কেন ভোটের আগে আরামবাগ আর কৃষ্ণনগরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী?

আরামবাগ, কৃষ্ণনগরে সভা করবেন নরেন্দ্র মোদী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আরামবাগ, কৃষ্ণনগরে সভা করবেন নরেন্দ্র মোদী।

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আপাতত সরগরম ভারতীয় রাজনীতি। এদিকে ২০২৪ সালের নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা না হলেও সাধারণ নির্বাচনে নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো।

এই আবহে পশ্চিমবঙ্গে আসছেন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সর্বোচ্চ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি বিহার এবং ঝাড়খণ্ডেও কর্মসূচি রয়েছে তার।

এই ব্যস্ত কর্মসূচির মাঝেই পহেলা ও দোসরা মার্চ পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার আরামবাগ ও নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে সভা করবেন তিনি। এরপর উত্তর ২৪ পরগণার বারাসতেও সভা করার কথা রয়েছে তার।

লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে লক্ষ্য যখন ‘ভোটব্যাঙ্ক’ তখন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটা পদক্ষেপের পিছনে বিশেষ কারণ রয়েছে এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

একই ভাবে সভাস্থল হিসাবে আরামবাগ ও কৃষ্ণনগরকে বেছে নেওয়ার পিছনেও বিশেষ কারণ রয়েছে, এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

“এটা নির্বাচনের সময়। এই সময়ে বিরোধিতা এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রচার সাধারণত তুঙ্গে ওঠে। ফলে সভা কোথায় এবং কবে হবে সেটা নির্বাচন করাটাও গুরুত্বপূর্ণ", বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী।

“এক্ষেত্রে বিজেপি বেছে নিয়েছে আরামবাগ, কৃষ্ণনগর এবং বারাসাতকে। বিজেপি মনে করে প্রধানমন্ত্রী যদি এই জায়গাগুলিতে এসে বক্তব্য রাখেন তাহলে তারা রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হবে।"

"এবং এই বক্তব্যগুলোও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ তৃণমূলকে মূলত দুর্নীতি, হিংসা, হুমকি দেওয়া, নারী নির্যাতন, দরিদ্রদের ইস্যু নিয়ে কড়া ভাষায় আক্রমণ করা হবে”, বলছিলেন তিনি।

আরও পড়তে পারেন:
লোকসভা নির্বাচনে আসন সংখ্যা বাড়াতে বদ্ধপরিকর বিজেপি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লোকসভা নির্বাচনে আসন সংখ্যা বাড়াতে বদ্ধপরিকর বিজেপি।

কেন আরামবাগ?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এই রাজ্যে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির মাঝে হুগলী জেলার আরামবাগকেই বেছে নেওয়া হয়েছে প্রথম সভার জন্য। এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য।

তার কথায়, “গত লোকসভা ভোটে আরামবাগ কেন্দ্রে স্বল্প ব্যবধানে তৃণমূলের কাছে হেরেছিল বিজেপি। এটা এমন একটা কেন্দ্র যেখানে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের অভিযোগ কিন্তু বহু পুরনো। ৯০ এর দশক থেকে এটা চলে আসছে। এখানে একতরফা ভোট হওয়াটাই রীতি।”

এই পরিস্থিতিতে গত লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের কাছে স্বল্প ব্যবধানের হারকে ‘ইতিবাচক’ বলেই মনে করছে গেরুয়া শিবির।

“২০১৯ সালে হেরে যাওয়ার পর থেকেই তাদের নজর কিন্তু ছিল আরামবাগ কেন্দ্রের দিকে,” বলেছেন মি ভট্টাচার্য।

এর পাশাপাশি অন্য একটি কারণও আছে আরামবাগ কেন্দ্রে প্রথম সভা করার পিছনে।

“দলিত এবং মুসলিমদের প্রাধান্য আছে ওই অঞ্চলে। গোঘাট এবং আরামবাগে অনেকটা আদিবাসী এবং তপশিলি জাতি এবং উপজাতির মানুষ আছেন।"

"খানাকুল এবং পুরশুড়াতে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি। দলিত এবং আদিবাসী মানুষদের মধ্যে তারা মুসলিম বিরোধী চিন্তাধারা তৈরি করতে পেরেছে। যে কারণে আরামবাগ বিজেপির নিশানায় রয়েছে,“ বলছেন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পর্যবেক্ষক মি ভট্টাচার্য।

লোকসভা নির্বাচনে আসন সংখ্যা বাড়াতে বদ্ধপরিকর বিজেপি।
ছবির ক্যাপশান, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর থেকেই লড়বেন মহুয়া মৈত্র

নজরে কৃষ্ণনগর

নদীয়ার কৃষ্ণনগরে দ্বিতীয় সভা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

“কৃষ্ণনগরকে বেছে নেওয়ার পিছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। এটা মহুয়া মৈত্রের নির্বাচনী কেন্দ্র,” বলেছেন শিখা মুখার্জী।

গত বছর ‘ক্যাশ ফর কোয়ারি’ বা ‘অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন’ করার অভিযোগ উঠেছিল মহুয়া মৈত্রর বিরুদ্ধে। এথিক্স কমিটির প্রস্তাব মেনে তাঁকে লোকসভা থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তবে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর থেকেই লড়বেন মহুয়া মৈত্র। ২০১৯ সালে ওই আসনটি জিতেছিলেন মিজ মৈত্র।

দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগবে বিজেপি নেতৃত্ব, এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে লক্ষ্য হল মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট আদায় করা।

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, “কৃষ্ণনগর তৃণমূলের হাতে থাকলেও আগে বিজেপি জিতেছিল। কৃষ্ণনগরকে কেন্দ্র করে সভা করার কারণ মতুয়া সম্প্রদায়।"

"বনগাঁ, রানাঘাটের পাশাপাশি কৃষ্ণনগরেও মতুয়া ভোট যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। কৃষ্ণনগরে সভাকে কেন্দ্র করে বিজেপি পুরো মতুয়া সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে কথা বলবে।”

লোকসভা নির্বাচনের আগে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনও (সিএএ) আলোচনার একটি বড় বিষয়।

“মার্চেই নাগরিকত্ব আইন যে বলবৎ হতে পারে আর এটি কিন্তু মতুয়াদের কাছে একটি বড় বিষয়,” বলেছেন মি ভট্টাচার্য।

পশ্চিমবঙ্গে তাদের গতবার পাওয়া ১৮টি আসনের সংখ্যা এবার আরও বাড়াতে চায় বিজেপি।

মি ভট্টাচার্য ব্যাখ্যা করে বলেন, “রানাঘাট এবং বনগাঁ এই দুটি সিটের বিষয়ে বিজেপি নিশ্চিত। এখন কৃষ্ণনগর আর বারাসাত আসনেও জিতে গেলে তৃণমূলের সঙ্গে একটা জোরদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যাবে এমনটা মনে করছে তারা।”

রাজ্য রাজনীতি সন্দেশখালি ইস্যু নিয়ে উত্তাল।

ছবির উৎস, SHIB SHANKAR CHATTERJEE/BBC

ছবির ক্যাপশান, রাজ্য রাজনীতি সন্দেশখালি ইস্যু নিয়ে উত্তাল।

সন্দেশখালি ইস্যু

রাজ্য রাজনীতি যখন সন্দেশখালি ইস্যু নিয়ে উত্তাল তখন উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতকে সভাস্থল হিসাবে বেছে নেওয়াটা বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

সন্দেশখালিতে সাধারণ মানুষের উপর তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহান ও তার দলবলের অত্যাচার, নারী নির্যাতন এবং গত ফেব্রুয়ারি মাসে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের আধিকারিকদের উপর হামলা-সহ একাধিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে বিরোধীরা।

রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে বিজেপি-র শীর্ষ নেতারাও এই অভিযোগগুলিকে কেন্দ্র করে তোপ দেগেছেন তৃণমূলের বিরুদ্ধে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে বৃহস্পতিবার গ্রেফতার হয়েছেন শেখ শাহজাহান। এই পরিস্থিতিতে বারাসাতে সভার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই।

“বারাসাত এবং বসিরহাট যেহেতু একই জেলায়, তাই বারাসাতকে কেন্দ্র করে বিজেপি সোচ্চার হতে চায়।"

"সন্দেশখালিতে তৃণমূল দুর্নীতি, নারী বিরোধী কার্যকলাপকে উৎসাহ দিয়ে এসেছে এবং দলের বাহুবলীদের দিয়ে তারা (তৃণমূল) এই কাজগুলো করে থাকে - এইটাই বলতে চাইবে বিজেপি। এটা কিন্তু তাদের তৃণমূলের বিরুদ্ধে অল আউট অ্যাটাক,” বলেছেন শিখা মুখার্জী।

তৃণমূলও কেন্দ্রের বঞ্চনার অভিযোগকে প্রচারের হাতিয়ার করে এসেছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তৃণমূলও কেন্দ্রের বঞ্চনার অভিযোগকে প্রচারের হাতিয়ার করে এসেছে।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর

পাখির চোখ লোকসভা ভোট

আসন্ন ভোটের কথা ভেবে বিজেপি এবং তৃণমূল ময়দানে নেমে পড়েছে। দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র, নারী বিরোধী মনোভাব-সহ একাধিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে তৃণমূলকে কোণঠাসা করতে চাইছে বিজেপি।

“বিজেপির আসল উদ্দেশ্য হল সিট সংখ্যা বাড়ানো যদিও রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক অবস্থা ভাল নয়, এবং প্রতিটি জেলাতেই প্রায় একই অবস্থা।”

“কিন্তু তারা (বিজেপি) আশা করছে রাজ্য সরকার যেভাবে দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত অপদস্থ হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সি যেভাবে তৃণমূল নেতাদের জেলে পুরেছে আর তাদের বেআইনি সম্পত্তির হিসেব নিকেশ জনসমক্ষে আনতে পেরেছে সেটা বিজেপির পক্ষে যাবে,” বলছিলেন স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য।

এই পরিস্থিতি বিজেপিকে ‘লাভজনক’ জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, এমনটাও মনে করছেন ওই দলের নেতা-কর্মীরা।

“বিজেপি মনে করে তারা তৃণমূলের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। কেন্দ্র সরকার এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে দেখে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাদের ভোট দেবে। অর্থাৎ তৃণমূল বিরোধী ভোট পাবে তারা”, বলছেন মি ভট্টাচার্য।

তবে তৃণমূলও কেন্দ্রের বঞ্চনার অভিযোগকে প্রচারের হাতিয়ার করে এসেছে অনেক আগে থেকেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী বলেন, “তৃণমূলের দুর্নীতি, জমি জবরদখল, হুমকি, নারী বিরোধী ইস্যুগুলোকে নিয়ে সোচ্চার হয়েছে, একই ভাবে তৃণমূল প্রচার করেছে কেন্দ্র গরিবদের টাকা দিতে চায় না।”

কেন্দ্রের বঞ্চনার বিষয় থেকে নজর সরাতেই ‘সন্দেশখালি’কে হাতিয়ার করছে বিজেপি, এমন অভিযোগও জানাচ্ছে তারা।

“১০০দিনের বকেয়া টাকা যা গরিব মানুষের হাতে আসেনি, সেটা নিয়ে যথেষ্ট প্রচার করেছে তৃণমূল। একই সঙ্গে রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে ওই টাকা তারা মিটিয়ে দেবে। এটা কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।কাজেই এটা একটা বড় বিষয়”, বলেছেন তিনি।

অন্য দিকে বুধবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় আবাস প্রকল্পের আওতায় যাদের বাড়ি এখনও হয়নি, তাদের বাড়ি বানিয়ে দেবে রাজ্য সরকার।

অন্যদিকে, এনআরসি এবং সিএএ এই দুটি বিষয় নিয়েই তৃণমূল-বিজেপি সোচ্চার হয়েছে।

শিখা মুখার্জীর কথায়, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে সিএএ এবং এনআরসি দুটি বড় বিষয়। মোদী সরকার সেখানে কী করবে এ নিয়ে সেটা কিন্তু আলোচনার বিষয়।”

কোন রাজনৈতিক দল কোন বিষয়টিকে হাতিয়ার করে ভোটের ময়দানে নামবে তা প্রায় স্পষ্ট।

“এ রাজ্যের মানুষ রাজনৈতিক ভাবে সচেতন। তারা ধারণা করছে এই দুটি বিষয় এবং সন্দেশখালি নিয়ে ধর্মভিত্তিক যে রাজনীতি এবং সংঘাত চলছে সেটা নির্বাচনে একটা বড় ইস্যু হবে।"

"আশঙ্কা রয়েছে ধর্মভিত্তিক যে ইস্যুগুলো আছে সেটা কীভাবে উসকানি পেতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়গুলিকে নিয়ে কী বলেন সেটাই দেখার", বরছেন শিখা মুখার্জি।