ভারতের তিন রাজ্যে কেন নতুন নেতাদের মুখ্যমন্ত্রী করল বিজেপি?

“মোহন যাদব?” খুব আশ্চর্য হয়েই প্রশ্নটা করেছিলেন এক সাংবাদিক। মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালে বিজেপির কার্যালয়ে তখন সবে মাত্র ঘোষণা করা হয়েছে যে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন মোহন যাদব।

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে যাদের নাম শোনা যাচ্ছিল, সেই তালিকায় কখনওই ছিল না মি. যাদবের নাম। সেই তালিকায় প্রথম নামটি ছিল শিবরাজ সিং চৌহানের। তিনিই ছিলেন রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী। মোট চার দফায় মুখ্যমন্ত্রী ও চারবারের সংসদ সদস্য থাকা শিবরাজ সিং চৌহানকে বাদ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী করা হল বিদায়ী মন্ত্রিসভায় গত তিন বছর যিনি রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী, সেই মোহন যাদবকে।

মধ্যপ্রদেশের দুই প্রতিবেশী রাজ্য রাজস্থান আর ছত্তিশগড়েও বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছে বিজেপি। সেখানেও এমন দুজনকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেছে নিয়েছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব, যাদের সেভাবে আগে নামই শোনা যায় নি।

ছত্তিশগড়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বিষ্ণুদেব সাই আর রাজস্থানে ভজনলাল শর্মাকে বেছে নিয়েছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব।

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক ও সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলছিলেন, “এই তিনজন নেতাই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস থেকে বিজেপির রাজনীতিতে এসেছেন।"

এদের মধ্যে রাজস্থানের ভজনলাল শর্মা তো এই প্রথমবার ভোটে জিতে বিধানসভার সদস্য হলেন। তবে তিনি রাম মন্দির আন্দোলনের সময় থেকেই সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন মি. শর্মা।

“পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা ছিলেন তিন রাজ্যেই। ছত্তিশগড়ে রমন সিং, রাজস্থানের বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া বা মধ্যপ্রদেশের শিবরাজ সিং চৌহান – এই তিনজনকেই বাদ দিয়ে একেবারে নতুন চেহারা নিয়ে আসা হল,” বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।

‘টিম মোদীর সদস্য’

নরেন্দ্র মোদী বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বে আরোহণের আগে অটল বিহারী বাজপেয়ী – লাল কৃষ্ণ আদবানী জুটির সময়ে যে সব নেতারা দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন, তাদের মধ্যে একমাত্র রাজনাথ সিং ছাড়া আর কেউই দল বা সরকারে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন বাজপেয়ী-আদবানী জমানায় বিভিন্ন রাজ্যে এমন কিছু নেতা তারা তৈরি করেছিলেন, যারা হয়তো নিজেদের রাজ্যেই রাজনীতি করতেন, কিন্তু তাদের একটা সর্বভারতীয় স্তরে – দলের ভেতরে আর বাইরে, পরিচিতিও ছিল।

মি. চৌহান, মি. সিং এবং বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া বাজপেয়ী-আদবানীদের সময়কার নেতা এবং মুখ্যমন্ত্রী।

“মি. মোদী আর অমিত শাহ একেবারে নতুন মুখকে মুখ্যমন্ত্রী এই যে প্রথমবার করলেন, তা নয়। এর আগে মহারাষ্ট্র আর ঝাড়খণ্ডে তারা এটা করেছেন। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী করেছেন যোগী আদিত্যনাথকে। সেজন্যই দেখবেন বিজেপি নিজে যে ১২টি রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় আছে, প্রত্যেকটি জায়গাতেই মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে মি. মোদীর ঘনিষ্ঠদের,” বলছিলেন উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজনীতির পর্যবেক্ষক ও 'দ্য ওয়াল' নিউজ পোর্টালের কার্যকরী সম্পাদক অমল সরকার।

তার কথায়, “মি. মোদী যেভাবে দেশ চালাতে চান, তার জন্য একেবারে নিজের লোক বসাতে চান তিনি। প্রতিটা রাজ্যেই বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা যতটা না দলের নেতা, তার থেকেও তাদের বড় পরিচয় যে তারা টিম মোদীর সদস্য।

“বিজেপি যতই দেখানোর চেষ্টা করুক যে তারা নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে চাইছে, কিন্তু আদতে বিষয়টা হল নরেন্দ্র মোদীর প্রতিদ্বন্দ্বী যেন কেউ হয়ে উঠতে না-পারেন অথবা তার নেতৃত্ব নিয়ে বা সরকার পরিচালনা নিয়ে যেন কেউ কোনও প্রশ্ন তুলতে না পারেন,” বলছিলেন মি. সরকার।

মি. মোদীর যাতে 'কোনও কাঁটা না থাকে'

বর্তমানে বিজেপিতে মূলত দুই ধরণের নেতা-নেত্রী আছেন। এক দল নেতা আছেন, যারা সরাসরি আরএসএস থেকে আসা। এরা দীর্ঘদিন খুব ‘লো পাবলিক প্রোফাইল’ রেখে এসেছেন, অনেকেই তাত্ত্বিক নেতা, কিন্তু সেরকম নিজস্ব জনভিত্তি নেই।

আরেক ধরণের নেতানেত্রী আছেন, যারা অন্য দল থেকে বড়সড় জনভিত্তি সহ বিজেপিতে এসেছেন। এই দ্বিতীয় ধরণের নেতা নেত্রীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তারা কখনও কখনও আরএসএস নেতাদের থেকেও অনেকটা উচ্চস্বরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কথা বলেন।

এদের মধ্যে আছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বা পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা।

আবার গত বেশ কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে এমন ব্যক্তিদের, যারা বয়সে নবীন আর পরিচিত বা প্রতিষ্ঠিত নেতাও নন। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের আমলে এভাবেই মহারাষ্ট্রে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন দেবেন্দ্র ফাডনবীশ, ঝাড়খণ্ডে রঘুবর দাসরা।

বিশ্লেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলছিলেন, “সব ক্ষেত্রে যে একেবারে নিজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের নেতাদের নিয়ে আসছেন মি. মোদী, তার পিছনে একটা কারণ যদি হয় যে সেই ব্যক্তি ‘টিম মোদী’র সদস্য, তাহলে আরেকটা কারণ হল আরএসএস এবং মি. মোদী – উভয়েরই পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা।

“যাতে সঙ্ঘের অ্যাজেন্ডা পূরণে সরকারের বিভিন্ন স্তরকে আরও বেশি করে ব্যবহার করা যায়, আবার মি. মোদীর পথেও অভ্যন্তরীণ কোনও কাঁটা না থাকে,” ব্যাখ্যা মি. ভট্টাচার্যের।

জাতিগত সমীকরণ

তিনটি রাজ্যে যে তিনজন বিজেপি নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে, তারা যেমন প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব পছন্দের মানুষ, তেমনই তাদের বেছে নেওয়ার পিছনে জাতিগত সমীকরণও কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ছত্তিশগড় মূলতঃ আদিবাসী অধ্যুষিত রাজ্য, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে একজন আদিবাসী নেতাকে।

মধ্যপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ওবিসি বা অনগ্রসর শ্রেণী-ভুক্ত যাদব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, আর রাজস্থানের নতুন মুখ্যমন্ত্রী একজন ব্রাহ্মণ নেতা।

অমল সরকারের কথায়, “ছত্তিশগড়ে আদিবাসী এলাকায় বিজেপি খুবই ভাল ফল করেছে এবার। তা ছাড়া পুরো রাজ্যটিই আদিবাসী অধ্যুষিত। তাই সেখানে একজন আদিবাসী নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হল। আবার যাদবরা উত্তর ভারতে অনগ্রসর শ্রেণীভুক্ত হলেও তাদের যথেষ্ট সামাজিক প্রতিপত্তি আছে, সেই সমীকরণ মাথায় রেখেই সম্ভবত যাদব গোষ্ঠীর একজনকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।“

মধ্যপ্রদেশ লাগোয়া উত্তরপ্রদেশ আর বিহারে যাদবরা রাজনৈতিক ভাবে শক্তিশালী। উত্তরপ্রদেশে যাদব নেতা অখিলেশ যাদব তো প্রধান বিরোধী মুখ, আবার বিহারে লালু প্রসাদ যাদবের দল আরজেডিও এখন সরকারের জোট-সঙ্গী। তাই যাদব গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ উত্তরপ্রদেশ আর বিহারে বসবাসকারী যাদব ভোটের একটা অংশও যে মি. মোদীর লক্ষ্যবস্তু, সেটাও বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রাজস্থানে বিজেপির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া রাজপুত বংশীয়। সেখানে রাজপুতদের প্রাধান্যও যথেষ্ট। কিন্তু উত্তর ভারতের কোথাও ব্রাহ্মণ মুখ্যমন্ত্রী নেই। সেই প্রশ্ন বারে বারেই উঠেছে।

তারাও বিজেপির বড় ভোট ব্যাঙ্ক। তাদের প্রতিনিধিত্ব রাখতে একদিকে যেমন ব্রাহ্মণ মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে রাজস্থানে, তেমনই আবার রাজপুতরাও যাতে অসন্তুষ্ট না হন মিসেস সিন্ধিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার কারণে, সেই ইস্যু সামলাতে উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে আরেক সাবেক রাজবংশীয় নেত্রী দিয়া কুমারীকে।

মি. সরকার অবশ্য বলছিলেন, “জাতিগত সমীকরণ মাথায় রাখলেও আদিবাসী বা যাদব অথবা ব্রাহ্মণ মুখ্যমন্ত্রী বাছার সময়েও প্রধান মাপকাঠি থেকেছে যে তিনি নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে আছেন কী না।“