনো শর্টকাট নেই,"।

সিরি এই পাতলা স্তরগুলোকে টুকরো করে তারপর রাস্পবেরি জ্যামের পুরু প্রলেপ দিয়ে আঠার মতো জোড়া লাগান।

এভাবে তার একটি জটিল ধাঁধা সমাধান করার কথা মাথায় আসে যা ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিয়েছে।

"এটি থেরাপির মতো, (কিন্তু) এটি মজাদার এবং সৃজনশীলও," তিনি বলেন।

গত বছর ঈদের আগে বেকারির কর্মীদের সপ্তাহ ধরে অবিরাম কাজ করে দেখা যায়। মুসলমানদের রায়া উৎসব উদযাপনের অর্ডারগুলি পূরণ করতে তার তিলমাত্র অবসরে ফুরসত ছিল না।

তারা সাধারণত তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব অর্ডার পেয়ে থাকেন।

সারওয়াক রাজ্যে চাইনিজ নববর্ষ, রায়া, ক্রিসমাস এবং বছরের মাঝামাঝি গাওয়াই দায়াক নামে ফসলের উত্সবসহ প্রতিটি ছুটির উৎসবে এই লেয়ার কেক মানুষের উদযাপনে অংশ হয়ে উঠেছে।

ফলে এই কেক আর কোনো ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

"আমার জন্য, কেক যে কোনো সময়ের জন্য উপযুক্ত, কিন্তু রায়া উৎসবে কেক থাকতেই হবে, এটা আবশ্যক," বলেছেন সেরির দীর্ঘদিনের গ্রাহক এবং কেক প্রেমী ফ্রেজেলা ওয়াট।

তিনি বলেছেন, দশ বছর আগে, লেয়ার কেক তার জীবনে যে সুখ নিয়ে আসে তা অতুলনীয়, কারণ এই কেকটির টেক্সচার ভারী এবং স্বাদ অন্য যে কোনো কেকের তুলনায় সমৃদ্ধ।

লেয়ার কেক চকোলেট, ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি, লাল ভেলভেট এবং পান্ডান (একটি শক্তিশালী গন্ধযুক্ত গ্রীষ্মমন্ডলীয় উদ্ভিদ, সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রান্নায় ব্যবহৃত হয়) সহ অনেক স্বাদে পাওয়া যায়।

এমনকি হরলিক্স এবং মাইলোর মতো জনপ্রিয় নোনতা পানীয়গুলো স্বাদ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

পেশাদার বেকারি নির্মাতারা, যেমন সেরি এবং চাই, তরুণ প্রজন্ম ও শিশুদের স্বাদের কথা মাথায় রেখে এই ঐতিহ্যবাহী কেকটি নতুনভাবে তৈরি করতে চাইছে।

তারা চান এতে যেমন নতুনত্ব থাকবে তেমনি এটি তৈরির মূল উপাদানগুলো অক্ষুণ্ন থাকবে।

উদাহরণস্বরূপ, সেরি তার কেক-এ বাটিকের বিস্ময়কর নকশা ব্যবহার করেছেন। বাটিক হলো এশিয়ার কিছু দেশে কাপড়ে রং রঞ্জনের শিল্প।

কিন্তু কেকের ওপর এই নকশা কেকটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এই কেকগুলোর উপরের স্তরে চকলেট দিয়ে আবরণ দেয়া হয়।

" লেয়ার কেক-এর মতো বাটিক মালয়েশিয়ায় একটি ঐতিহ্য, এবং আমি এই নতুন ডিজাইনটি তৈরি করতে দুটি শিল্পকে একত্রিত করেছি," তিনি বলেন।

ক্যারেন চাই তার কেকগুলো প্রতিনিয়ত যেমন জটিল ডিজাইনের দিয়ে তৈরি করছেন সেইসাথে নতুন উপাদান এবং স্বাদের সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছেন।

উদাহরণস্বরূপ, তিনি আগে ভেজিটেবল অ্যালবুমেনমুক্ত সহজ করে বললে ভেজিটেরিয়ান কেক তৈরি করেছেন।

এজন্য তিনি নারকেলের ময়দার সাথে পিনাট বাটার বা চিনাবাদামের মাখন যোগ করেছেন। সেইসাথে ডুমুর, এপ্রিকট এবং দারুচিনিও যোগ করেন।

একটি ভালো লেয়ার কেক তৈরি করতে অনেক সময় বেশ উন্নত মানের উপাদানের প্রয়োজন হয়, যার মানে কেকটি প্রস্তুত করা বেশ ব্যয়বহুল।

এ কারণে এক পাউন্ডের একটি বর্গাকার কেকের দাম পড়ে ৩০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত যা প্রায় ৬৩ ডলারের মতো পড়ে।

কিন্তু সৌভাগ্যবশত ছোট ছোট বেকারদের জন্য, এই ঐতিহ্যবাহী কেকটি কতিপয় গ্রাহকদের কাছে বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছে।

তাদের ক্রমাগত চাহিদা থাকায় তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত অর্ডার আসছে।

এই কেকটি কর্পোরেট এবং বিবাহের উপহার হিসেবে দেয়ার ক্ষেত্রেও জনপ্রিয়।

সমস্ত দীর্ঘ সময়, কঠোর শ্রম এবং সীমিত লাভ সত্ত্বেও, এই বেকাররা সারাওয়াকের এই রন্ধন ঐতিহ্য রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

সেরি বলেন "যতবার আমি লেয়ার কেকের একটি স্তর তৈরি করি, এটি আমার বাড়ির একটি আসবাবের মতো মনে হয়।"