উত্তরপ্রদেশে মুসলিম ছাত্রকে কেন মার খেতে হল?

ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের এক স্কুল শিক্ষিকা এক মুসলমান ছাত্রকে অন্য ছাত্রদের দিয়ে মার খাওয়াচ্ছেন, এরকম একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। শুক্রবার রাত থেকে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরে শনিবার পুলিশ ওই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করেছে।

এর আগে ওই মুসলমান ছাত্রটির বাবা বলেছিলেন যে তিনি পুলিশের কাছে কোনও অভিযোগ দায়ের করবেন না।

অভিযুক্ত ওই শিক্ষিকা বিবিসিকে বলেছেন ভিডিওটি বিকৃত করে বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রঙ লাগানো হয়েছে।

ঘটনাটিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাহুল গান্ধী সহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা।

‘আরও জোরে মারো’

মুজফ্ফরনগর জেলার মনসুরপুর এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলের যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে তৃপ্তা ত্যাগী নামে এক শিক্ষিকা একটি মুসলমান ছাত্রকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন আর অন্য ছাত্রদের নির্দেশ দিচ্ছেন একে একে এসে ওই মুসলমান ছাত্রটিকে চড় মেরে যেতে।

মুজফ্ফরনগর থেকে বিবিসির সহযোগী সংবাদদাতা অমিত সাইনি জানাচ্ছেন যে ওই ভিডিওটি ২৪ অগাস্ট ধারণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে তিনি জানতে পেরেছেন।

ওই মুসলমান ছাত্রটি গণিতের নামতা ভুল করেছিল, তাই শিক্ষিকা তাকে তার ধর্মের প্রতি ইঙ্গিত করে সাজা দিচ্ছিলেন বলে লিখেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্র।

ভিডিওটিতে দেখা গেছে যে একজন একজন করে ছাত্রকে ডাকছিলেন ওই শিক্ষিকা আর তারা দাঁড়িয়ে থাকা মুসলমান ছাত্রটির গালে চড় মেরে যাচ্ছিল। কারও মার কমজোরি মনে হলে ওই শিক্ষিকাকে বলতে শোনা গেছে, “তুমি কীভাবে মারছো ? আরও জোরে মারো না কেন?... আচ্ছা এবার কে মারবে?”

ওই মুসলমান ছাত্রটিকে কাঁদতেও দেখা গেছে, তারপরেও ওই শিক্ষিকা বলছেন, “এরপরের বার কোমরে মারো... চলো.. মুখে আর মের না, মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। এবারে, কে আসবে?”

ওই শিক্ষিকাই স্কুলের মালিক

স্কুল শিক্ষা বিভাগের সার্কেল অফিসার রবি শঙ্কর জানিয়েছেন যে স্কুলটি একটি বড় হলঘরে চালানো হচ্ছে আর ওই শিক্ষিকার, তৃপ্তা ত্যাগীই স্কুলের মালিক।

তার কথায়, “তৃপ্তা ত্যাগীরই স্কুল ওটি। আমরা শিশুটির বাবার সঙ্গে কথা বলছি যাতে তিনি ঘটনাটি নিয়ে অভিযোগ জানান। তার অভিযোগ পেলেই আমরা এফআইআর করতে পারব আর আইনি ব্যবস্থা শুরু করা যাবে।“

শিশুটির বাবা বলছেন যে তিনি ওই স্কুলে আর তার সন্তানকে পাঠাবেন না। স্কুল থেকে তাকে এও জানানো হয়েছে যে এতদিন যে ফি তিনি দিয়েছেন, সেটা ফেরত দিয়ে দেওয়া হবে।“

তবে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ বিবিসিকে জানিয়েছে যে তারা ইতিমধ্যেই মামলা দায়ের করেছে।

মুজফ্ফরপুরের জেলাশাসক অরভিন্দ মাল্লাপ্পা বাঙ্গারি বলছেন, “অভিভাবকরা প্রথমে অভিযোগ দায়ের করতে রাজী হচ্ছিলেন না, তবে শনিবার সকালে তারা থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। ওই শিশুটি ও তার বাবা-মায়ের কাউন্সেলিং করেছে শিশু কল্যাণ কমিটি।“

অন্যদিকে জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনেরও নজরে এসেছে বিষয়টি। তারাও আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।

‘এত বড় বিষয় নয়’

তার ভিডিও ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পরে শনিবার বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন তৃপ্তা ত্যাগী নামের ওই শিক্ষিকা।

মুজফ্ফরনগরে বিবিসির সহযোগী সাংবাদিক অমিত সাইনিকে মিজ ত্যাগী বলেছেন ভিডিওটি বিকৃত করা হয়েছে, তিনি যা করেছেন, তার মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপার ছিল না।

মিজ ত্যাগী বলেছেন, “ওই বাচ্চাটির বাবা-মায়ের একটা চাপ ছিল যাতে আমি কড়া শাসন করি। আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী, তাই অন্য কয়েকটি পড়ুয়াকে চড় মারতে বলেছিলাম যাতে এই ছাত্রটি তার হোমওয়ার্ক ঠিক মতো করে আনে।“

তিনি বলছেন ভিডিওটি সম্পাদনা করে গোটা বিষয়টিকে একটা সাম্প্রদায়িক মোড়ক দেওয়া হয়েছে।

“আমার উদ্দেশ্যটা এরকম ছিল না যে হিন্দুর সন্তান বা মুসলমানের সন্তান। আমাদের এখানে এধরনের কথা ওঠেই না। যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছে, সেখানে ‘মোহামেডান’ কথাটা জুড়ে দেওয়া হয়েছে, অন্য কিছু কথা কেটে দেওয়া হয়েছে,” জানাচ্ছেন তিনি।

“আমি বলেছিলাম যত ‘মোহামেডান’ মা আছেন, তারা বাচ্চাদের নিয়ে যেন মামার বাড়ি না চলে যায় কারণ পরীক্ষা শুরু হবে আর এতে করে পড়াশোনায় যথেষ্ট ক্ষতি হতে পারে ওদের। আমি শুধু এইটুকুই বলেছিলাম। ওই ছাত্রটির চাচা ওখানে বসেছিলেন আর এটাও বলছিলেন যে ওই ছাত্রকে একটু কড়া শাসন করতে আবার তিনিই ভিডিও করছিলেন,” বলছেন তৃপ্তা ত্যাগী।

তার কথায়, “যে ছাত্ররা চড় মেরেছিল, তারাও মুসলমান। আমার স্কুলে বেশিরভাগ মুসলমান ছাত্র। ভুলটা আমারই, এটা স্বীকার করছি। আমি যদি সুস্থ সবল থাকতাম তাহলে আমি নিজেই সামলাতে পারতাম ছাত্রদের। এই ঘটনা হত না তাহলে।“

“আমি রাজনৈতিক নেতাদের বলব যে এটা একটা ছোট বিষয়। রাহুল গান্ধীর মতো নেতা এটা নিয়ে টুইট করেছেন, কিন্তু এটা টুইট করার মতো এত বড় বিষয়ও নয়। এভাবে যদি দৈনন্দিন বিষয়গুলোও ভাইরাল করে দেওয়া হয় তাহলে শিক্ষকরা পড়াবেন কী করে,” প্রশ্ন তৃপ্তা ত্যাগীর।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

শুক্রবার রাত থেকে ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ‘এক্স’-এ (পূর্বতন টুইটার) মন্তব্য করেছেন, “নির্দোষ শিশুদের মনে বিভাজনের বিষ ঢোকানো, স্কুলের মতো পবিত্র জায়গায় ঘৃণার বাজার তৈরি করা এক শিক্ষিকা দেশের কাছে এত থেকে খারাপ কিছু হতে পারে না। এটা বিজেপির ছড়ানো সেই কেরোসিন, যা ভারতের কোণায় কোণায় আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে।“

উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব লিখেছেন, “বিজেপি সরকার এই ভিডিওটি জি-২০ সম্মেলনে দেখিয়ে এটা প্রমাণ করুক যে তাদের ঘৃণার অ্যাজেন্ডা কতটা সঠিক।“

বিজেপির সংসদ সদস্য ও রাহুল গান্ধীর চাচাতো ভাই বরুণ গান্ধীও ওই শিক্ষিকার সমালোচনায় মুখর হয়েছেন।

তিনি ‘এক্স’ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “জ্ঞানের মন্দিরে একটি শিশুর প্রতি এই ঘৃণার মনোভাব পুরো দেশের মাথা লজ্জায় নত করে দিয়েছে।“

হায়দ্রাবাদের সংসদ সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়েইসি ‘এক্স’-এ লিখেছেন, “ছোট শিশুদের মাথায় এটা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে যে কেউ মুসলমানকে মারতে পারে আর তাকে বেইজ্জত করতে পারে আর তাতে কিছুই হবে না।“

ওই মন্তব্যেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ট্যাগ করেছেন মি. ওয়েইসি।