'কয়েকজন বিচারপতির' তথ্য রাষ্ট্রপতির কাছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আসলে কী দেখে

বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংক্রান্ত একটি পরিষদ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল 'কয়েকজন বিচারপতির' বিষয়ে তদন্ত করে দেশটির রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে 'তথ্যাবলী' পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।

সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে "সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারপতির বিষয়ে তথ্যাবলী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট ইতোমধ্যে প্রেরণ করেছে।"

কোন কোন বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত হয়েছে সেটি অবশ্য কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি।

গত পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দশই অগাস্ট তখনকার প্রধান বিচারপতি-সহ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতিদের বাদ দেওয়ার দাবিতে উচ্চ আদালত ঘেরাও কর্মসূচি দিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা।

ওই দিনই প্রধান বিচারপতিসহ ছয় বিচারপতি পদত্যাগ করেছিলেন।

পরে গত ১৬ই অক্টোবর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আজিজ আহমদ ভূঞা জানিয়েছিলেন যে 'বারো জন বিচারপতিকে বেঞ্চ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি'।

এই বিচারপতিদের তখন ছুটিতে পাঠিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি এবং তার পর থেকে তাদের বিচারকার্য পরিচালনা থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

এরপর ২০শে অক্টোবর আপিল বিভাগ বিচারপতি অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত করে রায় দিয়েছে।

এসব কারণে ধারণা করা হচ্ছে যে এই বারো জন বিচারপতির বিষয়েই তদন্ত সম্পন্ন করেছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল।

সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক বলছেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তদন্ত করে রাষ্ট্রপতিকে জানাবেন অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে কিংবা হয়নি। "রাষ্ট্রপতির কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা," বলছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

কাউন্সিল কোন বিষয়গুলো দেখে

সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক বলছেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচারপতি ছাড়াও নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশনারদের দুটি বিষয়ে তদন্ত করে রাষ্ট্রপতিকে রিপোর্ট পাঠাতে পারে। একটি হল তাদের শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য আর দ্বিতীয়টি হল অসদাচরণ।

"রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বা অন্য কোনও সূত্র থেকে অভিযোগ পেলে তিনি সেটা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সলে তদন্ত ও সিদ্ধান্ত নিতে পাঠাবেন। কাউন্সিল তখন তদন্ত করবে এবং তাতে অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এরপর তারা অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে জানালে এবং তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে তার সুপারিশ করলে, রাষ্ট্রপতি সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অব্যহতি দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন শাহদীন মালিক।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলছেন, "একজন বিচারপতির যা করা উচিত নয়, তিনি যদি এমন কিছু করেন সেটিই তার অযোগ্যতা বা অসদাচরণ। সেটি দুর্নীতি বা অন্য কোনও কার্যক্রমের মাধ্যমে আচরণবিধি লঙ্ঘনও হতে পারে," বলছিলেন মি. মোরশেদ।

সংবিধানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের দু ধরনের কাজের কথা বলা হয়েছে। একটি হলো বিচারকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন আর অন্যটি হলো বিচারকগণের আচরণ ও সামর্থ্য সংক্রান্ত তদন্ত।

অর্থাৎ কোনও বিচারপতি সংবিধান লঙ্ঘন করলে কিংবা তার বিরুদ্ধে গুরুতর পেশাগত অসদাচরণের মতো অভিযোগ উঠলে তদন্তের কাজ করে থাকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, যেটি গঠিত হয় প্রধান বিচার ও অন্য দুজন সিনিয়র বিচারপতির সমন্বয়ে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর দফায় বলা আছে, একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকবে, যা এই অনুচ্ছেদে 'কাউন্সিল' বলে উল্লিখিত হবে এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিদের মধ্যে পরবর্তী যে দুজন কর্মে প্রবীণ তাঁদের নিয়ে গঠিত হবে।

২০০০ সালের মে মাসে তখনকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি বি বি রায় চৌধুরী ও বিচারপতি এ এম মাহমুদুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল দেশে প্রথমবারের মতো বিচারকদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করেছিল।

এছাড়া আপিল বিভাগ ষোড়শ সংশোধনী মামলায় উনচল্লিশটি এবং মো. ইদ্রিসুর রহমান বনাম সৈয়দ শাহিদুর রহমান মামলায় ৪০টি আচরণবিধি নির্ধারণ করেন।

ইদ্রিসুর রহমান মামলায় আদালত বলেন যে "প্রদত্ত আচরণবিধিসমূহ চূড়ান্ত নয় বরং ব্যাখ্যামূলক ও উদাহরণ স্বরূপ। একজন বিচারককে শত বছরের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুন ও নীতি-নৈতিকতা দ্বারা পরিচালিত হতে হবে।"

জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে ঘিরে যত ঘটনা

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে বিচারপতিদের অপসারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিলো জাতীয় সংসদের হাতে। তখন দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির হাতে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিলো।

এরপর চতুর্থ সংশোধনীতে বিচারপতিদের অপসারণের সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়া হয়। কিন্তু পঁচাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সংবিধানের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়েছিলো। তখন 'দ্য সেকেন্ড প্রক্লেমেশন (টেনথ অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডার, ১৯৭৭' জারি করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান যুক্ত করা হয়, যা বৈধতা পায় পঞ্চম সংশোধনীতে।

এরপর ১৯৮২ সালে আবার সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসককে দেয়া হয়। তবে ১৯৮৬ সালে আবার ফিরে আসে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। তবে ২০০৫ সালে পঞ্চম সংশোধনী আদালতে বাতিল হয়।

কিন্তু এই জুডিশিয়াল কাউন্সিল নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয় আওয়ামী লীগ পরে ক্ষমতায় এসে আবার বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়ার পর। এমন কী এ নিয়ে বিরোধের জের ধরে তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

দুই হাজার চৌদ্দ সালে সংসদে পাশ হওয়া ষোড়শ সংবিধানে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা আবার সংসদকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবী এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করেন।

২০১৬ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ওই সংশোধনী বাতিল করলে সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। পরে ২০১৭ সালের জুলাইতে আপিলটি খারিজ করে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল বহাল রাখে আপিল বিভাগ। তখন আপিল বিভাগ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ রায়ের পর আওয়ামী লীগের এক আলোচনা সভায় তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে নিয়ে বিষোদগার করেছিলেন।

তখন রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায় রিভিউয়ের আবেদন করলেও শুনানির কোনও উদ্যোগ নেয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন 'আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া বিচারপতিদের অপসারণে'র দাবি তোলে।

এরপর ১৬ই অক্টোবর বারো জন বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠান প্রধান বিচারপতি। আর ২০শে অক্টোবর রিভিউ আবেদনটির শুনানি করে বিচারপতি অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল করে রায় দেয় আপিল বিভাগ।

তখন রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন যে "আমাদের হাইকোর্টে কিছু বিচারক আছেন। ওনাদের ব্যাপারে সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রচুর কমপ্লেইন রয়েছে যে ওনারা জুলাই গণবিপ্লবে যে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি ছিল, সেই শক্তির একটা নিপীড়ক যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। তাছাড়া কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। ছাত্র-জনতার অনেকের এ ব্যাপারে ক্ষোভ রয়েছে।"

তিনি আরও বলেছিলেন, "এ সমস্ত ক্ষোভ সাংবিধানিকভাবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তির একটা অ্যাভিনিউ খুলে গেছে। তারপরেও উচ্চ আদালত স্বাধীন। উচ্চ আদালত উচ্চ আদালতের মতো করেই ব্যবস্থা নেবে।"

সবশেষ এখন সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইটে জানালো যে 'কয়েকজন বিচারপতির' বিষয়ে তদন্ত শেষ করে রাষ্ট্রপতির কাছে রিপোর্ট পাঠিয়েছে কাউন্সিল।