তল্লাশির সময়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ সরিয়ে নিয়ে গেছেন মমতা ব্যানার্জী, দাবি ভারতের কেন্দ্রীয় এজেন্সির

তল্লাশি অভিযান থেকে সবুজ ফাইল সব বেরিয়ে আসেন মমতা ব্যানার্জী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, তল্লাশি অভিযান থেকে সবুজ ফাইল সব বেরিয়ে আসেন মমতা ব্যানার্জী

এক তল্লাশি অভিযান চালানোর সময়ে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্র সরিয়ে নিয়ে গেছেন বলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।

তার দল তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরামর্শ দেয় যে 'আই-প্যাক' সংস্থা, সেটির দফতর এবং সংস্থার মালিক প্রতীক জৈনের কলকাতার বাড়িতে পুরোনো একটি মামলায় বৃহস্পতিবার তল্লাশি চালায় কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। বেশ কয়েক বছরের পুরোনো এই মামলাটি কয়লা পাচার এবং অর্থ পাচার সংক্রান্ত। কলকাতা ও দিল্লিতে মোট দশটি জায়গায় তল্লাশি হয়েছে বৃহস্পতিবার।

ইডি-র তল্লাশি চলার সময়ে কলকাতায় প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং তার সংস্থার দফতর - দুই জায়গাতেই নাটকীয় ভাবে হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী এবং সেখান থেকে বেশ কিছু ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। নিজেই দাবি করেছিলেন যে ওইসব নথি তার দলের নির্বাচনী কৌশল সংক্রান্ত, তাই তিনি সেগুলি 'নিয়ে এসেছেন'।

গোড়ায় অনেকেই বিশ্বাস করেননি যে তল্লাশি অভিযান চলাকালীন বাইরে থেকে কেউ গিয়ে নথিপত্র বের করে আনতে পারেন! কিন্তু তল্লাশির শেষে ইডি এক বিবৃতি দিয়ে ঘটনাটি নিশ্চিত করেছে।

এই ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, ইডি এবং 'আই-প্যাক' – তিন পক্ষই।

সন্ধ্যা থেকে কলকাতা সহ নানা জেলায় এই তল্লাশি অভিযানের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
সল্ট লেকে পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের দফতর

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সল্ট লেকে পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের দফতর

সকাল থেকে যা যা হল

এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের দলগুলি সকাল থেকেই তল্লাশি অভিযান শুরু করে কলকাতার ছয়টি জায়গায় আর দিল্লির চারটি ভবনে। তাদের অভিযোগ, ২০২০ সালে দায়ের হওয়া একটি কয়লা পাচারের অর্থ হাওয়ালার মাধ্যমে 'আই-প্যাক' সংস্থায় এসেছে বলে তারা তদন্তে জানতে পেরেছিল।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সেই সূত্রেই সংস্থাটির বর্তমান মালিক প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল।

মধ্য কলকাতার সেই বাড়িতে প্রথমে হাজির হন কলকাতার পুলিশ কমিশনার, আর তার পরে নাটকীয়ভাবে সেখানে পৌঁছন মমতা ব্যানার্জী।

বেশ কিছুক্ষণ পরে ওই বাড়িটি থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন তার হাতে ছিল সবুজ রঙের কয়েকটি ফাইল।

তিনি বলেন, "হার্ডডিস্কের সঙ্গেই কয়েকটি মোবাইল ফোন, আমাদের প্রার্থী তালিকা আর দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল সংক্রান্ত নথি ইডি বাজেয়াপ্ত করছিল। আমি সেগুলো উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি।

সেখান থেকে তিনি যান আই-প্যাকের দফতরে। আগে থেকেই সেখানে তল্লাশি অভিযান চলছিল। ওই দফতরে প্রায় চার ঘন্টা ছিলেন তিনি। অনেক ফাইল বার করে এন তার গাড়িতে তুলতে দেখা যায়।

মমতা ব্যানার্জী বলেন, "আমি জানতে পারি যে ইডির ফরেনসিক টিম এসেছে এবং তারা কিছু ডেটা ট্র্যান্সফার করছে। তারা আমাদের কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, আর্থিক নথিপত্র আর রাজনৈতিক নথি নিয়ে নিয়েছে তারা। বিজেপির তো কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে, কিন্তু সিবিআই এবং ইডি তাদের কখনও ধরে না।"

মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, "আমি জানতাম না যে এই সব ঘটছে। আমি আই-প্যাকের প্রধান প্রতীক জৈনকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। পরে জানতে পারি যে ইডি তার ফোনটি বাজেয়াপ্ত করেছে।

"আই-প্যাক আমাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ। কোনও তথ্য প্রযুক্তি সংস্থা থেকে তথ্য নিয়ে নেওয়া কি অপরাধ নয়? এটা কি গণতন্ত্রের হত্যা নয়?" প্রশ্ন মমতা ব্যানার্জীর।

প্রায় চার ঘন্টা পরে আই-প্যাকের দফতর থেকে বেরন মমতা ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রায় চার ঘন্টা পরে আই-প্যাকের দফতর থেকে বেরন মমতা ব্যানার্জী

এই তল্লাশি অভিযানের জন্য তিনি সরাসরি বিজেপিকে নিশানা করেছেন।

তিনি বলেন, "আপনারা যদি আমাদের সঙ্গে লড়াই করতে না পারেন, তাহলে বাংলায় আসছেন কেন? গণতান্ত্রিকভাবে আমাদের পরাজিত করুন। আপনারা এজেন্সিগুলিকে ব্যবহার করে আমাদের কাগজপত্র, আমাদের রণ কৌশল, আমাদের ভোটার, আমাদের তথ্য এবং আমাদের বাংলা লুঠ করছেন। এসব করে আপনারা যতগুলি আসন জিততেন, তা শূন্য হয়ে যাবে।"

তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ সাংবাদিকদের বলেন, 'আমাদের নির্বাচনী প্রচারণার সব পরিকল্পনা যেমন কোন জেলায়, কোন গ্রামে, কারা টিমে থাকবে … এই সব কিছু চুরি করার চেষ্টা। এই 'তথ্য চুরির' বিরোধিতা করেছেন মমতা ব্যানার্জী আর তৃণমূল কংগ্রেস।

আমরা কোনো তদন্তের বিরোধিতা করছি না। যদি করতেই হত, তাহলে এতদিন তল্লাশি অভিযান চালানো হল না কেন, ঠিক নির্বাচনের আগেই করতে হল? তারা চেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের ব্লুপ্রিন্ট বিজেপির হাতে তুলে দিতে" বলেন কুনাল ঘোষ।

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য - ফাইল ছবি

বিজেপির প্রতিক্রিয়া

বিজেপি মমতা ব্যানার্জীকে নিশানা করে বলেছে যে, সত্য চিরকাল লুকিয়ে রাখা যাবে না, বাংলা সব দেখছে আর এবার বিজেপিকেই ভোট দেবে তারা।

এক্স হ্যান্ডেলে দলের তরফে লেখা হয়েছে, "ইডি যখন আই-প্যাক দফতর আর তার প্রধান প্রতীক জৈনের বাসভবনে তল্লাশি অভিযান চালায়, সেখানে যা যা হয়েছে, তা থেকে অতি উদ্বেগজনক কিছু প্রশ্ন উঠেছে।

"পদে থাকা একজন মুখ্যমন্ত্রী দলের নথিপত্র আর হার্ডডিস্ক নিতে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘটনাস্থলে গেলেন। এই ঘটনা শুধু পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা নয়, এটা একটি গভীর ষড়যন্ত্রের দিকেই ইঙ্গিত করছে," লিখেছে বিজেপি।

দলটি বলেছে, "পশ্চিমবঙ্গে যদি লুকানোর কিছু না থাকে, তাহলে একজন মুখ্যমন্ত্রী কেন সরকারি তদন্ত চলছে এমন জায়গা থেকে ফাইল উদ্ধার করতে তাড়াহুড়ো করবেন? আর তাও আবার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস থেকে?"

"এই আচরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে এইসব নথিতে কী লুকিয়ে আছে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় যে দেশবিরোধী ও দুর্নীতিগ্রস্ত কার্যকলাপের মাত্রা কতটা," মন্তব্য বিজেপির।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য শমীক ভট্টাচার্য বলেন, "সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তি প্রমাণ ও ফাইল ছিনিয়ে নিয়ে কাকে বাঁচাতে চাইছেন? কয়লা কেলেঙ্কারি ও হাওয়ালা মামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বাঁচানোর জন্য তিনি এটা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের জন্য এটি একটি কালো দিন।

তল্লাশি অভিযানের সময়ে পুলিশি ঘেরাটোপ

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তল্লাশি অভিযানের সময়ে পুলিশি ঘেরাটোপ

কী জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা?

এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে কোনও রাজনৈতিক দলের দফতরে অভিযান চালানো হয়নি।

এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা ইস্টার্ন কোলফিল্ডস থেকে লিজ নেওয়া জায়গা থেকে কয়লা চুরি ও অবৈধ খননের সঙ্গে জড়িত একটি কয়লা পাচার সিন্ডিকেট কাজ করছিল অনুপ মাজির নেতৃত্বে। সেই সংক্রান্ত তদন্তেই বৃহস্পতিবার তারা পশ্চিমবঙ্গ আর দিল্লির দশটি ভবনে তল্লাশিতে গিয়েছিল।

ইডির তরফে জানানো হয়েছে, কলকাতায় তল্লাশি প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল, কিন্তু পরে পুলিশ কর্মী ও রাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদের নিয়ে দুটি ভবনে হাজির হন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। নথি এবং বৈদ্যুতিক সাক্ষ্য প্রমাণ জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়।

ইডির তরফে জানানো হয়েছে, পুরোপুরি সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং কোনও রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে নিশানা করা হয় নি বা নির্বাচনের সঙ্গেও এর কোনও সম্পর্ক নেই।