আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিজয় দিবস পালনে পরিবর্তিত রাজনীতির ছাপ
প্রতিবছরের মত এবারো আড়ম্বর ও আনুষ্ঠানিকতায় বিজয় দিবস উদযাপন করেছে বাংলাদেশ। তবে, এবারের উদযাপনে অভ্যুত্থানের কারণে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির ছাপ স্পষ্ট।
গত দেড় দশকে যেকোনো জাতীয় দিবসে বাংলাদেশের মানুষের দেখতে বা শুনতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল এমন অনেক কিছু অনুপস্থিত এবার। নতুন কথা, স্লোগান ও উদযাপন জায়গা করে নিয়েছে সেখানে।
১৬ই ডিসেম্বরের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হয় ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে।
এরপর রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
গত ১৫ বছর ধরে সরকারপ্রধান পদে অপরিবর্তিত ছিলেন শেখ হাসিনা। জাতীয় দিবসগুলোতে আনুষ্ঠানিকতা পালনে উপস্থিত থাকতেন তিনি।
পাঁচই অগাস্ট আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের তিন দিনের মাথায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা হন মুহাম্মদ ইউনূস।
এবার সরকার প্রধান হিসেবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ সফররত পূর্ব তিমুরের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস হোর্তা।
বিজয় দিবস উপলক্ষে সোমবার সকালে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন অধ্যাপক ইউনূস। যেখানে, নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে ধারণা দেন তিনি। ঘোষণা দেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠনের।
রাজনৈতিক কর্মসূচি: আওয়ামী লীগ নেই, জামায়াত আছে
আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে দলটির সংশ্লিষ্টতাও ছিল ব্যাপক।
গত ১৫ বছরে যেকোনো জাতীয় দিবসের একটা সাধারণ চিত্র ছিল রাস্তার মোড়ে মোড়ে শেখ মুজিবুর রহমানের রেকর্ডকৃত ভাষণ প্রচার।
রাষ্ট্রীয়ভাবেও শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শনকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি পালিত হতো।
২০২৩ সালে যেমন জাতীয় পর্যায় এবং জেলা ও উপজেলায় 'জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার' শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল।
সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিজয় দিবসের আগে পরে এই কর্মসূচিতে পালিত হয়েছিল।
এবার আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য উপস্থিতি আলাদা করে চোখে পড়েনি। তবে, দলটির ফেসবুক পেজে কয়েকটি ছবি পোস্ট করে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফের একটি বিবৃতিতে বিজয় দিবসের কর্মসূচিতে বাধাদান ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও গ্রেফতারের অভিযোগ করে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি'র পক্ষ থেকে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি দেশজুড়ে আলোচনা সভা ও র্যালির আয়োজন করা হয়। সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে কনসার্টের আয়োজন করে 'সবার আগে বাংলাদেশ' নামে একটি সংগঠন যার নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপি নেতারা।
ঢাকার আরো কয়েকটি জায়গায়ও ছোট পরিসরে কনসার্টের আয়োজন ছিল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি বিজয় শোভাযাত্রা করে। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের ভারতবর্ষ ভাগ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথাও তুলে ধরা হয় সেখানে।
বিজয় দিবস উপলক্ষে কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। ঢাকাসহ সারাদেশেই র্যালি ও সমাবেশ করে তারা। পৃথক র্যালি করে ইসলামী ছাত্রশিবিরও।
বিগত বছরগুলোতে জামায়াতের দুয়েকটির বেশি প্রকাশ্য কর্মসূচি দেখা যায়নি।
বিজয় শোভাযাত্রা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গঠিত নাগরিক কমিটিও। র্যালি শেষে শাহবাগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে বক্তব্য রাখেন কমিটির নেতারা।
এছাড়া, অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বিভিন্ন আয়োজনে এবারের বিজয় দিবস উদযাপন করেছে।
বদলে গেছে দৃশ্যপট
পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিসরে নানান পরিবর্তন ঘটে চলেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আওয়ামী লীগ আমলে ঘোষিত আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
বঙ্গভবনের দরবার হল থেকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিও নামিয়ে ফেলা হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা হলেও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান কিংবা ব্যানার-পোস্টারেও তার কোনো উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
এর আগে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম জানিয়েছিলেন, শেখ মুজিবকে 'জাতির পিতা' মনে করে না অন্তর্বর্তী সরকার।
তাজউদ্দীন আহমেদসহ প্রবাসী সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া চার নেতাকে মূল্যায়ন করা হয়নি, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আছে।
তারা এখনও উপেক্ষিতই রয়ে গেছেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন।
বিবিসি বাংলাকে অধ্যাপক কার্জন বলেন, আওয়ামী লীগের পতনের অন্যতম কারণ ভোটাধিকার বা সুশাসনের মতো ইস্যুতে মানুষের ক্ষোভ।
"তাই বলে ইতিহাসকে আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। যাদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হলো তাদের বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ স্মরণ একটা পরিহাস বলে মনে হয়," যোগ করেন তিনি।
জামায়াত ইসলামী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিল।
যে কারণে তারা সাড়ম্বরে বিজয় দিবস পালন করলেও "আলবদর, আল শামস বা শান্তি কমিটি গঠনের ইতিহাস ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই" বলে মনে করেন অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন।