আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’য় রূপ নিয়েছে
পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হয়ে একই এলাকায় এবার ‘ঘূর্ণিঝড় দানা’য় পরিণত হয়েছে।
আজ বুধবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি সকাল ছয়টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৯৫ ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ৬৯৫ ও পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্বে অবস্থান করছিলো।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়তে পারে ওড়িশার পুরী এবং পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণার স্বাগরদ্বীপের স্থলভাগে।
তবে বরিশাল ও খুলনা বিভাগেও ঝড়টির প্রভাব পড়বে বলে আবহাওয়াবিদরা বলছেন।
‘দানা’ কখন আঘাত হানতে পারে ?
বুধবারের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হতে পারে।
ঝড়টির গতিপথ যদিও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার দিকে, তবে বাংলাদেশের বরিশাল ও খুলনা অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সকাল ছয়টায় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ঘন্টায় ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঝড়ো হাওয়ার কারণে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে।
তাই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে এক নম্বর দূরবর্তী সতর্ক সংকেত নামিয়ে দুই নম্বর দূরবর্তী হুশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
সেইসাথে, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে, যাতে স্বল্প সময়ের নোটিশে নিরাপদ আশ্রয় যেতে পারে।
বুধবার সকালে এ নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা বিবিসিকে বলেছেন, ঘূর্ণিঝড়টি আগামীকাল অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাতে উপকূলে আঘাত হানতে পারে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় যখন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করবে তখন এই ঘূর্ণিঝড়ের “ গতিবেগ হতে পারে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার”।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস
বুধবার সকালে ‘দানা’ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়ায় পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মৌসম ভবনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি ওড়িশার পারাদ্বীপ থেকে ৫৬০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়তে পারে ওড়িশার পুরী এবং পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণার স্বাগরদ্বীপের স্থলভাগে।
ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গের একাধিক উপকূলবর্তী এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বাসিন্দাদের।
মোতায়েন করা হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। দুই রাজ্যেই ত্রাণ শিবিরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলাতে লাল ও কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এর প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া এবং ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, উত্তর ও দক্ষিণ মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, হাওড়া ও হুগলি জেলায় বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশিকা জারি হয়েছে।
যাত্রী সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের বিভিন্ন ডিভিশনে নিরাপত্তা বিষয়ক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন রুটের একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।
যেভাবে ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ নামকরণ
এবারের ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখা হয়েছে ‘দানা’। আর এ নামকরণ করেছে কাতার।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এটি আরবি শব্দ। কাতারের দেয়া নাম। অর্থ বড় মুক্তার দানা”।
বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলির নামকরণ করে একটি প্যানেল।
এ অঞ্চলে যে ঘূর্ণিঝড়গুলো হয়, ২০০২ সাল থেকে এ প্যানেলের সদস্য দেশগুলো সেগুলোর নামকরণ করে থাকে।
প্রতি চার বছর পর পর সদস্য দেশগুলো বৈঠক করে আগে থেকেই পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে থাকে।
মি. মল্লিক বলেন, “ ইকোনোমিক এন্ড স্যোশাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্যা প্যাসিফিক প্যানেলের অন্তর্ভুক্ত সদস্য দেশগুলো এই অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের আগাম নামকরণ করে থাকে। এই নামকরণই দেশের নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী যেখানে ঘূর্ণিঝড় হয় সেখানে সে নামেই এটি পরিচিত হয়”।
এই তালিকায় রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ইরান, কাতার, ইয়েমেন, ওমান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।
অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা কেমন?
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় প্রবণতার দুটি মৌসুম রয়েছে বলে জানান আবহাওয়াবিদরা। এ মৌসুম দুটির একটি ‘প্রি মুনসুন’ এর আওতায় মার্চ, এপ্রিল, মে এই তিন মাস অন্তর্ভুক্ত।
আরেকটি ‘পোস্ট মুনসুন’ অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর এ তিন মাস এই মৌসুমের অন্তর্ভুক্ত।
মি. মল্লিক জানান “অক্টোবর মাস ঘূর্ণিঝড় প্রবণ মাস। ১৮৯১ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শুধু ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে ৫১ টি। অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে ৪৩ টি”।
মোট ৯৪টি ঘূর্ণিঝড় এ সময়ে তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করেছে বলে জানান মি. মল্লিক।
“ গতবছর ২১ থেকে ২৫শে অক্টোবরের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় ‘হামুন’ হয়েছে। এটা চট্টগ্রামে উপকূলের দক্ষিণ দিয়ে অতিক্রম করেছে। এর আগের বছর চিত্রা ঘূর্ণিঝড় এ মাসেই তৈরি হয়েছিল,” জানান মি. মল্লিক।