আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রানা প্লাজা ধস: ১০ বছরে মামলার অগ্রগতি সামান্য, ক্ষতিপূরণ নিয়ে এখনো আক্ষেপ
বাংলাদেশের ঢাকায় রানা প্লাজা ধসে হাজারো শ্রমিক হতাহতের ঘটনার এক দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি।
রাষ্ট্র-পক্ষের আইনজীবী সারওয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মামলার ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এতদিনে মাত্র ৩৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে।
বিচারের এই দীর্ঘসূত্রতায় নিহতের পরিবার ও আহতরা তাদের জীবদ্দশায় ন্যায়বিচার পাবেন কী না তা নিয়েই সংশয়ে আছেন।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারগুলোকে এতো বছরেও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। আহতদের পুনর্বাসন হয়নি।
শ্রমিকদের দাবি, তাদের বেশিরভাগ কাজে ফিরতে না পারায় অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
যদিও বিজিএমইএ বলছে, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন বাবদ সব ধরণের সহায়তাই দেয়া হয়েছে।
২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল ঢাকার সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে রানা প্লাজা নামে আটতলা ভবনটি সকাল ৯টার দিকে ধসে পড়ে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন-আইএলও এর হিসাব মতে ওই ঘটনায় ১১৩২ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন পোশাক শ্রমিক।
আহত অবস্থায় উদ্ধার হন প্রায় আড়াই হাজার। যাদের অনেককেই আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে।
এই ঘটনাটিকে বিশ্বের ভয়াবহতম 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্র্যাজেডি; হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে। যার প্রভাবে সে সময় বাংলাদেশে শ্রমিকদের কর্ম পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা
রানা প্লাজা ধসে হতাহতের ঘটনায় সব মিলিয়ে ১৪টি মামলা দায়ের হওয়ার কথা জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
এর মধ্যে রয়েছে, অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে পুলিশের হত্যা মামলা, ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় রাজউকের করা মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলা।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরই ১১টি মামলা দায়ের করে বলে জানা যায়।
এর মধ্যে কেবল দুদকের দায়ের করা দুটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
সম্পদের হিসাব দাখিল না করা সংক্রান্ত নন-সাবমিশন মামলায় ২০১৭ সালের ২৯শে অগাস্ট প্রধান আসামী সোহেল রানার তিন বছর কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল ঢাকার ৬ নম্বর বিশেষ জজ আদালত।
ওই মামলায় তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এদিকে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় ২০১৮ সালের ২৯শে মার্চ মি. রানার মা মর্জিনা বেগমের ছয় বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সেইসাথে তার প্রায় সাত কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আদালত।
বাকি মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হত্যা মামলার কয়েকজন আসামি অভিযোগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আপিল করায় বার বার পিছিয়েছে সাক্ষ্যগ্রহণ।
হত্যা ও ইমারত আইনের মামলা দুটি ২০১৩ সালে দায়ের হলেও বিচারের জন্য প্রস্তুত হয় তিন বছর পর।
২০১৬ সালের ১৮ই জুলাই ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত হত্যা মামলায় ৪১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।
এরমধ্যে শুধু সোহেল রানা কারাগারে আছেন, ৩০ জন জামিনে আছেন এবং সাত জন পলাতক, মারা গেছেন তিন জন।
এরমধ্যে শুধু দুই আসামীর পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ থেমে ছিল, যা সম্প্রতি খারিজ হলে বিচার প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়।
বাণিজ্যিক এ ভবনে পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল। যেখানে বৈদ্যুতিক জেনারেটরসহ ভারী যন্ত্রপাতি ছিল।
২০১৬ সালের ১৪ই জুন ইমারত বিধিমালা না মেনে ভবন নির্মাণের মামলার চার্জশিট দাখিল হয়। সিআইডি তদন্ত শেষে ১৮ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
তাতে বলা হয়, ঘটনার আগের দিন ভবনটির তৃতীয় তলার পিলার ও দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছিল।
সিআইডির অভিযোগপত্রে বলা হয়, মালিকপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা না করে পরদিন অর্থাৎ ২৪শে এপ্রিল পাঁচটি পোশাক কারখানা চালু করে।
ওইদিন সকাল ৯টায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে একসঙ্গে কয়েকটি জেনারেটর চালু করা হয়। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভবনটি ধসে পড়ে।
মামলায় ১৩৫ জনকে সাক্ষী করা হলেও চার্জ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে কয়েকজন আসামি রিভিশন আবেদন করায় মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ হচ্ছে না। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি বিচারাধীন আছে।
ওদিকে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থতা বা সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে ব্যর্থতাসহ বেশ কটি অভিযোগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের ১১টি মামলা শ্রম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থা কর্মসংস্থানে মূল বাধা
রানা প্লাজা ধসে নিহতের পরিবার ও আহতদের অভিযোগ তারা ওই ঘটনার পর মানবেতর জীবন কাটালেও এখনও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি।
অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের অভিযোগ, গত ১০ বছরে আহতদের পুনর্বাসনে ও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সরকার বা বিজিএমইএ কারও পক্ষ থেকেই কোনও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের পক্ষে ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল বিজনেস (আইএসবি) পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ এখনো কর্মহীন আছেন।
এ বছরের ১২ই এপ্রিল 'রানা প্লাজা দুর্ঘটনা: ট্র্যাজেডি থেকে ট্রান্সফরমেশন' শীর্ষক এক আলোচনা সভায় সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
সেখানে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ৮৯ শতাংশ গত পাঁচ থেকে আট বছর ধরে কর্মহীন। আর সাড়ে পাঁচ শতাংশ শ্রমিক গত তিন থেকে চার বছর ধরে কর্মহীন।
বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থা নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিলা বেগম ওই দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে পঙ্গুত্ব বরন করেন।
বিবিসিকে তিনি বলেছেন, এখন আরও নানা ধরণের শারীরিক জটিলতায় এক প্রকার মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তিনি।
"আমি বিধবা মানুষ, আমার একমাত্র মেয়েটাকে মানুষ করতে রানা প্লাজায় কাজ নিসিলাম, ওই কাজ আমাকে পঙ্গু করে দিল। আমার এখনও খাঁচা পরে চলতে হয়। শরীরে টিউমার হয়েছে।"
তিনি আক্ষেপের সুরে আরো বলেছেন, "টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারি না। মানুষের কাছে হাতে পেতে চলতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে আমি ওইদিন মরে গেলেই ভালো হতো।"
ক্ষতিপূরণ নিয়ে শ্রমিকদের আক্ষেপ
শ্রমিকদের দাবি রানা প্লাজায় হতাহত শ্রমিকদের আইএলও'র কনভেনশন মেনে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি।
যদিও পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা দেশের শ্রম আইন অনুযায়ী সবাইকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।
এ নিয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলছেন, একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হতাহত হলে তাকে দুই-তিন লাখ টাকা দেয়া উপহাসমূলক হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “আইএলও কনভেনশন ক্ষতিপূরণের যে স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে, আমরা চাই সরকার ও গার্মেন্টস মালিকরা সেটা মেনে চলুক।”
ভবনের ধসের পরের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে সরকারি উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি রানা প্লাজায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে কিছু সুপারিশ করে।
কমিটির সুপারিশে আহত শ্রমিকদের আঘাতের ধরন ও ক্ষতির প্রকৃতি অনুযায়ী চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে৷
প্রথম ভাগে ছিলেন, স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরন করা শ্রমিক, যারা মূলত মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছেন কিংবা দুই বা ততোধিক অঙ্গহানি হয়েছে।
তাদেরকে ১৪ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হয়েছিল৷
দ্বিতীয় ভাগে মূলত এক হাত বা এক পা হারানো শ্রমিকরা ছিলেন। যাদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রত্যেককে সাড়ে সাত লাখ টাকা দেয়ার সুপারিশ করা হয়।
তৃতীয় ভাগে ছিলেন দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন এমন শ্রমিকরা। তাদের জন্য জনপ্রতি সাড়ে চার লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হয়৷
চতুর্থ ভাগে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়৷
এছাড়া আহত ব্যক্তিরা পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বিনা খরচে সার্বিক চিকিৎসা দেয়া এবং সরকারি হাসপাতালে আজীবন বিনা পয়সায় কৃত্রিম অঙ্গের রক্ষণাবেক্ষণের সুপারিশ করা হয়৷
সেইসাথে আইএলও বিধান নিয়ে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আলোচনা ছিল শুরু থেকেই।
কিন্তু সরকারি কমিটির ওইসব সুপারিশের কোনটিই মানেনি বিজিএমইএ।
সংগঠনটির দাবি, বাংলাদেশের অবস্থা বিবেচনায় গার্মেন্টস মালিকরা ওই ক্ষতিপূরণ দেয়ার সক্ষমতা রাখেন না। তাই তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।
বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “আইএলও যদি আমাদেরকে সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতির সাথে মিলিয়ে ফেলে তাহলে তো হবে না। আমাদের শিল্পের বয়স মাত্র ৫২ বছর। আমাদের তো সক্ষমতা থাকতে হবে। তারপরও আমরা দেশের আইন মেনে সব করেছি।”
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংশোধিত শ্রম আইনে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিককে এক থেকে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা আছে।