‘ঋণখেলাপিরা ব্যাংকগুলো পুরোপুরি দখল করে নিল’

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, ফয়সাল তিতুমীর
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Reporting from, ঢাকা
বাংলাদেশে সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন বেশ শোরগোল তুলেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, আইন সংশোধনের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালকদের আরো ক্ষমতাবান করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে 'দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা' আরো বাড়াবে।
এতোদিন কোন ব্যাংকের পরিচালক পদে টানা ৯ বছর থাকার বিধান ছিল। কিন্তু আইন সংশোধন করে সেটি এখন ১২ বছর থাকার বিধান করা হয়েছে।
আরেকটি সংশোধনী হচ্ছে ঋণ সংক্রান্ত। যাতে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে অন্য প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি দেখানো যাবে না।
এর ফলে খেলাপি হয়ে পড়ায় দেশের যেসব বড় গ্রুপ সমস্যায় রয়েছে, তাদের আবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে কোন সমস্যা হবে না।
পরিচালকদের মেয়াদ নয় বছর বছর থেকে বাড়িয়ে কেন ১২ বছর করা হয়েছে সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে বিস্তারিত কোন বক্তব্য সংসদে আসেনি।
তিনি সংসদে দাবি করেছেন, গত ১৮ বছরে খেলাপি ঋণ কমেছে, সরকারি ব্যাংকের শাখা দ্বিগুণ বেড়েছে এবং আমানত বেড়েছে।

ছবির উৎস, CPD
মেয়াদ বাড়ানোর সমালোচনা
অনেকে মনে করেন ব্যাংকের মালিকদের সুবিধা দেবার জন্য আইন সংশোধন করা হয়েছে।
এক সময় এই ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রণেতা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এই আইনের সমালোচনা করে মি. ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংকগুলো এখন পুরোপুরি ঋণখেলাপীদের দখলে চলে গেল।
“দিস ইজ এ টোটাল টেক ওভার বাই দ্য ডিফল্টারস। যেটা ইংরেজিতে বলি স্টেট ক্যাপচার, সেটার পরিস্কার প্রমাণ।
"আমি ২০০৩-০৪ সালের দিকে কোম্পানি আইন সংশোধনী কমিটির অংশ ছিলাম। আমরা চেষ্টা করেছিলাম পরিচালক দুইবারের বেশি যাতে না হয়, মেয়াদ থাকবে ৩ বছর করে এবং এক পরিবার থেকে যাতে ৩/৪ জনের বেশি না থাকতে পারে। এখন এটাকে অনন্তকাল নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।” বলেন মি. ভট্টাচার্য।
১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন করার পর থেকে গত ৩২ বছরে ব্যাংক আইনের সংশোধন করা হয়েছে সাতবার। সবশেষ ২০১৮ সালে আইনটি সংশোধন করে পরিচালকদের মেয়াদ ৬ বছর থেকে বাড়িয়ে ৯ বছর করা হয়। তখনো এটি নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
এবার যে পদ্ধতিতে সংশোধনী এনে আইনটি পাশ করা হল সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।
“যেভাবে গোপনীয়তা রক্ষা করে একেবারে শেষ মূহুর্তে অ্যামেন্ডমেন্টটা (সংশোধনী) নিয়ে আসা হল, এটা প্রক্রিয়াগত একটা উদাহরণ সৃষ্টি করলো যে ক্ষমতাধররা কিভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের স্বার্থে। ”
মি. মনসুর প্রশ্ন করেন, “কোন আলোচনা নেই, বাংলাদেশ ব্যাংক বা আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব করা হয়নি। এই জিনিসটা শেষ মূহুর্তে ঢুকিয়ে দেয়া হল কেন? কার অদৃশ্য প্রভাবে, কার স্বার্থে কীভাবে?”
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন আগামী বছর হয়তো এটি আরো বাড়ানো হবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন পরিচালকরা ব্যাংকগুলোকে 'পারিবারিক সম্পদ' হিসেবে দেখে, নতুন আইন তাদের আরো সাহায্য করবে ব্যাংক ব্যবহার করে 'পারিবারিক সম্পদ গড়ে তোলার' জন্য।
এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of YouTube post
পরিচালকরা ঋণখেলাপি?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
নতুন ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিলের বিরোধীতা করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করার আগে জাতীয় পার্টির এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ ব্যাংকের পরিচালকদের বিরুদ্ধে ঋণ দেয়া- নিয়ে অভিযোগ করেন।
“সমস্ত দলীয় কর্মী এবং আত্মীয় স্বজনদের ব্যাংকের ডিরেক্টর বানান, তারা ব্যাংকে ঢোকে শুধু ঋণ দেয়ার জন্য। একজনকে ১০ কোটি দিয়ে দিল, ২ কোটি ওখান থেকে নিয়ে নিলো। এইভাবে তো একটা দেশ চলতে পারে না,” – বলেন তিনি।
আইএমএফের ঋণ অনুমোদনের পর থেকে আর্থিক খাতে নানা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন আইনে সেটার প্রভাব আছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
এতে একই গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে অন্য প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি বিবেচনা না করার যে সুযোগ রাখা হল সেটার অপব্যবহারের শঙ্কা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
মি. মনসুর বলেন, “এইটা এখন পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, যারা ঋণখেলাপী তাদের কাছে রাজনৈতিক শক্তি কতো খানি প্রকট হয়েছে। যখন সরকার আইএমএফে কাছে দায়বদ্ধ হয়েছে যে সংস্কার করবে, ব্যাংকের ডিফল্ট কমায়া আনবে, ঠিক তখনই এই কাজটা করলো"
"এটা শুধু বাংলাদেশের নাগরিককে না আইএমএফকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।”
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরও মনে করেন নতুন আইনে ব্যাংক মালিকদের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়বে।
“ব্যাংকে অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা তো চিহ্নিত ক্ষমতাধর। ইতোমধ্যে তাদের কারণে ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের দিকে গেছে এবং আরো যাবে। দু:খজনক যে সরকার এগুলো দেখেও দেখে না, জেনেও কিছু করে না,” বলেন মি. মনসুর।











