ভারতের উত্তরাখন্ডে তিন দিন পরেও সুড়ঙ্গে আটকে ৪০জন শ্রমিক

ভারতের উত্তরকাশীতে সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনার তিন দিন পরেও ভেতরে যেসব শ্রমিক আটকে আছেন, তাদের পরিবার পরিজনেরা বুধবার স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। তারা বলছেন যে বড় মাপের মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে ধসে পড়া মাটি-পাথর সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল, তা বিকল হলে বিকল্প কী করা হবে, আগে থেকে তার কোনও পরিকল্পনা কেন করা হয় নি!

উত্তরাখণ্ড রাজ্যের সিল্কিয়ারা থেকে দণ্ডলগাঁও পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার লম্বা এই সুড়ঙ্গটি ব্রহ্মখাল থেকে যমুনোত্রী পর্যন্ত নির্মীয়মাণ জাতীয় মহাসড়কের অংশ হিসাবে তৈরি করা হচ্ছিল।

প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছে রবিবার ভোরে সুড়ঙ্গের কাছেই একটি ভূমিধ্বস হয়, তা থেকেই মাটি ও পাথর ধসে পড়ে সুড়ঙ্গের একটা দিক বন্ধ হয়ে যায়, ভেতরে আটকে পড়েন ৪০ জন শ্রমিক।

সুড়ঙ্গের মুখ থেকে তারা প্রায় ২০০ মিটার ভেতর আটকে আছেন। প্রশাসন বলছে, আটকে পড়া প্রত্যেক শ্রমিকই সুরক্ষিত ও সুস্থ আছেন। তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা হচ্ছে, খাদ্য, পানীয় এবং অক্সিজেন পাঠানো হচ্ছে একটি পাইপের মধ্যে দিয়ে।

রাজ্য এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেই ভারত-তিব্বত সীমা পুলিশ ও দমকল কর্মীরাও উদ্ধার তৎপরতায় সামিল হয়েছেন।

রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সহকারী কমান্ডান্ট করমবীর সিং ভাণ্ডারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, “বুধবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে আটকে পড়া শ্রমিকরা কিছু জিনিস চেয়েছিলেন। সেগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে তারা আটকে আছেন, সেখানে আলোর ব্যবস্থা আছে, তাপমাত্রাও সহনসীমার মধ্যেই রয়েছে।“

তবে এর আগে সুড়ঙ্গের ভেতরে তাপমাত্রা খুব বেড়ে গিয়েছিল। বেশি পরিমাণে অক্সিজেন পাঠিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে বলে জানাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

আবারও ধসে বন্ধ উদ্ধারকাজ

রাজ্য ও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর উদ্ধারকারীরা প্রথমে চেষ্টা করেছিলেন ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তখন আরও মাটি-পাথর ধসে পড়ে সুড়ঙ্গের ভেতরেই। সেই পরিকল্পনা বদলিয়ে এখন চেষ্টা করা হচ্ছে ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে ৯০০ মিলিমিটার ব্যাসের একটি বড় ধাতব পাইপ গুঁজে দেওয়ার, যাতে আটকে পড়া শ্রমিকদের সেটা দিয়ে বার করে আনা যায়।

ঘটনাস্থলে হাজির বিবিসির সহযোগী সংবাদদাতা আসিফ আলি বলছিলেন, “মঙ্গলবার যেভাবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে ড্রিল করা হচ্ছিল, সেটা দেখে মনে হচ্ছিল দ্রুতই উদ্ধারকাজ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বুধবার সকালে জানা যায় যে ওই যন্ত্রটা দিয়ে ড্রিল করা যাচ্ছে না। তাই নতুন করে যন্ত্র নিয়ে আসা হচ্ছে।”

উত্তরকাশীর জেলা শাসক অভিষেক রোহিলা সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন যে দিল্লি থেকে বড় ড্রিলিং যন্ত্রটি আনা হচ্ছে বিমানবাহিনীর সহায়তায়। একটা গ্রিন করিডোর করা হয়েছে যাতে বিমান থেকে নামানোর পরে খুব দ্রুত সেটিকে ঘটনাস্থলে নিয়ে এসে উদ্ধারকাজ আবারও শুরু করা যায়।"

বিকেলে ওই যন্ত্রটি উত্তরকাশীর চিন্যিলিসোড় এয়ার স্ট্রিপে পৌঁছিয়েছে।

‘বরাত জোরে বেঁচে গেছি’

সুড়ঙ্গের ভেতরেই রবিবার রাত থেকে কাজ করছিলেন রাম সুন্দর। উত্তরপ্রদেশ থেকে কাজ করতে আসা এই শ্রমিক বলছিলেন, ‘বরাত জোরে বেঁচে গেছি, কিন্তু বাকিরা আটকে আছে।

বিবিসিকে তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার ঠিক আগে ভোর পাঁচটা নাগাদ আমরা কয়েকজন শৌচ করতে বাইরে এসেছিলাম। যখনই আমি আবার ভিতরে ঢুকতে যাই, তখন ধস নামে।“

সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে যে আটকে পড়া শ্রমিকদের মধ্যে ১৫ জন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের। পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, উড়িষ্যা, বিহার, আসাম আর হিমাচল প্রদেশ থেকে আসা শ্রমিকরাও রয়েছেন এদের মধ্যে।

বিক্ষোভ পরিজনদের

আটকে পড়া শ্রমিকদের অপেক্ষায় থাকা পরিবার-পরিজন আর সহকর্মীদের মধ্যে বুধবার বিক্ষোভ ছড়িয়েছে।

লাভ কুমার রাতুরি বিবিসিকে বলছিলেন যে তিনি নিজেও ওই কোম্পানির শ্রমিক।

"এত ঘণ্টা হয়ে গেল, আমার বাড়ির লোক সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়েছে। এখনও পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করা নিয়ে কিছুই জানানো হচ্ছে না। এখনও পর্যন্ত মাথা ঠাণ্ডা রাখছি, কিন্তু প্রশাসন যেন ধরে নিয়েছে যে আমরা চুপচাপই থেকে যাব।“

তিনি বলছিলেন "একেকটা সেকেন্ড হ্যান্ড মেশিন আনা হচ্ছে।“

সুড়ঙ্গের বাইরে ক্ষোভ প্রকাশ করে আরেক শ্রমিক বলেন, “সুড়ঙ্গের ভেতরে আমার গ্রামের তিনজন আটকে আছে। বাইরে আমরা ঠিক করে খাওয়া দাওয়াও করতে পারছি না দুশ্চিন্তায়।“

ঘটনাস্থল থেকে বহু দূরে ঝাড়খণ্ডের খিরাবেড়া গ্রামের যুবক রাজেন্দ্র বেদিয়া আরও কয়েকজনের সঙ্গেই উত্তরকাশীর ওই সুড়ঙ্গে কাজ করতে গিয়েছিলেন।

রবিবার ভোরের ভূমিধ্বসে তিনিও সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে আছেন। গ্রাম থেকে কাজ করতে যাওয়া অন্য শ্রমিকদের মোবাইল ফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে উদ্ধারকাজ দেখেছেন মি. বেদিয়ার বৃদ্ধ বাবা মা।

তার বাবা সুখরাম বেদিয়া বিবিসিকে বলেন, "আমি উত্তরাখণ্ড থেকে ফোনে খবর পেলাম যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব শ্রমিককে সুড়ঙ্গ থেকে বের করে আনা হবে। এখন কত ঘণ্টা হয়ে গেছে! তাহলে সরকার কেন ওদের বার করে আনতে পারছে না??