যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে তাকে কি লক্ষ্যবস্তু করবে ইরান, দেশটিতে সরকার পতন হলে কী হবে- পাঠকদের আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর

এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলা এবং এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, "হয়তো আমি যোগ দেব, হয়তো দেব না"।

এরকম পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের তথ্য জানতে চাচ্ছেন অনেকেই।

বিবিসির বিশ্লেষক ও সংবাদদাতারা এই সংঘাত নিয়ে পাঠক, দর্শক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের তোলা গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

এখন কেন ইরানে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল ?

এই বারের সংঘাতের বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থান হলো, তাদের হাতে এছাড়া আর কিছু করার ছিল না।

তাদের বিশ্বাস, গত কয়েক মাস ধরে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একদম শেষ ধাপে ছিল।

তারা মনে করছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া নিয়ে এতদিন ধরে যেসব আলাপ-আলোচনা চলছিলো, তা আদতে কোনো কাজে আসছিলো না।

তাই, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করাটাই ছিল তাদের সর্বশেষ অস্ত্র।

ইসরায়েল বলছে, ইরানকে তারা অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে।

তাদের মতে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে তাহলে তারা তা ব্যবহার করবে। কারণ, এর আগে ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো যে তারা ইসরায়েলকে ধ্বংস করবে।

তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এত কাছাকাছি চলে এসেছে––ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ তা মনে করে না।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) ইসরায়েলের এই ধারণার সঙ্গে একমত না।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা'র সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এরকম কোনো তথ্য উল্লেখ নেই যে ইরান শিগগিরই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে যাচ্ছে।

– জানিয়েছেন বিবিসি'র নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার

ইরানের সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

ইরানের রাজধানী তেহরানের অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ কিছু এলাকা থেকে নাগরিকদের সরে যেতে সতর্কতা জারি করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ।

আমরা ভিডিও ফুটেজে দেখেছি, তেহরানের সড়কে বিশাল যানজট তৈরি হয়েছে।

কারণ ইরানের নাগরিকরা তেহরান ছেড়ে দেশটির উত্তর অংশে চলে যাচ্ছে এবং তারা মনে করছে ওই অঞ্চলটি এখনো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।

কিন্তু বাস্তবে ইরানের উত্তর দিকের সেই এলাকাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে।

আসলে ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্য যেহেতু এতটা বিস্তৃত, তাই এখন ইরানের কোনো এলাকাকেই পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না।

ইরানের সরকার ঘোষণা করেছে, দেশটির মেট্রো স্টেশনগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে, যেন মানুষ সেগুলোতে আশ্রয় নিতে পারে।

তেহরানে এক কোটির মতো মানুষ বসবাস করে। তাই, এত বিশাল সংখ্যক মানুষকে সরিয়ে নেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়।

– নাফিসেহ কোহনাভার্দ, বিবিসি'র মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা

যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে জড়ালে তাকে ইরান লক্ষ্যবস্তু করবে?

এই সংঘাতে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের জন্য এর পরিণতি বেশ গুরুতর হওয়ার ঝুঁঝি রয়েছে।

কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে এবং ওই অঞ্চলের প্রায় ১৯টি স্থানে তাদের ঘাঁটি রয়েছে।

এছাড়া, সাইপ্রাসে অনেক মার্কিন কর্মকর্তা রয়েছে এবং বাহরাইনে একটি মার্কিন নৌ-ঘাঁটিও রয়েছে।

এখন এইসব স্থানকে লক্ষ্যবস্তু করে ইরান হামলা চালাবে কি না তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এবং কত পরিসরে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তার ওপর।

– বিবিসি'র 'সিকিউরিটি ব্রিফ'-এর হোস্ট মাইকি ক্যে

এতদিন যাদের সহায়তা করেছে ইরান, তারা কি পাশে থাকবে?

আমার মনে হয় না, অন্তত এখন আর না।

২০২৩ সালের সাতই অক্টোবর ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।

তারা গাজায় হামাসকে অনেকটাই দুর্বল করে ফেলেছে। লেবাননে হেজবুল্লাহর অস্ত্রভাণ্ডারও অনেকাংশে খালি করে দিয়েছে।

সিরিয়াও এখন আর ইরানের মিত্র না। কারণ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, যদিও সেটা ইসরায়েলের কারণে নয়।

অন্যদিকে, হুথি বিদ্রোহীরা এখন ইয়েমেনে তুলনামূলকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। ফলে তাদের মধ্যেও খুব ভালো সমন্বয় নেই।

– বিবিসি'র নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার

ইরানের নেতা কে এবং তার জনসমর্থন কতটা?

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি।

তিনি মূলত ধর্মীয় নেতা। কিন্তু তার ক্ষমতা দেশের প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি।

পদমর্যাদায় তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এবং দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও তিনি প্রধান।

তবে তিনি ইরানের জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন পান না।

দেশটির জনগণের মাঝে বিভাজন রয়েছে এবং তা দিনে দিনে আরও বাড়ছে।

মাত্র দুই বছর আগে ইরানে সরকারবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিলো। সেই বিক্ষোভে নারীরাও অংশ নিয়ে নিজেদের অধিকার ও স্বাধীনতার দাবি জানায়।

কিন্তু আমরা বলতে পারি না যে এই সরকারের সমর্থক নেই। বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীর সাথে এই সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

– নাফিসেহ কোহনাভার্দ, বিবিসি'র মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা

ইরানের সরকার পতন হলে কী হবে?

এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই।

গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, ইরানে সংগঠিত এমন কোনো বিরোধী শক্তি নেই যারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকার পতন ঘটাতে পারে।

তবে বর্তমানে কিছু বিকল্প রয়েছে। তাদের মাঝে একজন হলেন রেজা পাহলভি। তিনি ইরানের সাবেক শাহ'র পুত্র, যিনি এখন নির্বাসিত হয়ে বিদেশে বসবাস করছেন।

ইরানের ভেতরে ও বাইরে তার আরও কিছু সমর্থক রয়েছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা কত, সেটা স্পষ্ট নয়।

তবে তার বিরোধীও রয়েছে, বিশেষ করে ইরানের সংস্কারপন্থিরা।

তারা হয়তো ৪০ বছর আগে পতন হওয়া সেই রাজতন্ত্রে ফিরে যেতে চাইবে না।

তাই, এখনই বলা যাচ্ছে না যে ইরানে সরকার পতনের পর কে তার স্থলাভিষিক্ত হবে।

– নাফিসেহ কোহনাভার্দ, বিবিসি'র মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা

ফোর্দো কোথায় এবং এটি কী?

ফোর্দো তেহরান থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত এবং এটি ইরানের দু'টি গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার একটি।

এটিকে পর্বতের নিচে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে এটি সুরক্ষিত থাকে।

ভূগর্ভস্থ এই কেন্দ্রে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে মজুত করে।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ইতোমধ্যেই ফোর্দোতে হামলা চালিয়েছে।

তবে ধারণা করা হচ্ছে, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ফোর্দোর চারপাশে থাকা ইরানের সার্ফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো।

কারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা গেলে ফোর্দো সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ধ্বংস করা সহজ হয়ে যাবে।

– বিবিসি'র 'সিকিউরিটি ব্রিফ'-এর হোস্ট মাইকি ক্যে

পারমাণবিক বোমা তৈরির কতটা সন্নিকটে ইরান?

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর একমাত্র ইরানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পরমাণু বিজ্ঞানীরা, শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এবং সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি-ই জানেন।

এ বিষয়ে বাদবাকি সব আলোচনা অনুমানভিত্তিক।

তবে চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘের পরমাণু বিষইয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ জানায়, ইরান প্রায় ২০ বছর পর প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বিষয়ক চুক্তির শর্ত ভেঙে এমন কিছু কাজ করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে ইঙ্গিত দিতে পারে।

সংস্থাটি জানিয়েছে যে ইরান প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে, যা বেসামরিক পারমাণবিক কাজের চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।

আইএইএ আরও বলেছে যে তারা ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলো। কিন্তু ইরান তাদের পুরোপুরি সহযোগিতা করেনি। তাই, তারা এটি নিশ্চিত হতে পারেনি যে ইরান ইউরেনিয়ামের মতো পদার্থ দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে কি না।

একইসাথে, তারা এটিও বলছে না যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে ছুটছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গত সপ্তাহে বলেছে, "গত কয়েক মাসের গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, ইরান এর আগে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এতটা কাছাকাছি ছিল না।"

কিন্তু ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এই গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে একমত নয়।

চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স এর ডিরেক্টর তুলসী গ্যাবার্ড কংগ্রেসে বলেন, "ইরানের কাছে বিপুল পরিমাণে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মানের ইউরেনিয়াম থাকলেও তাদেরকে পারমাণবিক বোমা বানাতে দেখা যায়নি।"

তবে অতি সম্প্রতি তিনি সেই কথা পাল্টে ফেলেছেন এবং বলেছেন, তিনি এখন বিশ্বাস করেন যে "কয়েক সপ্তাহের মধ্যে" পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে ইরান।

অন্যদিকে, ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

– বিবিসি'র নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার

ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র আছে?

ধারণা করা হয়, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে।

কিন্তু আসল উত্তর হলো, আমরা জানি না।

ইসরায়েল কখনো প্রকাশ্যে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা স্বীকার করেনি বা অস্বীকারও করেনি।

নতুন কোনো দেশ যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করে সেজন্য যে 'পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি' (এনপিটি) করা হয়েছিলো, ইসরায়েল তার সদস্য নয়।

পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য তিনটি জিনিস থাকা প্রয়োজন। আর তা হলো–– ৯০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, ওয়ারহেড তৈরি করার ক্ষমতা ও সেই ওয়ারহেড নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিক্ষেপ করার ব্যবস্থা।

এগুলোর কোনোটির ব্যাপারেই ইসরায়েল কিছু বলেনি।

– বিবিসি'র 'সিকিউরিটি ব্রিফ'-এর হোস্ট মাইকি ক্যে