আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বারবার সেঞ্চুরি করেও ভারতীয় দলে স্থান না পাওয়া এক ক্রিকেটারের কথা
ভারতের টেস্ট দলে কখনো না খেলেও সরফরাজ খান অনেকের কাছেই বেশ পরিচিত।অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের টেস্ট দল ঘোষণার পরে তাকে নিয়ে আলোচনা আরো জোরালো হয়েছে। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে সরফরাজের ধারাবাহিক নৈপুন্য তাকে আলোচনার সামনে এনেছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দলে সরফরাজ খানের ডাক না পাওয়াতে অবাক হচ্ছেন ক্রিকেট বোদ্ধারা।
টানা তিনটি ‘ব্লকবাস্টার’ মৌসুম কাটিয়েও জাতীয় দলে ডাক পাননি মুম্বাইয়ের এই ক্রিকেটার।
এতো কিছুর পরেও সরফরাজকে ভারতের টেস্ট দলে স্থান না দেয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করছেন অনেকে।
বিষয়টিকে সরফরাজের সাথে 'অন্যায়' বলে মনে করছেন সাবেক ক্রিকেটার ভেঙ্কাটেশ প্রাসাদ।
তিনি টুইটারে লিখেছেন, “মনে হচ্ছে রঞ্জি ট্রফির কোনও দাম নেই। এটা অনেকটা ঘরোয়া ক্রিকেটের সাথেই জুলুম।”
সরফরাজ খান শারীরিকভাবে স্থূল, এটাকে জাতীয় দলে ডাক না পাওয়ার পেছনে একটা যুক্তি হিসেবে দেখাতে চান অনেকেই।
কিন্তু ভেঙ্কাটেশ প্রাসাদ মনে করেন, “সরফরাজ যেহেতু রান করছে তার মানে সে ফিট।”
টানা তিন মৌসুমে সরফরাজের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ব্যাটিং গড় ১০০ এর বেশি।
সরফরাজের রান কত?
সরফরাজ খান মঙ্গলবারও মুম্বাইয়ের হয়ে একটি সেঞ্চুরি করেছেন দিল্লীর বিপক্ষে।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সরফরাজের রেকর্ড ভারতের সেরা। তার গড় এখন ৮১।
ভারতের কোনও ব্যাটসম্যানের প্রথম শ্রেণিতে এর বেশি গড় নেই।
তিন মৌসুমে সাইত্রিশ ম্যাচ খেলেছেন সরফরাজ খান। মঙ্গলবারের সেঞ্চুরিসহ মোট তেরটি সেঞ্চুরি করেছেন এরই মধ্যে।
সাইত্রিশ ম্যাচে সাড়ে তিন হাজারের মতো রান করেছেন সরফরাজ। অর্থাৎ প্রতি ম্যাচেই প্রায় একশোর কাছাকাছি স্কোরিং রেট তার।
জনপ্রিয় ক্রিকেট বিশ্লেষক ও উপস্থাপক হারশা ভোগলের মতে, জাতীয় দলে ঢোকার জন্য এর বেশি করা সম্ভব নয়।
হারশা ভোগলে নিজের টুইটার একাউন্টে লিখেছেন, সরফরাজের সাথে নিষ্ঠুর একটা কাজ হয়েছে।
“একটা লোক ঘরোয়া ক্রিকেটে যা যা করা সম্ভব সবই করেছেন, আপনি এর বেশি করতে পারেন না।”
রঞ্জি ট্রফিতে সরফরাজ খানের শেষ পাঁচ ম্যাচে দুইটি সেঞ্চুরি ও একটি হাফ সেঞ্চুরি আছে।
ইরফান পাঠান টুইটারে লিখেছেন, “টেস্ট ক্রিকেটে দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে রঞ্জি ট্রফির পারফরম্যান্স প্রথম বিবেচনায় আনা উচিৎ।”
সরফরাজ কী বলছেন?
স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে তুলনা করা হচ্ছে এখন সরফরাজ খানের।
এর একটা বড় কারণ স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের টেস্ট ক্রিকেটে গড় ছিল ৯৯.৯৪। এই কিংবদন্তী ব্যাটসম্যানের গড় ছোঁয়া সরফরাজ খানের পক্ষে সম্ভব।
দিল্লীর বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর গতকাল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন সরফরাজ খান।
তিনি বলেন, “স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের নামের সাথে আমার তুলনা হচ্ছে এটাই একটা বড় ব্যাপার। আমার খুশি লাগছে। এমনটা তো আজীবন থাকবে না, এখন সময় ভালো যাচ্ছে।”
এমন পারফরম্যান্সের পরেও জাতীয় দলে ডাক না পাওয়া প্রসঙ্গে সরফরাজ বলেন, “আমার কাজ হচ্ছে রান করা, আমি রান করবো। বাকিটা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা।”
চলতি মৌসুমে সাত ইনিংসে তিনটি সেঞ্চুরি করেছেন সরফরাজ।
এর আগের দুই মৌসুমে যথাক্রমে সরফরাজ যথাক্রমে ৯২৮ এবং ৯৮২ রান করেন। যার গড় ছিল যথাক্রমে ১৫৪ এবং ১২২।
সে দুই মৌসুমে মোট সাতটি সেঞ্চুরি করেছেন, যার মধ্যে আছে উত্তর প্রদেশের বিপক্ষে ত্রিপল সেঞ্চুরি।
এতো রান করার পরেও জাতীয় দলের দরজা না খোলায় সফরাজের মন ভালো নেই।
দিল্লীর বিপক্ষে ম্যাচের আগে সরফরাজের বাবা এসেছিলেন তার সাথে দেখা করতে।
“বাবা বলে গেছেন - তোমার কাজ রান করা, তুমি রান করে যাও,” বলেন সরফরাজ।
জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোর লেখক কুনাল কিশোর লিখেছেন, টেস্ট দলে সরফরাজের সুযোগ না পাওয়ার ক্ষেত্রে দুটো কারণ থাকতে পারে। একটি হচ্ছে ফিটনেস এবং অন্যটি হচ্ছে ভারতের 'এ' দলের পক্ষে ভালো না খেলা।
ভারতের ‘এ’ দলের হয়ে ৬ ম্যাচে ২০৫ রান করেছেন সরফরাজ। অর্থাৎ 'এ' দলের পক্ষে তার গড় রান হচ্ছে ৩৪।
গত বছর ভারতীয় 'এ' দলের হয়ে তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তখন দুই ইনিংসে তিনি ২১ ও ০ রান করে আউট হয়েছেন।
সরফরাজ ‘এ’ দলের পারফরম্যান্স নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “একটা মানুষ সবসময় একইভাবে সফল হতে পারে না। আমি ভারতের এ দলের হয়ে যখন প্রথম খেলি আমি ৭১ রানে অপরাজিত ছিলাম, বাকি সবাই আউট না হলে হয়তো আমি সেঞ্চুরি করতে পারতাম।”
সেই সিরিজটি দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলেছিল ভারতের এ দল।
সরফরাজের উত্থান কেমন ছিল?
সরফরাজের মানসিক শক্তির ব্যাপারে আলাদাভবে কথা হচ্ছে।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য দল ঘোষণার পরের ম্যাচেই তিনি যেভাবে সেঞ্চুরি করেছেন, তাতে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ভারতের ক্রিকেটার দিনেশ কার্তিক।
মি. কার্তিক লিখেছেন, “সরফরাজ খান- ওয়েল ডান। দারুণ মানসিক শক্তি।”
সম্প্রতি টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে সরফরাজ খান বলেছিলেন, “নির্বাচকদের সাথে যখন দেখা হয়েছিল তারা বলেছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে আমাকে ডাকা হবে। এবার যখন আবার দেখা হলো, তারা বলেন, ভালো জিনিসের জন্য একটু অপেক্ষা করতেই হয়। আমি অপেক্ষা করবো।”
সরফরাজ খান যখন এতো আলোচিত হননি তার আগেই তিনি তার প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছিলেন।
স্কুল ক্রিকেট থেকেই সরফরাজের কোচরা মনে করতেন, তিনি একদিন ভারতের জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন।
বিবিসির ক্রীড়া লেখক সৌরভ সোমানি ২০২২ সালের জুলাই মাসে একটি প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, “মুম্বাইয়ের স্কুল পর্যায়ের ক্রিকেটে পৃথ্বি শ ও আরমান জাফরের সাথে সরফরাজ ছিলেন অসাধারণ ক্রিকেট প্রতিভা।”
“কিন্তু নওশাদ (সরফরাজের বাবা) সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে নিয়ে উত্তর প্রদেশ যাবেন, কারণ তার মনে হয়েছে মুম্বাই থেকে ক্রিকেট দলে জায়গা পাওয়াটা হবে অনেক কঠিন।”
“কিন্তু উত্তর প্রদেশের হয়ে খুব একটা ভালো যায়নি সময় তাই আবারও সরফরাজের পরিবার মুম্বাই ফিরে আসে।”
এখন সরফরাজ খান মুম্বাই দলের সবচেয়ে ভালো পারফর্মারদের একজন, মুম্বাইয়ের কোচ অমোল মজুমদার বলেন বিবিসি নিউজকে বলেন, “সরফরাজ দলের প্রাণ।”