আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
‘দেড় লাখ’ মামলা বিএনপি’র জন্য কতটা হুমকি?
- Author, তাফসীর বাবু
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে গত তিন মাস ধরেই মাঠের আন্দোলনে নানা কর্মসূচি দিয়ে সরব বিএনপি।
তবে দলটি দাবি করছে, এই সময়ে হঠাৎ করে দলটির নেতা-কর্মীদের নামে মামলা বেড়েছে, গ্রেফতারও হচ্ছে। যদিও দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ বেশ পুরনো।
বিএনপি এসব মামলাকে তাদের ভাষায় আন্দোলন দমাতে সরকারের কৌশল হিসেবে অভিযোগ করলেও সরকারি দল আওয়ামী লীগ দাবি করছে সহিংসতা কিংবা ভাংচুরসহ বিভিন্ন অপরাধের কারণেই এসব মামলা দায়ের হয়েছে।
‘কর্মসূচি হলে বাসায় থাকতে পারি না’
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বিএনপি কর্মী আবু মোহাম্মদ মাসুম। রূপগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সাবেক এই আহ্বায়কের নামে মামলা আছে ২৭টি।
২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এসব মামলা মাথায় নিয়েই বিএনপি’র রাজনীতি করছেন মাসুম।
তিনি বলছিলেন, “প্রতি মাসে মামলা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে নাশকতা, ককটেল বিস্ফোরণ, সরকারি কাজে বাধা দেয়া ইত্যাদি অভিযোগে মামলা। যেই মামলার কোন ভিত্তি নাই। রূপগঞ্জ থানায় এমন কোন নেতা-কর্মী নাই, যার বিরুদ্ধে মামলা হয় নাই।”
মি. মাসুম দাবি করছেন, রূপগঞ্জে তিনি এবং তার সহকর্মীরা রাজনৈতিক কারণেই মামলার মুখে পড়েছেন।
তবে কারণ যেটাই হোক, তার মতে এসব মামলা দলটির তৃণমূল রাজনীতিতে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলছে। তিনি বলছিলেন,
“কর্মসূচি হলে তো আমরা বাসায় থাকতেই পারি না। কারণ মামলা ধরে ধরে বাসায় বাসায় যায় পুলিশ। এখন আমরা যদি এলাকায় থাকতে না পারি, তাহলে এলাকার কর্মসূচি কিভাবে হবে? অক্টোবরে এখানকার দুইটা ইউনিয়নে দুইটা প্রোগ্রাম ছিলো। একটাও আমরা করতে পারি নাই। ডিসেম্বরে কর্মসূচি হয়েছে, কিন্তু মামলার কারণে লোক কম ছিলো।”
বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা কত?
দলটির দাবি অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত সারাদেশে দলটির নেতা-কর্মীদের নামে যেসব মামলা হয়েছে, তার সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।
এসব মামলায় আসামী ৩৬ লাখ। আর কারাগারে আটক ২০ হাজার।
আর গেলো অক্টোবরে বিএনপি’র ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর নতুন করে মামলা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার।
সবমিলিয়ে সংখ্যাটা বিশাল।
যদিও মামলার এই সংখ্যা বিবিসি’র পক্ষে আলাদা করে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যে বহু মামলা রয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এসব মামলায় দলটির শীর্ষ দুই নেতাসহ সাজাপ্রাপ্তও হয়েছেন আরো বেশ কয়েকজন নেতা।
বিএনপি মনে করে এসবের পেছনে আছে সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। দলটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা বলছেন, এই মামলাগুলো করাই হয়েছে বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের ভয় দেখিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য।
যখনি কোন কর্মসূচি আসে এবং আমরা পলিটিক্যাল মুভমেন্টে যাওয়ার কথা বলি, তখনি দেখা যায় মামলাগুলো একটা ভিন্ন গতি পায়।” তবে আওয়ামী লীগ আবার বলছে ভিন্ন কথা।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এবং আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া বলছেন, তার ভাষায়, বিএনপি’র নেতাকর্মীদের নাশকতা, ভাংচুরসহ বিভিন্ন অপরাধের কারণেই এসব মামলা হয়েছে। তিনি বলছেন, “২০১৩ এবং ২০১৪ সালসহ বিভিন্ন সময় বিএনপি জ্বালাও-পোড়াও করেছে। সহিংসতা করেছে। যারা বিভিন্ন সময় অপরাধ করেছে, আইনের দৃষ্টিতে যারা অভিযুক্ত অপরাধী, তাদের বিরুদ্ধেই শুধু মামলা হয়েছে। “সেখানে তদন্ত হয়েছে এবং তদন্তের ভিত্তিতেই যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেই এখন বিচার কার্যক্রম চলমান আছে। এখানে প্রতিহিংসা কিংবা প্রতিশোধের কারণে কিছু হয় নি।”
মামলা সামলাতে পারবে বিএনপি?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপি’র মাঠের আন্দোলন স্তিমিত থাকলেও গেলো কয়েকমাসে দলটির কর্মসূচিতে লোকসমাগম দেখা যাচ্ছে। বিএনপি বলছে, মামলার কারণে নানা জটিলতা তৈরি হলেও সেটা বিএনপি’র আন্দোলন থামাতে পারবে না। গেলো ১০ ডিসেম্বরের কর্মসূচির আগে দলটির মহাসচিবসহ বেশ কয়েকজন নেতা নতুন এবং পুরনো মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। এর মধ্যে দলের সিনিয়র দুই নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মির্জা আব্বাস এক মাস কারাভোগের পর গেলো সপ্তাহে জামিন পেয়েছেন।
বিএনপি’র সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা বলছেন, দলের মহাসচিবসহ সিনিয়র অনেক নেতার নামে মামলার সংখ্যা কারো ১শ ছাড়িয়েছে, কারো ১শ’র কাছাকছি।
মামলার কারণে দলটির নেতা-কর্মীরা চ্যালেঞ্জে পড়লেও মামলার ভয় আর নেতা-কর্মীদের মধ্যে নেই।
“বিএনপি কিন্তু ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। যেটা তারা (সরকার) আশা করেছিলো যে, আমরা ঘরে ঢুকে যাবো। সেটা কিন্তু হয়নি। বিএনপি’র প্রতিটা কর্মসূচিতেই এখন জনসমূদ্র। সুতরাং মামলার ভয় আমার মনে হয় না যে কর্মীরা আর পায়।”
রুমিন ফারহানা বলছেন, মামলার ভয় কাটিয়ে আন্দোলনের সক্ষমতা বিএনপি’র কর্মীদের আছে। এবং সাম্প্রতিক কর্মসূচিতেই তার প্রমাণ দেখা যাচ্ছে।
“কর্মীরা নিজেরাই বলে যে ঘরে থাকলেও মামলা খাই, কর্মসূচিতে আসলেও মামলা খাই। তার চেয়ে কর্মসূচিতেই আসি। কারণ এখন ‘ডু অর ডাই’ অবস্থা। এখন আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই এই সরকারকে ফেলতে হবে। এটাই এখন কর্মীদের মূল কথা।”
রুমিন ফারহানা বলছেন, বিএনপি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অদীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করছে।
এবং সেই আন্দোলন সফল হলে তার ভাষায়, এসব রাজনৈতিক মামলা এমনতেই প্রত্যাহার হয়ে যাবে।
তবে মামলা সামলে আন্দোলন অব্যাহত রাখা বিএনপি’র জন্য যথেষ্ট কঠিন হবে বলেই মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক জায়েদা শারমিন। তার মতে, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কর্মসূচি কিংবা জেলা, বিভাগীয় কর্মসূচিতে লোকসমাগম হলেও দলটি তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিয়নগুলোতে সেটা পারছে না। এর বড় একটা কারণ মামলা।
“এতোগুলো মামলা একটা রাজনৈতিক দলের জন্য ট্যাকল করা টাফ হয়ে যায়। কারণ মামলা মানেই হচ্ছে এগুলোতে হাজিরা দিতে হয়, যাদের নামে মামলা তারা বাসায় থাকতে পারে না।”
“এছাড়াও আরো অনেক ইস্যু আছে এখানে। নিজেদের এলাকায় নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করা -এসব কাজ মামলার কারণে কঠিন হয়ে যায়। বিএনপি অতীতেও মামলায় ভুগেছে। সুতরাং এটা দলটির আন্দোলনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”