ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের পরে যে দুই ক্রিকেটারকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে

    • Author, প্রভিন
    • Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি, দিল্লি

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট স্টেডিয়ামের একটি ম্যাচের ভিডিও ২০২০ সালের আটই মার্চের পরে ভাইরাল হয়েছিল।

প্রায় এক লক্ষ দর্শক আসনের ওই স্টেডিয়াম পুরো ভর্তি হয়ে যাওয়াটা নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু সেই সময়ে করোনা মহামারি ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনেক দেশেই লকডাউন হয়ে গিয়েছিল, অন্য অনেক দেশ লকডাউনের দিকে এগোচ্ছিল।

এরকমই একটা সময়ে নারীদের ক্রিকেট ম্যাচ দেখার জন্য ৯৩ হাজারেরও বেশি মানুষ মেলবোর্ন স্টেডিয়ামে জড়ো হয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়া আর ভারত সেদিন ২০২০-র নারী টি-টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনাল ম্যাচ চলছিল সেখানে।

কয়েকমাস আগেই ভারতীয় টিমে শেফালি ভার্মার অভিষেক হয়েছিল।

ওই ম্যাচে শেফালির ব্যাট থেকে মাত্র দুই রান এসেছিল, কিন্তু ওই ম্যাচের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে শেফালি বলেছিলেন, "মাঠে এত চেঁচামেচি হচ্ছিল যে আমি কিছু বুঝতেই পারিনি"।

অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের ওই চেঁচামেচির মধ্যেই তৃতীয়বার ফাইনালে পৌঁছানো সত্ত্বেও মেলবোর্নের মাঠে নারী টি-টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ জেতার স্বপ্ন ভারতের নারী ক্রিকেট টিমের কাছে অধরাই থেকে গিয়েছিল।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

দ্বিতীয়বার নারীদের ম্যাচে এত ভিড়

সাড়ে পাঁচ বছর পরে রবিবার, দোসরা নভেম্বরই সম্ভবত দ্বিতীয়বার কোনও নারী ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে এত ভিড় হয়েছিল।

ম্যাচের আগে স্টেডিয়ামের বাইরে দর্শকদের লম্বা লাইনই বলে দিচ্ছিল যে নারীদের ক্রিকেট নিয়ে মানসিকতা বদলে গেছে।

বৃষ্টির জন্য ম্যাচ দুই ঘণ্টা পরে শুরু হয়েছিল। কিন্তু দর্শকদের মানসিকতায় এতটাই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল যে ম্যাচের মাঝে মাঝে ক্যামেরা যখন দর্শকদের দিকে ঘোরানো হচ্ছিল – একটাও ফাঁকা আসন নজরে আসেনি।

রাত যত বেড়েছে, শেফালি ভার্মা আর দীপ্তি শর্মা পুরো খেলাটাই ঘুরিয়ে দিয়েছেন। বৃষ্টির মধ্যেও মাঠে হাজির দর্শকরা নিরাশ হননি।

মেলবোর্নের মাঠে সাড়ে পাঁচ বছর আগের খেলার সময়ে ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে যে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল, রবিবারে ব্যাটিং আর বোলিংয়ে শেফালি আর দীপ্তির কামাল করা পারফর্ম্যান্স দেখে তা তারা পুষিয়ে নিয়েছেন সবাই।

ক্যাপ্টেন হরমোনপ্রীত কউর টুর্নামেন্টের আগে বলেছিলেন, "আমরা গত কয়েক বছর ধরেই ভালো পারফরম্যান্স করছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে আমরা সীমানাটা পেরোতে পারছি না। এবার আমরা সীমানা পার করব।"

রবিবার ভারতীয় নারী ক্রিকেট টিম প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতল।

বিশ্বকাপের টিমেই ছিলেন না শেফালি

বিশ্বকাপ জেতার পরে ভারতীয় টিমের যে সদস্য শেফালি ভার্মাকে নিয়ে সব থেকে বেশি আলোচনা হচ্ছে, তিনি প্রথমে বিশ্বকাপের স্কোয়াডেই ছিলেন না।

বিশ্বকাপ ফাইনালের সাত দিন আগে পর্যন্তও শেফালি ভার্মা সুরাতে সিনিয়র উইমেন টি টুয়েন্টি ট্রফিতে খেলছিলেন। ওই টুর্নামেন্টে হরিয়ানা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি।

কিন্তু ২৬শে অক্টোবর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ম্যাচে ভারতের ওপেনার প্রতিকা রাওয়াল চোট পেয়ে টুর্নামেন্টের বাইরে চলে যান। এরপরেই শেফালিকে দলে নিয়ে আসা হয়।

সেমিফাইনালে যখন শেফালি ময়দানে নামেন, তখন মাত্র পাঁচ বল ব্যাট করতে পেরেছিলেন তিনি।

তবে তিনদিন পরে দোসরা নভেম্বর যে মেজাজ নিয়ে তিনি মাঠে নামলেন, সেই একইরকম লড়াকু মেজাজ ছিল যেদিন মাত্র ১৫ বছর বয়সে ভারতীয় টিমে তার অভিষেক হয়।

প্রথম থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের নিশানা করতে শুরু করেছিলেন শেফালি। স্মৃতি মান্ধানার সঙ্গে তার জুড়ি ১০ ওভারের ৬৪ রান তুলে নিয়েছিল। স্মৃতি আউট হয়ে যাওয়ার পরেও দ্রুত রান তোলা চলছিল শেফালির।

দুটো ছয় আর সাতটা চার সহ শেফালির স্কোরকার্ডে জ্বলজ্বল করছিল ৭৮ বলে ৮৭ রানের স্কোর। তিনি যখন আউট হলেন, তখন ভারতের স্কোর ২৭.৫ ওভারে ১৬৬।

ম্যাচের শেষে শেফালি বলেন, "আমি আগেও বলেছি যে ঈশ্বর আমাকে কিছু স্পেশাল কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন, আজ সেরকমই একটা দিন ছিল। কাজটা কঠিন ছিল। কিন্তু নিজের ওপরে ভরসা ছিল। নিজের মনকে আমি বুঝিয়েছিলাম যে আমি আজ যা খুশি করতে পারি।"

ব্যাটিংয়ের সঙ্গেই বোলিংয়েও কামাল করে দিয়েছেন শেফালি।

দক্ষিণ আফ্রিকা যেভাবে ২৯৯ রানের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমে ২০ ওভারে ১১৩ রান তুলে নিয়েছিল, তাতে কোটি কোটি ভারতীয় দর্শকের স্বপ্ন ভেঙে যেতে বসেছিল।

এরকমই একটা সময়ে ক্যাপ্টেন হরমোনপ্রীত কউর বল তুলে দিলেন শেফালি ভার্মার হাতে। তার ৩১টি ওয়ানডে খেলার রেকর্ডে এর আগে মাত্র পাঁচটি ম্যাচেই বল করে এক উইকেট নিয়েছিলেন শেফালি।

তবে এদিনের স্পেলে দ্বিতীয় বলেই বাজিমাত করে দেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপ্টেন লারার সঙ্গে তখন ব্যাটার সুনে লুস ভারতের হাত থেকে ম্যাচ বাইরে বের করে নিয়ে যাচ্ছেন। সেইসময়েই সুনে লুসকে আউট করেন শেফালি।

দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলে আবারও চমক শেফালির। দক্ষিণ আফ্রিকার সব থেকে সফল অলরাউন্ডার মারিজান কাপকে চার রানে আউট করেন তিনি। মাত্র ১৩টি বলের ব্যবধানে দক্ষিণ আফ্রিকার দুটো গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন তিনি।

শেফালির ছেড়ে যাওয়া লক্ষ্য পূরণ করেন দীপ্তি

শেফালি ভার্মা আউট হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেমিফাইনাল ম্যাচের হিরো হয়ে ওঠা জেমিমাও প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। কিন্তু ক্যাপ্টেন হরমোনপ্রীতের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্রিজে টিঁকে থাকেন দীপ্তি শর্মা।

মাত্র তিন ওভারের ব্যবধানে দুটো উইকেট পড়ে যাওয়ার চাপ ছিল দীপ্তি শর্মার ওপরে। তবে দ্রুত সেই চাপ সামলিয়ে নেন তিনি। ভারতের স্কোর ৫০ ওভারে ২৯৮তে যে পৌঁছিয়ে গিয়েছিল, তার পেছনে দীপ্তির ৫৮ বলে ৫৮ রানের ইনিংসের অবদান যথেষ্টই ছিল।

আবার বোলিংয়ের ক্ষেত্রেও শেফালির পরেই থেকেছে দীপ্তির অবদান। যখন দক্ষিণ আফ্রিকার একের পর এক উইকেট পড়ে যাচ্ছে, সেই সময়ে ক্যাপ্টেন লারা আর সিনালো জাফ্টার জুড়ি ইনিংস সামলানোর চেষ্টা করছিলেন।

তবে সিনালো জাফ্টার স্কোর ১৬ রানের বেশি উঠতে দেননি দীপ্তি। এরপরে যখন লারা আর এনেরি ডার্কসনের জুড়ি ৬১ রান তুলে ফেলে, সেই জুড়িও ভাঙেন দীপ্তিই।

৪০তম ওভারের তৃতীয় বলে এনেরি ডার্কসনকে বোল্ড করে দেন দীপ্তি। তখন দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর ২০৯।

পরের ওভারের প্রথম বলেই দীপ্তি তুলে নিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপ্টেন লারার উইকেট। ততক্ষণে অবশ্য লারা ১০১ রান করে ফেলেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের ৪২ ওভারের চতুর্থ বলে আরও একটি উইকেট নেন দীপ্তি।

নিজের কোটার শেষ ওভারের তৃতীয় বলে দীপ্তি দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ উইকেট তুলে নেন – চ্যাম্পিয়ান হয় ভারত। নিজের করা ৯.৩ ওভার বোলিংয়ে ৩৯ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন দীপ্তি। আবারও নিজেকে ভারতীয় নারী ক্রিকেট দলের এক নম্বর অলরাউন্ডার হিসাবে প্রমাণিত করলেন দীপ্তি।

শেফালিকে ফাইনাল ম্যাচের 'প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ' আর পুরো টুর্নামেন্টে ২২ উইকেট নেওয়া দীপ্তি শর্মা 'প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট' নির্বাচিত হয়েছেন।

খেলার শেষে দীপ্তি শর্মা বলেছেন, "আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমরা চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল। এখনও মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি।"