ভারতে লাইভ টিভিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার আতিক আহমেদের ইতিবৃত্ত

তার ওপর গুলি ছোঁড়ার আগে হাতকড়া পরা আতিক আহমেদ (বাঁয়ে) ও তার ভাই

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, তার ওপর গুলি ছোঁড়ার আগে হাতকড়া পরা আতিক আহমেদ (বাঁয়ে) ও তার ভাই। তাদেরকে ঘিরে পুলিশ ও সাংবাদিক।

যদি বলা হয় আতিক আহমেদ ছিলেন বিতর্কিত একজন ব্যক্তিত্ব তাহলে খুব কম বলা হবে।

উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এলাহাবাদ নামে যে শহরের নাম বদলে প্রয়াগরাজ রাখা হয়েছে সেখানকার দরিদ্র এক পরিবারের জন্ম হয়েছিল ৬০ বছর বয়স্ক প্রয়াত আতিক আহমেদের।

পড়াশোনা তেমন ছিল না। স্কুল থেকেই ঝরে পড়েছিলেন। কিন্তু কালে কালে একটা সময়ে প্রচুর অর্থ-কড়ি বানিয়েছিলেন।

সেই সাথে গড়ে তুলেছিলেন রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি ছড়িয়ে পড়েছিল তার নিজের শহর ছাড়াও আশপাশের এলাকায়।

মি. আহমেদ ১৯৮৯ সাল থেকে পাঁচবার উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বিধানসভায় নির্বাচিত হন। তারপর ২০০৪ সালে শহরের ফুলপুর নির্বাচনী এলাকা থেকে লোকসভা নির্বাচনে জেতেন।

উত্তর প্রদেশ রাজ্য পুলিশের সাবেক মহাপরিচালক বিক্রম সিং মি. আতিক আহমেদকে তুলনা করেন “রবিন হুড” চরিত্রের সাথে যিনি “ঈদের সময় খরচ হিসাবে বা স্কুলের পোশাক বা বই কেনার জন্য গরিব পরিবারগুলোকে দুই হাতে টাকা বেলাতেন।''

কিন্তু একইসাথে তার বিরুদ্ধে অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি এবং জমি দখলের মত বহু অভিযোগ ছিল। একশরও বেশি অপরাধের মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে ।

মি সিংয়ের মতে আরও অনেক অপরাধের সাথে তার জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল যদিও সেগুলোতে কোনও মামলা হয়নি কারণ “তার বিরুদ্ধে মামলা করতে মানুষজন ভয় পেত।''

গত বিশ বছরে কয়েকবার তিনি কারাগারে গেছেন, কিন্তু উত্তর প্রদেশের অপরাধ জগতের ওপর তার প্রভাব অনেকটাই অক্ষত ছিল এবং নিজের মানুষদের তিনি রক্ষা করতে পেরেছিলেন।

কিন্তু কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি উত্তর প্রদেশের ক্ষমতায় আসার পর থেকে তার প্রতিপত্তি কমতে শুরু করে। রাজ্যের অন্যতম বড় দল সমাজবাদী পার্টির সাথে সম্পর্ক ছেদ হওয়ায় তিনি আরও চাপে পড়েন।

হত্যাকাণ্ডের জায়গায় পুলিশের ফরেনসিক দল
ছবির ক্যাপশান, হত্যাকাণ্ডের জায়গায় পুলিশের ফরেনসিক দল
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এক অপরাধের মামলায় ২০১৭ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে গুজরাট রাজ্যের একটি কারাগারে পাঠানো হয়।

এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে উমেশ পাল নামে এক ব্যক্তির হত্যায় জড়িত থাকার দায়ে তার বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়। উমেশ পাল ছিলেন ২০০৫ সালে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল বিএসপির একজন বিধায়ক রাজু পাল হত্যা মামলার অন্যতম একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

রাজু পাল হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামি ছিলেন আতিক আহমেদ এবং তার ভাই। ফলে, সাক্ষী উমেশ পাল হত্যাকাণ্ডের জন্য তাদেরকে দায়ী করা শুরু হয়।

ফেব্রুয়ারিতে ঐ হত্যাকাণ্ডের পর একে একে আহমেদ পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং সমর্থকের প্রাণ গেল। এমনকি প্রয়াত আতিক আহমেদের স্ত্রীও পলাতক। পুলিশ তাকে খুঁজছে। খবর দিতে পারলে পুরষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

দুই ছেলে কারাগারে। বাকি দুই ছেলের বয়স কম হওয়ায় তাদেরকে সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

উমেশ পাল হত্যা মামলায় শুনানির জন্য মি. আহমেদকে গুজরাটের কারাগার থেকে প্রয়াগরাজের আদালতে আনা হয়। সে সময় উত্তর প্রদেশের এক কারাগারে আটক তার ভাইকেও আনা হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার, তার ১৯ বছরের ছেলে আসাদ এবং তার এক সহযোগী পুলিশ এনকাউন্টারে মারা যায়। অভিযোগ উঠেছে পুলিশ পরিকল্পনা করে তাদেরকে হত্যা করেছে।

শনিবার টিভিতে লাইভ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় আতিক আহমেদ ও তার ভাইকে হত্যার ঘটনার পর রোববার সকালে প্রয়াগরাজকে ভূতুড়ে শহর বলে মনে হচ্ছিল।

প্রয়াত আতিক আহমেদের তার ১৯ বছরের ছেলে আসাদ

ছবির উৎস, UP POLICE HANDOUT

ছবির ক্যাপশান, বৃহস্পতিবার প্রয়াত আতিক আহমেদের ১৯ বছরের ছেলে আসাদ পুলিশ এনকাউন্টারে মারা যায়।

ঈদের আগে শহরের পুরনো অংশে যেখানে এখন অনেক ভিড়ভাট্টা, হৈচৈ থাকার কথা, সেখানে এলাকাটি ছিল একদম ফাঁকা। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় ছিল পুলিশ। হত্যাকাণ্ড নিয়ে মিডিয়ার সামনে স্থানীয়রা মুখ খুলতে চাইছিল না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার ৪০ বছরের একজন মুসলিম বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন এলাকাবাসী হতভম্ব হয়ে পড়েছে।

“কীভাবে পুলিশ এবং মিডিয়ার সামনে এমন হত্যাকাণ্ড হতে পারলো? মানছি তিনি একজন দাগি অপরাধী, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাকে এভাবে মারতে হবে। আইনের শাসন বলে কি কিছু নেই?

“অনেকেই মনে করছে মুসলিম বলেই কি তাকে এভাবে হত্যা করা হলো? শহরে প্রচণ্ড আতংক। আমাদের সাথে এমন হওয়া ঠিক নয়।”