কী উদ্দেশ্যে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের ছবি প্রদর্শন করেছে ইসলামী ছাত্র শিবির?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র – শিক্ষক কেন্দ্র বা টিএসসিতে ইসলামী ছাত্র শিবিরের আয়োজিত কর্মসূচিতে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবি প্রদর্শনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে সমালোচনা।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টিএসসিতে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখে এক পর্যায়ে সেগুলো সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ছবি প্রদর্শনের ঘটনার নিন্দা করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ছাত্র নেতা এবং বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলতে গত এক বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই চিহ্নিত ও স্বীকৃত স্বাধীনতাবিরোধীদের ছবি প্রদর্শনের ঘটনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে জানান, একাত্তরকে ধারণ না করার দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বারবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তারা এ কাজগুলো করছে।
যাদের ছবি তারা প্রদর্শন করেছে তারাই ইসলামী ছাত্র শিবিরের 'হিরো' বা নায়ক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
"যেহেতু তারা দেশকে ওউন (ধারণ) করে না, একাত্তরকে ধারণ করে না। সেজন্য এই ছবিগুলো টানালে মানুষের মধ্যে সেন্টিমেন্টটা কি হতে পারে সেই উপলব্ধি করতে পারে না তারা। আমি নৈতিক দিক থেকে মনে করি, এটা তারা করতে পারে না। তারা এটা অন্যায় করেছে " বলেন মি. আহমেদ।
এদিকে, ইসলামী ছাত্র শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদের অভিযোগ, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মব সৃষ্টি করে, ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।

ছবির উৎস, Mohaiminul Islam
টিএসসিতে কী ঘটেছে মঙ্গলবার
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
জুলাই গণ অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে "৩৬ জুলাই: আমরা থামবো না" শীর্ষক তিন দিনব্যাপী এক কর্মসূচি আয়োজন করে ইসলামী ছাত্র শিবির।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ের টিএসসির ভেতরে ওই কর্মসূচির অংশ হিসেবে 'বিচারিক হত্যাকাণ্ড' শিরোনামে এক প্রদর্শনীতে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাতজনের ছবি প্রদর্শন করা হয়। আগামীকাল এই কর্মসূচি শেষ হবে।
এই প্রদর্শনীতে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ছবি প্রদর্শন করা হয়।
এছাড়া দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, শুরা সদস্য মীর কাসেম আলী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবিও স্থান পায়।
দণ্ডিতদের সাত জনের মধ্যে শুধুমাত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপি নেতা।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডিতদের বেশিরভাগই জামায়াতে ইসলামীর নেতা।
এসব রায়ে বলা হয়েছে, সেসময় তারা আল – বদর, আল শামস ও রাজাকার বাহিনীর সদস্য বা নেতা ছিলেন।
শেখ হাসিনার সরকার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের দণ্ড দেওয়ার কথা ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে।
সাত জনের মধ্যে শুধু মি. সাঈদী আমৃত্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন। কারাগারে থাকাবস্থায় মারা যান তিনি।
বাকি ছয় জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তাদের দণ্ড কার্যকর করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার সাধারণ শিক্ষার্থী ও বামপন্থী বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন 'চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী ও দণ্ডিতদের' ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করে।
একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ছবি সরাতে আহ্বান জানায়।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমকে শিক্ষার্থীরা ছবিগুলো সরিয়ে নিতে বলছে।
এ সময় প্রক্টরিয়াল টিমের একজন শিক্ষক তাদের জানান কর্মসূচির অনুমতি দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তবে শিক্ষার্থীদের আপত্তির মুখে তা সরিয়ে নিতে সম্মত হন তারা। এক পর্যায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবিগুলো সরিয়ে নিতে দেখা যায়।

ছবির উৎস, Mohaiminul Islam
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অপদস্থের চেষ্টার অভিযোগ
ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু ছাত্র শিবিরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ছবি দেখানোকে রাজাকারদের রাজনীতিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা বলে অভিহিত করেন। তার অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেকটা বিষয়কে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস চালায় এ সংগঠন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "তারা যেটা করার চেষ্টা করছে একাত্তরকে চব্বিশের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা এবং চব্বিশকে কাজে লাগিয়ে রাজাকারদের যে রাজনীতি সেটাকে পুনর্বাসনের চেষ্টা।"
পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির ব্যক্তিদের গৌরবোজ্জল করার জন্য তাদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করতে জঘন্য রাজনীতি গতকাল শিবির করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
"এটা তাদের গত এক বছর ধরে তাদের যে আস্ফালন সেই আস্ফালনের ধারাবাহিকতায় হয়েছে" বলেন মি. বসু।
একাত্তরকে খাটো করা বা ধোঁয়াশা সৃষ্টির জন্যই জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর একাত্তরে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীন হয়নি এবং চব্বিশে স্বাধীন হয়েছে এমন অপপ্রচার ছাত্র শিবির তৈরির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন মি. বসু।

বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির মনে করেন টিএসসিতে আত্মস্বীকৃত স্বাধীনতাবিরোধীদের ছবি টানিয়ে ইসলামী ছাত্র শিবির বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অপদস্থ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি থেকে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিত্তি রচিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা সর্বপ্রথম এ বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সেখানে ওই কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি বলেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, " টিএসসিতে গতকাল ছাত্রশিবির স্বাধীনতা বিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার উস্কানিদাতা নিজামী, মুজাহিদ, গোলাম আযমসহ আত্মস্বীকৃত স্বাধীনতা বিরোধীদের ছবি টানিয়ে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাকে অপদস্থ করেছে।
ইসলামী ছাত্রশিবির হচ্ছে একাত্তরের গণহত্যাকারী ছাত্রসংঘ ও আল-বদর বাহিনীর উত্তরসূরী।"
অতীতে শিবির একজন আলবদর কমান্ডারকে ডাকসুর ভিপি প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল উল্লেখ করে মি. নাছির বলেন, "তাদের দলীয় প্রকাশনাতেও তারা স্বাধীনতাবিরোধী, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য ছাপিয়েছে।"
বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবিও প্রদর্শন করা হয়েছে - এমন প্রশ্নে তিনি জানান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত রোষানলের শিকার মি. চৌধুরী।
এই ছবি প্রদর্শনের নিন্দা ও প্রতিবাদ করে এই ছাত্র নেতা জানান একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলার ধারাবাহিক চেষ্টার অংশই এটা।

ইসলামী ছাত্র শিবির যা বলছে
ইসলামী ছাত্র শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ জানান, আজ বুধবার ছবিগুলো আর নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গতকাল ছবিগুলো সরিয়ে নিয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে আজ টিএসসিতে চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের ডকুমেন্ট প্রদর্শন করা হয়েছে।
এগুলোর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার স্কাইপে কেলেঙ্কারির ঘটনা, ভুয়া সাক্ষী- যাদেরকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে জোরপূর্বক সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
যারা ছবি নিয়ে প্রতিবাদ করেছে তারা মব সৃষ্টি করে, ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেন এই শিবির নেতা।
" আমরা প্রশাসনের প্রতি মিনিমাম রেসপেক্টটুকু রেখে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছি। আমরা চাই নাই কেউ সংঘাত তৈরি করে, ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চাইলে সেটাতে আমরা ওই ট্র্যাপে পা দিতে চাই নাই। এটা তাদের নতুন না।
এটা তাদের রেগুলার প্রাকটিস। যে কাউকে পাকিস্তানি ট্যাগ দেয়া, হত্যা করা, মব সৃষ্টি করা। মব করাটা তাদের বৈশিষ্ট্য" বলেন মি. ফরহাদ।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত সকল গণহত্যার সুষ্ঠু বিচার ইসলামী ছাত্র শিবিরও চায় বলে তিনি দাবি করেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি সবাই ক্ষমতায় আসলেও কেউ সুষ্ঠ বিচারের চেষ্টা করেনি বলে দাবি করেন এই শিবির নেতা।
তিনি বলেন, "স্বাধীনতার পর ইন্সটিটিউশনালি প্রথমবারের মতো চেষ্টা করছে রাষ্ট্র। তাও এখানে সাক্ষীকে গুম করতে হইছে, স্কাইপে কেলেঙ্কারি করছে। এগুলা না করে যদি ফেয়ার জাজমেন্ট হয় সেটার পক্ষপাতী।
সেটা হওয়া দরকার। বাংলাদেশের গৌরবোজ্জল অধ্যায়ে যারা গণহত্যা করছে তাদের বিচার হবে। বিচারতো হতে হবে।"
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ইসলামী ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি চব্বিশে মুছে ফেলার চেষ্টার অভিযোগকে নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।
একাত্তর এবং চব্বিশ দুই অধ্যায়কেই নিজেদের গৌরবোজ্জল অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন এই ছাত্র শিবির নেতা।
ছাত্রদল ও বামপন্থী দলগুলো কোন এজেন্ডা না পেয়ে, আইনি যুক্তি না পেয়ে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে বলে মন্তব্য করেন মি. ফরহাদ।








