পাকিস্তানে ‘ভাগাভাগির প্রধানমন্ত্রিত্বে’ রাজি নন বিলাওয়াল, নতুন জোটে পিটিআই

পাকিস্তান পিপলস পার্টি-পিপিপি এর চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, “আমাকে বলা হয়েছিল প্রথম তিন বছর তাদেরকে দিতে এবং পরের দুই বছর আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতে। কিন্তু আমি তা মানা করেছি।”

রোববার পাকিস্তানের থাট্টায় এক র‍্যালিতে ভাষণ দেয়ার সময় এমনটা বলেছেন তিনি। তিনি বলেন, “অন্য রাজনৈতিক দলগুলো যে উপায়ে প্রধানমন্ত্রী হতে চায়, আমি সেভাবে হতে চাই না। আমাকে যদি প্রধানমন্ত্রী হতে হয় তাহলে পাকিস্তানের জনগণ আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানাবে।”

তিনি আরও বলেন, “যারা আমাদের কাছে সমর্থন চাইতে এসেছে, তাদের কাছ থেকে মন্ত্রণালয় নিবো না আমরা, বরং আমরা জনগণের স্বার্থ দেখবো।”

আসিফ আলি জারদারি পিপিপি এর প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

আটই ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনে কোনো দল সরকার গঠনের জন্য এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মোট ১০১টি আসনে জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩টি আসনেই জয় পেয়েছেন পিটিআই সমর্থিত প্রার্থীরা।

অন্যদিকে নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ পিএমএল-এন ৭৫টি আসন পেয়েছে আর বিলাওয়াল ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি-পিপিপি পেয়েছে ৫৪টি আসন।

এখন এসব দল জোট গঠন করে নতুন সরকার গঠন করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

'সমঝোতার নিয়ম মেনে চলুন'

বিলাওয়াল ভুট্টোর এই বক্তব্যের পর মুসলিম লীগ-নওয়াজ এর সমঝোতা কমিটির প্রধান ইশাক দার তার দল এবং পিপলস পার্টির নেতাদের সমঝোতা আলোচনার নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই নিয়মের অংশ হিসেবে দুই দলের সমঝোতা কমিটির কোনো সদস্য আলোচনার প্রক্রিয়া বা কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সে সম্পর্কে কোনো কিছু প্রকাশ করতে পারবে না। দলগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি এবং বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে যা শেষ দিন পর্যন্ত চলতে থাকবে।

তিনি বলেন, চতুর্থ দফার সমঝোতা আলোচনা শেষ হয়েছে। সোমবার বিকেলে পঞ্চম দফা আলোচনা শুরু হবে। এই আলোচনা শেষে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

“দুই দলের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সমঝোতা আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু নিয়ে কথা বলা উচিত নয়।”

তবে ইশাক দার নিশ্চিত করেছেন যে, জোট সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ক্ষমতায় থাকার ‘সময়-ভাগাভাগির’ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

পাকিস্তানের জিও নিউজকে তিনি বলেন, “সরকার গঠন করা নিয়ে দলগুলো কমিটি গঠন করেছে। আমরা পিপলস পার্টির সাথে একমত হয়েছি যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কেউ এ বিষয়টি প্রকাশ করবে না। আমরা আমাদের নেতাদের কাছ থেকে এটাই আশা করি। এটা করতে আমরা নৈতিকভাবে বাধ্য।”

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য দুই বছর সময় দেয়ার প্রস্তাবের বিষয়ে বিলাওয়াল ভুট্টোর করা মন্তব্যের নিয়ে তিনি বলেন, সমঝোতার জন্য এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি।

তিনি বলেন, “বিভিন্নভাবে সরকার গঠন করা যেতে পারে। বিলাওয়াল সাহেব সময়-ভাগাভাগির বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। আরও অনেক ফর্মুলা থাকতে পারে।”

আরো পড়ুন:

সুন্নি ইত্তেহাদ কাউন্সিলের সাথে জোটে পিটিআই

পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম ডন এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্লামেন্টে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পিটিআই ইসলামাবাদে এক বৈঠকের পর সুন্নি ইত্তেহাদ কাউন্সিলের সাথে জোট গঠন করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে এই দলটি একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে।

এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও পাঞ্জাবের প্রাদেশিক পরিষদে সংরক্ষিত নারী আসন এবং সংখ্যালঘু আসন টানতে চাইছে তারা।

এর আগে পিটিআই পাঞ্জাব ও কেন্দ্রে ওয়াহদাত-ই-মুসলিমিনের সাথে জোট গঠন করে। গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে করে পিটিআই এর মুখপাত্র এর ঘোষণা দেন।

তবে এই সিদ্ধান্ত জামায়াত-ই-ইসলামিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জামায়াত-ই-ইসলামির সাথে খাইবার পাখতুনখোয়ায় একই ধরনের একটি জোট গঠন করার কথা রয়েছে পিটিআই এর। এর প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত-ই-ইসলামি বলেছে যে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় পিটিআইয়ের সাথে ‘সীমিত জোট’ গড়তে আগ্রহী নয় তারা।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিরোধীদলের বেঞ্চে বসতে রাজি হওয়ার দুই দিন পর রোববার পিটিআই কেন্দ্রে, পাঞ্জাবে এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় সরকার গঠন করতে তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। এর অংশ হিসেবেই তারা সুন্নি ইত্তেহাদ কাউন্সিলের সাথে এই নতুন জোট গঠন করেছে তারা।

এদিকে খাইবার পাখতুনখোয়ায় পিটিআই পার্লামেন্টারিয়ানদের সাথে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ পিটিআই এর নেতারা প্রদেশটির সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ কয়েক জন নেতাকে দল থেকে সরিয়ে দেয়ার দাবি তুলেছে।

পিটিশনারকে হাজির করার নির্দেশ

পাকিস্তানের গত ৮ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাতিল চেয়ে করা পিটিশনের শুনানি আজ সুপ্রিম কোর্টে অনুষ্ঠিত হলেও পিটিশন দায়েরকারী আদালত হাজির হয়নি।

প্রধান বিচারপতি কাজী ফাইজ ইসার নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এই শুনানি করে। বিচারপতি আলি মাজহার এবং বিচারপতি মুসরাত হিলালিও এই বেঞ্চে উপস্থিতি ছিলেন।

এই পিটিশন দায়ের করেছেন ব্রিগেডিয়ার (অব.) মোহাম্মাদ আলি। তবে আজ তিনি আদালতে হাজির হননি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

পরে সর্বোচ্চ আদালত পিটিশন দায়েরকারী ব্রিগেডিয়ার (অব.) মোহাম্মদ আলিকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনকে আদালতের নির্দেশ মানতে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ সময় আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, “শুধু প্রচারের জন্যই কি এই আবেদন দায়ের করা হয়েছিল? এটা হতে পারে না। আমরা সুপ্রিম কোর্টকে ভুলভাবে ব্যবহৃত হতে দিতে পারি না।”

“প্রথমে তারা আবেদন করে, তারপর গায়েব হয়ে যায়। পিটিশন দায়েরকারীকে যেকোনো স্থান থেকে এনে হাজির করুন। আমরা অভিযোগ শুনবো।”

পিটিশন আবেদনটি গত ১২ই ফেব্রুয়ারি জমা দেয়া হলেও মিডিয়াতে তার অনেক আগেই প্রকাশিত হয়েছে বলে নোট নেয় আদালত।

এর আগে পিটিশনের আবেদনে মোহাম্মদ আলি বলেন, যেহেতু এই নির্বাচন বিচার ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়নি এবং সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে ভোট কারচুপির বিষয়ে আওয়াজ তুলেছে, তাই এই নির্বাচনকে বাতিল করে দেয়া উচিত।

পিটিশনে আরো বলা হয়েছে, নির্বাচনে কারচুপির বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা হয়েছে যা বিশ্ব দরবারে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে এবং একই সাথে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পিটিশনে সুপ্রিম কোর্টকে এই নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করার আবেদন করা হয়। একই সাথে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আগামী ত্রিশ দিনের মধ্যে দেশে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।