হিন্দুত্ববাদের 'জনক' সাভারকারের ক্ষমাভিক্ষা নিয়ে যে বিতর্ক

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

‘মোদী' পদবীধারীদের সবাই চোর - এমন ইঙ্গিতপূর্ণ এক মন্তব্যের জেরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সংসদ সদস্যপদ খারিজ হওয়ার পরে এক সংবাদ সম্মেলনে মি. গান্ধী বলেছিলেন, “আমি সাভারকার নই, আমি গান্ধী। ক্ষমা আমি চাইব না।“

ওই মন্তব্যে ‘সাভারকার' বলতে তিনি বুঝিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের জনক বলে কথিত বিনায়ক দামোদর সাভারকারকে।

ঐতিহাসিকদের একটা বড় অংশ দাবী করেন, আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দী থাকার সময়ে মি. সাভারকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে একাধিকবার ক্ষমাভিক্ষা করে চিঠি লিখেছিলেন এবং রাহুল গান্ধী সেদিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে।

রাহুল গান্ধীর ওই মন্তব্যের পরে মি. সাভারকারের নাতি রঞ্জিত সাভারকার বলেছেন, এরকম কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণই নেই যে ব্রিটিশ সরকারের কাছে তার পিতামহ ক্ষমা ভিক্ষা করেছিলেন।

এর আগেও মি. সাভারকারের ক্ষমাভিক্ষা চাওয়ার প্রসঙ্গে মি. গান্ধী মুখ খোলায় রঞ্জিত সাভারকার পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এবারেও সেই একই হুমকি দিলেন তিনি।

'ব্রিটিশ সরকারের অনুগত' থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন সাভারকার

ইতিহাসবিদরা বলছেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার যে কারামুক্তির জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, সেই দলিল রয়েছে।

ঐতিহাসিকরা দীর্ঘদিন ধরেই দাবী করেন যে বিনায়ক দামোদর সাভারকার আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দী থাকাকালীন একাধিকবার ব্রিটিশ সরকারের কাছে ক্ষমাভিক্ষা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন।

“বিনায়ক দামোদর সাভারকার ১৯১১ সালের জুলাই মাসে সেলুলার জেলে বন্দী হয়ে আসেন। সেই বছরেরই ৩০ অগাস্ট তিনি প্রথম ক্ষমাভিক্ষার চিঠিটি লেখেন। সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। তারপরে ২৯ অক্টোবর, ১৯১২, নভেম্বর ১৯১৩, সেপ্টেম্বর ১৯১৪ আবারও ক্ষমাভিক্ষার চিঠি লেখেন,” বলছিলেন আন্দামানের সেলুলার জেল নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক অমিত রায়।

তার পরে ১৯১৫, ১৯১৬ এবং ১৯১৭ সালে মি. সাভারকার আরও তিনটি ক্ষমাভিক্ষার আবেদন জমা দেন।

অধ্যাপক রায়ের কথায়, “ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের বই ‘পেনাল সেটলমেন্টস ইন আন্দামান’-এ এইসব তথ্য রয়েছে। ওই বইয়ের ২১১ থেকে ২১৩ পৃষ্ঠায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।"

"মি. সাভারকারের একটা চিঠির ভাষা ছিল এরকম : ‘সরকার যদি তাদের বহুমুখী দয়ার দানে আমাকে মুক্ত করে দেন, তাহলে আমি আর কিছু পারি না পারি চিরদিন সাংবিধানিক প্রগতি এবং ব্রিটিশ সরকারের আনুগত্যের অবিচলিত প্রচারক হয়ে থাকব। সরকার আমাকে যত কাজ করতে বলবে, সেই মতো আমি সব কাজ করতে প্রস্তুত। কারণ, আমার আজকের পরিবর্তন যেহেতু বিবেকের দ্বারা পরিচালিত, তাই আমার ভবিষ্যতের আচরণও সেইরকমই হবে," মি. সাভারকারের চিঠি উদ্ধৃত করে বলছিলেন অধ্যাপক রায়।

ক্ষমা চেয়ে 'রাজনীতি না করার' অঙ্গীকারও করেছিলেন তিনি

“মি. সাভারকার আরও লিখেছিলেন, ‘অন্যভাবে যা পাওয়া যেতে পারে, সেই তুলনায় আমাকে জেলে আটকিয়ে রাখলে কিছুই পাওয়া যাবে না। শক্তিশালীর পক্ষেই একমাত্র ক্ষমাশীল হওয়া সম্ভব। কাজেই অনুতপ্ত সন্তান পিতৃতুল্য সরকারের দরজা ছাড়া আর কোথায় ফিরে যাবে। মহামান্য হুজুর অনুগ্রহ করে বিষয়টি বিবেচনা করবেন এই আশা রইল।“

বিনায়ক দামোদর সাভারকারকে শেষমেশ ১৯২৪ সালে আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে সরিয়ে মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেলে রাখা হয়। তারপরে বেশ কিছুদিন তিনি ঘর-বন্দীও ছিলেন।

ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে মি. সাভারকার স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে লন্ডনে গ্রেপ্তার হলেন, সেই তিনিই কীভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে এইভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন?

তিনি ১৯২০ সালে যে আবেদন করেছিলেন, তাতে তিনি বলেছিলেন "সংবিধান মেনে রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালাতে তিনি রাজি আছেন এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য রাজনৈতিক কোন কার্যক্রমে তিনি জড়িত থাকবেন না", বলছেন ঐতিহাসিক এবং মি.সাভারকারের ওপর দুই খণ্ডের জীবনী গ্রন্থের লেখক ভিক্রম সম্পথ।

সমালোচকরা আরও বলেন যে এই নেতা নিজে যে আবেদনগুলো লিখেছিলেন তা তিনি গোপন রেখেছিলেন।

'ক্ষমাপ্রার্থনা করলেও সেটা ছিল কৌশল'

মি. সাভারকারের কিছু সমর্থক এই তত্বের ঘোর বিরোধী। তারা বলছেন, তিনি কখনই এমন কোন আবেদনপত্র লেখেননি, আর লিখে থাকলেও তিনি কখনও ব্রিটিশদের কাছে ক্ষমা চাননি।

আরএসএস অবশ্য বলছে যদি মি. সাভারকার ক্ষমাপ্রার্থনা করেও থাকেন, সেটা তিনি করেছিলেন একটা রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে। এই প্রসঙ্গে আরএসএস উদাহরণ দেয় কমিউনিস্ট নেতা এসএ ডাঙ্গের।

“মি. ডাঙ্গেও তো কানপুর ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী হওয়ার ঠিক পরেই ক্ষমাভিক্ষার আবেদন করেছিলেন,” বলছিলেন আরএসএস নেতা ও সংগঠনটির দক্ষিণবঙ্গের সাধারণ সম্পাদক জিষ্ণু বসু।

“দুজনের ক্ষমাপ্রার্থনার ভাষাও ছিল এক। দুজনেই লিখেছিলেন ইয়োর মোস্ট ওবেডিয়েন্ট সার্ভেন্ট। মি. ডাঙ্গে জেলে ছিলেন মাত্র এক বছর, সেখানে মি. সাভারকার কত বছর জেলে ছিলেন, সেটাও তো দেখতে হবে। তার মতো বিপ্লবীকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে, তার যে সামাজিক কাজকর্ম, সেগুলোরও বিচার করতে হবে,” বলছিলেন মি. বসু।

“লেনিনের সঙ্গে মি. সাভারকারের দেখা হয় লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউসে। লেনিন কী বলতেন মি. সাভারকারের ব্যাপারে, সেই তথ্য রয়েছে রুশ কমিউনিস্ট বিপ্লবী মিখাইল প্যাভলোভিচের বইতেই। মি. সাভারকার যখন লন্ডনে ধরা পড়েন, তার হয়ে মামলা লড়েছিলেন কার্ল মার্ক্সের নাতি," - বলছিলেন মি. বসু।

"তাই তিনি কৌশল হিসাবে যদি ক্ষমাপ্রার্থনা করেও থাকেন, সেটা তো তার বিপ্লবী আর সংগ্রামী আদর্শের পরিপন্থী হয়ে যায় না,” ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন মি. বসু।

তিনি আরও বলছিলেন যে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কিছু “কায়েমি স্বার্থে” মি. সাভারকারের মতো একজন “মহামানবকে ছোট করে দেখানো হতে থাকে”।

“রাজনৈতিক চশমা না পরে মি. সাভারকারকে বিচার করতে হবে,” মন্তব্য জিষ্ণু বসুর।

তবে গবেষক অমিত রায় বলছেন, “আরএসএস তো কখনও স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয় নি। তাই তাদের দরকার ছিল একটা আইকনের। মি. সাভারকার একদম আদর্শ আইকন তাদের কাছে, কারণ তিনি একটা সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, আবার হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের জনকও তিনি।“

রাহুল গান্ধীর মন্তব্যে ক্ষুব্ধ মহারাষ্ট্রের নেতারা

ব্রিটিশ সরকারের কাছে মি. সাভারকারের ক্ষমা চাওয়া নিয়ে মন্তব্যের কারণে বিজেপি, শিবসেনা তো বটেই, মহারাষ্ট্রের অন্য রাজনৈতিক দলগুলিও রাহুল গান্ধীর ওপরে অসন্তুষ্ট।

এদের মধ্যে কংগ্রেসের জোট সঙ্গী এনসিপি যেমন আছে, তেমনই আছে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার অংশটিও।

বিনায়ক দামোদর সাভারকারের প্রতি মহারাষ্ট্রের একটা বড় অংশের মানুষ খুবই শ্রদ্ধাশীল। সেই ভাবাবেগে যাতে আঘাত না লাগে, সেজন্যই মি. সাভারকারকে নিয়ে কোনও বিরূপ মন্তব্যের বিরোধিতা হয় সে রাজ্যে।

জোট সঙ্গীদের এই মনোভাবের কথা কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে পৌঁছিয়েছে এবং মহারাষ্ট্রের কথা মাথায় রেখেই আপাতত রাহুল গান্ধীকে দল নির্দেশ দিয়েছে যে তিনি যেন মি. সাভারকারকে নিয়ে আর মন্তব্য না করেন।

কেন মি. সাভারকারকে শ্রদ্ধা করেন মহারাষ্ট্রের মানুষ?

“বিনায়ক দামোদর সাভারকার মহারাষ্ট্রের বহু মানুষের কাছেই একটা ভাবাবেগ। এদের মধ্যে যেমন বেশীরভাগ মানুষ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সমর্থক, তেমনই তার বাইরেও অনেক মানুষ আছেন যারা বি ডি সাভারকারের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল”, বলছিলেন বিবিসি মারাঠি বিভাগের ময়ূরেশ কুন্নুর।

তার কথায়, “এটা ঠিকই মি. সাভারকারের লেখা বই : ‘হিন্দুত্ব – হিন্দু কে’ বইটিই আরএসএসের মতাদর্শ আকরগ্রন্থ। ওই লেখা থেকেই হিন্দুত্ববাদী চিন্তাভাবনার শুরু। আবার মি. সাভারকার হিন্দু মহাসভার সভাপতিও ছিলেন।"

"এইসব কারণে হিন্দুত্ববাদের সমর্থকরা তাকে প্রায় দেবতার মতো ভক্তি করেন" - বলছিলেন তিনি।

"কিন্তু আরেকটা অংশের মানুষ আছেন, যারা মি. সাভারকারের সামাজিক কাজকর্ম, দলিতদের জন্য প্রায় তিনশো মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়ার জন্য আন্দোলন এবং এসবেরও আগে স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অংশগ্রহণ, বহু বছর আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দিজীবন, এসবের জন্য তাকে শ্রদ্ধা করেন।“

মি. কুন্নুর ব্যাখ্যা করছিলেন, মি. সাভারকারের নামে যে আবেগ আছে, তা দিয়ে ভোট পাওয়া যায় কীনা, তার নিশ্চিত কোনও তথ্য নেই, কিন্তু মহারাষ্ট্রের কোনও রাজনৈতিক দলই মি. সাভারকারের সমালোচনা হোক সেটা চায় না।

“এটা দলগুলোর একটা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা,” বলছিলেন ময়ূরেশ কুন্নুর।

তবে ১৯৬৬ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকারের মৃত্যুর এতবছর পরেও তিনি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।

তার সমর্থকদের কাছে তিনি বীর সাভারকার, আর সমালোচকদের কাছে তিনি নিন্দিত।