সাংবাদিকদের সাথে ‘অনাকাঙ্খিত ঘটনায়’ ক্রিকেট বোর্ডের ক্ষমা প্রার্থনা, কী বলছেন লিটন দাস?

সাংবাদিকদের সাথে ঘটে যাওয়া এক ঘটনায় লিটন কুমার দাস তার ফেসবুক একাউন্টে পোস্ট দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও এই ঘটনার জন্য ‘ক্ষমাপ্রার্থী’ বলে আজ দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন বোর্ডের একজন পরিচালক।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শীর্ষ ক্রিকেটারদের একজন লিটন কুমার দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, পুনের টিম হোটেলে সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা সাংবাদিকদের হোটেল থেকে বের করে দেয়ার জন্য তিনি হোটেল কর্তৃপক্ষকে বলেছেন ।

এরপর সাংবাদিকদের অনেকেই এই ঘটনার জের ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে এই ঘটনার সময় টিম হোটেলের সামনে থাকা সাংবাদিক তাহমিদ অমিত বলেছেন, এই ঘটনায় প্রকাশ পায় ক্রিকেটাররা কী ধরনের মানসিক চাপে আছেন।

তিনি বলেন, “মানসিকভাবে লিটন দাস ঠিকঠাকভাবে নেই সেটা স্পষ্ট। যেটা হয়েছে সেটা তিনি ভিন্নভাবেও করতে পারতেন। আমরা যারা গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে ছিলাম আমরা অন্যান্য ক্রিকেটারদের সাথে কথা বলেছি।”

বিশ্বকাপে সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিক এম এম কায়সার পুনেতে টিম হোটেলের সামনে ছিলেন।

তিনি বলেন, “লিটন দাস যে ধরনের আচরণ করেছে সেটি ক্রিকেটীয় সভ্যতার সাথে যায়না। হয়তো কয়েকজন সাংবাদিক ছবি তোলার চেষ্টা করছিলেন তাতে লিটন দাস বিরক্ত হয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানান”।

এটা যদি তিনি টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে অভিযোগ করতেন অথবা মিডিয়া ম্যানেজারের কাছে বলতেন তাহলে আরও সুন্দর দেখাতো বলে মনে করেন সাংবাদিক এম এম কায়সার।

পরে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন লিটন দাস।

সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ দল এবং ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে বোর্ডের একজন পরিচালকও সাংবাদিকদের কাছে এই ঘটনার জন্য দু:খ প্রকাশ করেছেন ও ক্ষমা চেয়েছেন।

ভারতে বাংলাদেশ দলের সাথে থাকা বোর্ড পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশ দল এবং ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে এই ঘটনার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি আশা করবো আপনারা (সাংবাদিকরা) এতদিন আমাদের যেভাবে সমর্থন দিয়ে এসেছেন, বিশ্বকাপের বাকি ছয়টা ম্যাচেও সেভাবেই সমর্থন দেবেন।”

খালেদ মাহমুদ বলেছেন যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও এই বিষয়টি আমলে নিয়েছে। লিটন দাস কিছুটা ‘অস্বস্তি’ বোধ করছিলেন বলেই সাংবাদিকদের সাথে এই আচরণ করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

খালেদ মাহমুদ সুজন বলেন, “আজ সকালে লিটনের সাথে আমার এ বিষয়ে কথা হয়েছে। লিটন স্বীকার করেছেন যে তার ভুল হয়েছে এবং সে ‘কোনোভাবেই কাউকে ছোট করতে’ চায়নি। ক্যামেরা বারবার মুখের সামনে নিয়ে আসার কারণে কিছুটা ‘অস্বস্তি’ বোধ করায় সাংবাদিকদের সরিয়ে দিতে বলেছিল সে।”

গতকাল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোনও মিডিয়া কার্যক্রম ছিল না।

এমন সময়ে সংবাদ কর্মীরা জানতে পারেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ম্যানেজমেন্টের কেউ টিম হোটেলে কথা বলতেও পারেন। তখন টিম হোটেলের লবিতে অবস্থান নেন সাংবাদিকরা।

সেখানে নাজমুল হোসেন শান্ত, তাসকিন আহমেদরা ছিলেন। তারা সাংবাদিকদের সাথে হাসিমুখে কথা বলেন। কিন্তু লিটন কুমার দাস টিম হোটেলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি ভালোভাবে নেননি।

এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে একবার লিটন কুমার দাস ফেসবুক পোস্ট দিয়ে সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল আচরণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

তখন তিনি অভিযোগ তোলেন ‘কিছু টিআরপির জন্য কেউ কেউ ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত জীবনকে সবার সামনে হাস্যকরভাবে তুলে ধরেছেন’।

সে সময় একটি গণমাধ্যমে খবর এসেছিল, ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি নয়, বউয়ের টানে আইপিএল ছেড়েছিলেন লিটন দাস’।

সাম্প্রতিক সময়ে লিটন দাস ব্যাট হাতে খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন।

এই বিশ্বকাপের তিন ম্যাচের মধ্যে তার শুধুমাত্র ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭৬ রানের একটি ইনিংস আছে। বাকি দুই ম্যাচের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শূন্য আর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৩ রান তুলতে পেরেছিলেন।

এর আগে এশিয়া কাপে তিনি খেলতে পারেননি জ্বরের কারণে।

লিটন দাসকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটারদের একজন মনে করা হয়।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে লিটন দাস এখনও পর্যন্ত ৮ ম্যাচে আড়াইশোর মতো রান করেছেন। তার গড় রান ৩৯।

আফগানিস্তান ইংল্যান্ডকে ‘ধাক্কা’ দিলো

ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০২৩-এ প্রতিযোগিতার দিক থেকে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচটা খেলেছে আফগানিস্তান ও ইংল্যান্ড, এমনটা মনে করছেন অনেকেই।

একদম প্রথমদিন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ডের ম্যাচ থেকে শুরু করে হাই-ভোল্টেজ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচও হয়েছে একপেশে।

আফগানিস্তান ইংল্যান্ডকে ৬৯ রানের ব্যবধানে হারিয়েছে, চলতি বিশ্বকাপে রানের ব্যবধানের দিক থেকে এটাই সবচেয়ে ‘ছোট’ জয় এখনও পর্যন্ত।

এই ম্যাচে আফগানিস্তান ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং তিন বিভাগেই ইংল্যান্ডের চেয়ে ভালো করেছে এবং তাদের জয়টা পুরোপুরি প্রাপ্য বলে নিজের কলামে লিখেছেন বিবিসি স্পোর্টের ক্রিকেট প্রতিনিধি জনাথন অ্যাগনিউ।

তার মতে আফগানিস্তান সবসময়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেটটা খেলে, মাঝেমধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে বা শৃঙ্খলা থাকে না কিন্তু এই দলটার মধ্যে বিশ্বকাপে ভালো করার সব ধরনের রসদ আছে।

ক্রিকেটের জনপ্রিয় উপস্থাপক হারশা ভোগলে লিখেছেন, “প্রতিকূল অবস্থা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের কারণেই আফগানিস্তানের দলটা এতো ভালো ফল পেয়েছে”।

আফগানিস্তান ম্যাচের একদম শুরু থেকেই ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলেছে, ২১ বছর বয়সী রহমানুল্লাহ গুরবাজ, তিনি ৫৭ বলে ৮০ রানের একটি ইনিংস খেলেছেন, অপ্রয়োজনীয় রানের জন্য কষ্ট করে রান আউট না হয়ে গেলে এই ইনিংস আরও বড় হতে পারতো।

আরও বেশি হতে পারতো প্রথম ইনিংসে আফগানিস্তানের সংগ্রহও।

উদ্বোধনী জুটিতে ১১৪ রান তোলার পর আফগানিস্তানের ১৯০ রানের মধ্যে ৬ উইকেট চলে যায়। মিডল অর্ডারে উইকেট কিপার ইকরাম আলিখিল ৫৮ রান করায় সংগ্রহ কিছুটা বাড়তে থাকে।

তবে শেষদিকে ম্যাচ জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রান তোলেন রাশিদ খান ২৩ ও মুজিব উর রহমান ২৮।

আফগানিস্তানের শেষ চারজন ব্যাটার মোট রান নিয়েছেন ৫৮।

মুজিব ব্যাটিংয়ের পর বল হাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তিন উইকেট নিয়েছেন তিনি।

বিশেষত আফগানিস্তানের স্পিনাররা যেভাবে বল করেছেন সেটা ছিল ইংল্যান্ডের জন্য ভীতিকর।

একদম প্রথম ওভারেই মুজিব উর রহমান চাপ প্রয়োগ করেছেন, তার বলে রান নেয়া কঠিন হয়ে যায় ইংল্যান্ডের জন্য।

দ্বিতীয় ওভারেই এর ফল তুলে নেন ফজল হক ফারুকী।

তবে ইংল্যান্ড এই ম্যাচের শুরু থেকেই বেশ কিছু ভুল করেছে। প্রথমত দিল্লির ব্যাটিং বান্ধব উইকেটে টসে জিতে ফিল্ডিং নিয়েছেন জস বাটলার।

দলটির ফাস্ট বোলাররা এখনও পর্যন্ত ব্যর্থ, বিশেষত ক্রিস ওক্স এবারের বিশ্বকাপে পাওয়ার প্লেতে ১১ ওভার বল করে ১ উইকেট নিয়ে ৯৫ রান দিয়েছেন।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই হারে ইংল্যান্ডের জন্য বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের যাত্রা অনেক কঠিন হয়ে গেল, এখনও ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে খেলা বাকি আছে বর্তমান বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নদের।

অন্যদিকে এই ম্যাচটা আফগানিস্তানের ক্রিকেট ও দেশটির মানুষদের জন্য বিশেষ একটা জয়।

“এটা ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত”, ম্যাচ শেষে বলেছেন রাশিদ খান।

ম্যাচ সেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে মুজিব উর রহমান পশতু ভাষায় বলেন, “আমি আমার এই ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কারটি ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য উৎসর্গ করছি”।