নিষিদ্ধ ব্রাহমা জাতের গরু ইস্যুতে সরকারি খামারসহ তিন জায়গায় দুদকের অভিযান, যা জানা যাচ্ছে

ছাগলকাণ্ডে আলোচিত সাদিক এগ্রো ফার্মের কাছে নিষিদ্ধ ব্রাহমা জাতের গরু নিলামে সরবরাহে কোনো অসাধু উপায় অবলম্বন করা হয়েছে কি না সে বিষয় যাচাই করতে কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

এছাড়াও সাদিক এগ্রোর মোহাম্মদপুর ও সাভারের দুইটি খামারেও অভিযান চালায় প্রতিষ্ঠানটি।

সাভারের ভাকুর্তায় সাদিক এগ্রোর আরেকটি খামারে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ব্রাহমা প্রজাতির সাতটি বাছুর ও পাঁচটি গর্ভবতী গাভী পাওয়া গেছে বলে জানান অভিযান পরিচালনাকারী দুদকের কর্মকর্তারা।

তবে, সাদিক এগ্রোর বিরুদ্ধে এখনও কোনো মামলা হয়নি বলেও জানান তারা। এই অভিযানের বিষয়ে দুদকে প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানান তারা।

দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, নিলাম প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের নিয়মবহির্ভূত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা যাচাই করতেই সব নথিপত্র নেয়া হয়েছে সরকারি খামারে চালানো অভিযানে।

সাভারের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের পরিচালক ডা. মো. মনিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “রমজান মাসে সুলভ মূল্যে মাংস বিক্রয়ের জন্য এখান থেকে যে গবাদি পশু দেয়া হয়েছে সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেয়া হয়েছে কি না তা দুদক দেখতে এসেছিল।”

আরো পড়ুন

যে কারণে দুদকের অভিযান

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৮টি নিষিদ্ধ প্রজাতির ব্রাহমা জাতের গরু আমদানি করে সাদিক এগ্রো। এসব গরু আমদানির অনুমতি ছিল না প্রতিষ্ঠানটির।

ফলে তখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এসব গরু জব্দ করে ঢাকা কাস্টমস হাউজ।

তারা এসব গরু লালন পালনের জন্য সাভারের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে দেয়। এটি সরকারি ডেইরি ফার্ম। গত তিন বছরে তিনটি ব্রাহমা গরু মারা যায়।

এ বছরের শুরু থেকে গরুর মাংসের অস্বাভাবিক দাম থাকায় সরকার সুলভ মূল্যে মাংস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। ৬০০ টাকা কেজি দরে মাংস বিক্রি করে সরকার।

এপ্রিল মাসে রমজানের সময় এই ব্রাহমা জাতের ১৫টি গরু জবাই করে সুলভ মূল্যে মাংস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “রমজান মাসেই এসব গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করার শর্তে নিলাম করে ডেইরি ফার্মারস এসোসিয়েশনের কাছে গরুগুলো দেয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ ওঠে তারা তখন এসব গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করেনি। বরং কোরবানির সময় তারা এসব গরু বিক্রি করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।”

কোন প্রক্রিয়ায় ডেইরি ফারমার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সাদিক এগ্রোর মালিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেনের কাছে এসব নিষিদ্ধ প্রজাতির গরু আবার হস্তান্তর করা হয়েছে তা যাচাই করতেই সরকারি এই খামারে দুদকের অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানান মি. আজাদ।

এদিকে, সরকারি একটি খামারে অভিযান চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে খামারটির পরিচালক মি. ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমাদের বুকভ্যালু আছে। বুকভ্যালু ও ভ্যাট যোগ করে সুলভ মূল্যে বিক্রয়ের জন্য বিক্রয় করা হয়েছিল। যেভাবে মূল্য নির্ধারণ ছিল আমরা সেভাবেই দিয়েছি। এটা দুদক দেখতেই পারে। দুদকতো সবকিছুই দেখতে পারে। এখানে প্রক্রিয়ায় কোনো সমস্যা আছে কি না, কোনো ত্রুটি আছে কি না তা দেখতে দুদক এসেছিল।”

সাদিক এগ্রোর আরো দুই প্রতিষ্ঠানে অভিযান

সোমবার একইদিনে সাদিক এগ্রো ফার্মের মোহাম্মদপুর ও সাভারের আরো দুইটি খামারে অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানায় দুদকের কর্মকর্তারা।

সাভারের ভাকুর্তার খামারে দুদকের নয় সদস্যের একটি টিম অভিযান চালায়। এ খামারে সাতটি নিষিদ্ধ ব্রাহমা প্রজাতির বাছুর এবং পাঁচটি গর্ভবতী গাভি পাওয়া গেছে। এই খামারে আলোচিত সেই ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগলটিও ছিল।

কর্মকর্তারা জানান, এসব গাভিকে ব্রাহমা গরুর সিমেন প্রয়োগ করে গর্ভবতী করা হয়েছে। ফলে এসব গরু যেসব সন্তান জন্ম দেবে সেগুলো ব্রাহমা প্রজাতির হবে।

অভিযান পরিচালনাকারী দুদকের কর্মকর্তা মি. আজাদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বাংলাদেশে ব্রাহমা প্রজাতির গরু আমদানি অনেক আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখানে যেভাবে ব্রাহমা জাতের বাছুর উৎপাদন করা হচ্ছে সেটাও কিন্তু নিষিদ্ধ।”

মি. আজাদ জানান, এ বিষয়ে কমিশনকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেয়া হবে। কমিশনই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এর আগে শনিবারও রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সাদিক এগ্রো ফার্মে অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। অবৈধভাবে রামচন্দ্র খাল ও সড়কের জায়গা দখল করে খামারটি গড়ে তোলার অভিযোগে ওই অভিযান চালিয়ে সেটি উচ্ছেদ করেছে ডিএনসিসি। এদিন সেখান থেকে আলোচিত ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগলটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়।

রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফাদ ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত সাদিক এগ্রো ফার্ম থেকে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে ওই ছাগল কিনেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে জানা যায় এক লাখ টাকা দিয়ে ওই ছাগলটি বায়না করেছিলেন ওই যুবক।

এরই প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে মতিউর রহমানের অবৈধ সম্পদের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকলে তাকে রাজস্ব বোর্ড থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

মুশফিকুর রহমান ইফাদ তার ছেলে নন এমন দাবি করে কয়েকটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দেন মতিউর রহমান। যদিও পরবর্তীতে তার এমন দাবি অসত্য জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

পরে মি. রহমান, তার স্ত্রী ও ছেলের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় ঢাকার বিচারিক আদালত।

২০১৬ সালে এক নীতিমালা দিয়ে ব্রাহমা জাতের এই গরু আমদানি নিষিদ্ধ করে সরকার। ব্যাপক হারে ব্রাহমা গরু উৎপাদন হলে হোলস্টেইন জাতের বা ফ্রিজিয়ান জাতের গরুর উৎপাদনে খামারিরা আগ্রহ হারাবে বলে আশঙ্কা সরকারের। এই জাতের গরু দুধের উৎপাদনের জন্য খ্যাত।

বাংলাদেশে দুগ্ধ উৎপাদন খাতকে সুরক্ষা দেবার জন্যই মূলত নিষিদ্ধ করা হয়েছে ব্রাহমা জাতের গরুর আমদানি।