বাংলাদেশের সাফ শিরোপা জয়ী নারী ফুটবল দলকে ঘিরে কী হচ্ছে?

ছবির উৎস, Getty Images
গেল বছরের সেপ্টেম্বরে কাঠমান্ডুতে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল (সাফ) চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল যখন দেশে ফিরে আসে, তখন ঢাকায় তাদের দেয়া হয়েছিল বিপুল সম্বর্ধনা।
সিরাত জাহান স্বপ্না ছিলেন বাংলাদেশের সেই সাফ শিরোপা বিজয়ী ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য। কাঠমান্ডুতে তিনি বাংলাদেশের হয়ে চারটি গোল করে দলের সাফল্যে বিরাট ভূমিকা রাখেন।
বিমানবন্দর থেকে যখন একটি ছাদ-খোলা বাসে করে শহরের মধ্যে দিয়ে তারা যাচ্ছিলেন, চারিদিকে মানুষের উচ্ছ্বাস আর অভিনন্দন সেই দিনটিকে স্বপ্নার মনে চিরদিনের জন্য স্মরণীয় করে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের এই বিরল সাফল্যের পর নারী ফুটবল দলকে ঘিরে সারা দেশে বয়ে যাচ্ছিল উচ্ছ্বাসের বন্যা। নারী ফুটবলারদের জন্য বাড়ি বানিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে নানা রকম আর্থিক পুরষ্কারের ঘোষণা দেয়া হচ্ছিল। তাদের ডেকে ডেকে সম্বর্ধনা দিচ্ছিল সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা এবং সংগঠন।
কিন্তু সাত মাস পর নারী ফুটবল দলকে ঘিরে সেই উচ্ছ্বাস এখন স্তিমিত। আর নারী ফুটবলারদের অনেকেই এখন হতাশার শিকার হয়ে দল ছাড়ার ঘোষণা দিচ্ছেন।
নারী ফুটবল দলকে ঘিরে কী ঘটছে?

ছবির উৎস, Getty Images
সিরাত জাহান স্বপ্না কদিন আগে জানিয়েছেন, তিনি দল ছাড়ছেন, আর ফুটবলই খেলবেন না। নারী ফুটবল দলের আরেক সদস্য আঁখি খাতুন জানিয়েছেন, তিনি চীনে চলে যাচ্ছেন। তবে ফুটবল আর খেলবেন কিনা, তা খোলাসা করে বলেননি।
দলকে সাফল্য এনে দেয়া এরকম কৃতি ফুটবলারদের এভাবে বিদায় নেয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়।
এর আগেও ফুটবল থেকে বিদায় নিয়েছেন সাফ-জয়ী দলের আরও দুই ফুটবলার আমুচিং মোগিনি ও সাজেদা খাতুন।
বাংলাদেশে নারী ফুটবলারদের যে ক্যাম্পের আয়োজন করে ফুটবল ফেডারেশন, সেখান থেকে তাদের বাদ দেয়া হয়। এরপরই তারা এই সিদ্ধান্ত নেন। কেন তাদের বাদ দেয়া হয়েছিল, তার কোন ব্যাখ্যা ফুটবল ফেডারেশন দেয়নি।
কেবল নারী ফুটবলাররা নন, এই দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনও গত সপ্তাহে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কাছে।
যার সময়ে বাংলাদেশের ফুটবলে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে, কেন তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন?
এর সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বিবিসি বাংলাকে গোলাম রব্বানী ছোটন বলেন, "এখন আমি ক্লান্ত। পুরো বিষয়টি এতো দীর্ঘ যে তা দুই চার-মিনিটে বলে বোঝানো যাবে না।"
তিনি মূলত তার কাজে হস্তক্ষেপ ও দলে বিভক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
একের পর এক ফুটবলারদের বিদায় আর কোচের পদত্যাগে নারী ফুটবল ক্যাম্পে এখন থমথমে পরিবেশ।
নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন জানান, ফুটবলাররা চান গোলাম রব্বানী ছোটন যেন ফিরে আসেন জাতীয় দলের দায়িত্বে।
"আমরা তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। উনি ছিলেন বাবার মতো, আমাদের এতদিনের কোচ, উনি এভাবে চলে যাবেন তা এখনো ঠিক হজম করতে পারছি না।”
ফুটবল ফেডারেশন যা বলছে

ছবির উৎস, Getty Images
সোমবার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির বৈঠক শেষে সংস্থার সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন নারী ফুটবলারদের বিদায় নেয়ার বিষয়টিকে মোটেই গুরুত্ব দিতে চাননি।
তিনি বলেন, "ফুটবলার গেলে ফুটবলার আসবে"।
তিনি ডিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো ফুটবলারদের কথা উদাহরণ হিসেবে টেনে বলেন, "এটা তেমন বড় কোনও ঘটনা না।"
অন্যদিকে নারী ফুটবল দলের কোচ গোলাম রব্বানি ছোটনের পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, " আমার মানহানি করতেই কোচ এরকম একটা সময়ে পদত্যাগ করেছেন।"
আবার একই সঙ্গে এই পদত্যাগকে স্বাভাবিক হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, "কোচ যাবে, পদত্যাগ করবে, ছাঁটাই হবে এটাই তো নিয়ম, এটাই হয়ে আসছে।"
বিদেশি কোচ নিয়ে বিরোধ

ছবির উৎস, Getty Images
তবে বাংলাদেশের ফুটবলের খোঁজ-খবর যারা রাখেন, তাদের ধারণা বিদেশী কোচ পল স্মলির সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরেই হয়তো বিদায় নিলেন গোলাম রব্বানি ছোটন।
ইংলিশ ফুটবল কোচ পল স্মলি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিকাল ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন। তার সঙ্গে নানা বিষয়ে মতবিরোধ ছিল বিদায়ী কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের, বলছিলেন ফুটবল সাংবাদিক সাদমান সাকিব।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "২০১৭ সালেও এমন হয়েছিল, তখন ক্যাম্প ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন গোলাম রব্বানী ছোটন।"
পল স্মলি ২০১৬ সাল থেকে বাফুফের সাথে কাজ করছেন।
নারী ফুটবলাররা কেন হতাশ?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের সারা বছরের তৎপরতা মূলত ফুটবল ফেডারেশনের আয়োজিত ক্যাম্পকে ঘিরে। কাজেই কেউ যদি এই ক্যাম্পে সুযোগ না পান, তার পক্ষে ফুটবলে টিকে থাকা কঠিন।
এর কারণ বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের সদস্যদের নির্দিষ্ট কোনও বেতন কাঠামো নেই। যারা ক্যাম্পে সুযোগ পান, তারা সেই সুবাদে ঢাকায় এসে থাকতে পারেন, খেলতে পারেন।
ক্যাম্প চলাকালে ৬৬ জনের মতো ফুটবলার মতিঝিলের বাফুফে ভবনে থাকেন।
গত মার্চে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী ফুটবলার জানান, সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে জয়ের আগে নামেমাত্র কিছু টাকা বেতন হিসেবে দেয়া হয়েছিল কিছু দিন। কিন্তু তারা এখন কোনও ধরনের বেতন পাচ্ছেন না।
এনিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কোনও কর্মকর্তাই তখন কথা বলতে চাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেছিলেন, এসব সংবাদ হলে মেয়েদেরই ক্ষতি, তারা যা পাচ্ছে তাও হারাবে।
এপ্রিল মাসের একটি সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির কাজী সালাউদ্দিনও বলেছিলেন, "নারী দল অনুশীলন না করলে তাদেরই ক্ষতি।"
এর পরপরই বাফুফে অর্থের অভাবে নারী ফুটবল দলকে অলিম্পিক বাছাই পর্বে পাঠাতে পারছে না বলে সংবাদ আসে। সেই সময় নারী ফুটবল দলের সদস্যরা বেতন থেকে শুরু করে ভালো খাবারের দাবিতে তিন দিন অনুশীলন বন্ধ রেখেছিল।
সাংবাদিক সাদমান সাকিব বলেন, একটা পর্যায়ে মেয়েদের একটা বেতন কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছিল। “তবে ২০ হাজার, ১০ হাজার ও ৮ হাজার টাকার ক্যাটাগরিতে যে বেতন দেয়া হতো, সেটি ছিল অপর্যাপ্ত,” বলছেন তিনি।
বাফুফে প্রেসিডেন্ট কাজী সালাউদ্দিন নানা সময়ে আর্থিক বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেসব প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি তিনি।
আরেকটা বড় ইস্যু ছিল ফুটবলারদের বিদেশি লিগে খেলার ছাড়পত্র না দেয়া।
সাদমান সাকিব জানান, "ফুটবলারদের বিদেশি লিগে ও একাডেমীতে খেলার সুযোগ ছিল। কিন্তু বাফুফে তাতে ছাড়পত্র দেয়নি। ৬৬ জনের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অফার ছিল, যার মধ্যে সিরাত জাহান স্বপ্নাকে ভারত থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সেখানে তাকে খেলতে দেয়া হয়নি।"
এর আগে মার্চ মাসে নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনও বিবিসি বাংলাকে বিদেশি লিগে খেলার প্রস্তাব পাওয়ার কথা বলেছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে নারী ফুটবলারদের নিয়ে যা ঘটছে তা অনেক দিনের 'জমানো ক্ষোভের' প্রকাশ।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অল্প বয়সেই ফুটবল ছেড়ে কোচিং, রেফারিং বা অন্য ক্রীড়ায় যোগ দেয়া নারী খেলোয়াড়দের তালিকা বেশ লম্বা।
অম্রাচিং মারমা - যিনি সাফ ফুটবলেও গোল করেছেন, ২৩ বছর বয়সে ফুটবল ছেড়েছেন।
জয়া চাকমা - ২৮ বছর বয়সের এই সাবেক নারী ফুটবলার বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে রেফারির দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তিনি ফুটবল ছেড়েছেন ২০১২ সালে, অর্থাৎ মাত্র ২২ বছর বয়সে।
ডালিয়া আক্তার, এখন হ্যান্ডবল ও রাগবির সাথে যুক্ত আছেন, তিনি একসময় ফুটবল খেলতেন।
"আমি ছাড়িনি, বাধ্য হয়েছি," বলছিলেন ডালিয়া আক্তার, একসময় যিনি জাতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন ।
মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তিনি ফুটবল ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন হ্যান্ডবল খেলা, আর এরপর কোচিং।
"শেষ যখন অধিনায়কত্ব করি তখন ইন্দো-বাংলা গেমসে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। এর ঠিক পরেই সাফ গেমসের জন্য যে ৩৮ জনের দল ঘোষণা করা হয়, সেখানে আমাকে ডাকাই হয়নি," জানান ডালিয়া আক্তার।








