৫০ আসনের মধ্যে বুথ দখল ও জাল ভোট হয়েছে ৫১ শতাংশ কেন্দ্রে: টিআইবি

বাংলাদেশের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে 'একপাক্ষিক' ও ‘পাতানো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ আখ্যা দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নির্বাচন 'অবাধ হয়নি' এবং সেটি 'বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য অশনি সংকেত' বলে সংস্থাটি বলছে।
নির্বাচনের ৫০টি আসনের ওপর চালানো একটি গবেষণায় টিআইবি দেখতে পেয়েছে, সেখানে ৫১ শতাংশ কেন্দ্রে বুথ দখল, জাল ভোট প্রদান ও প্রকাশ্যে সিল মারার মতো ঘটনা ঘটেছে।
সেইসাথে, এসব আসনে ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটারদেরকে জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
বুধবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিং’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
টিআইবি বলছে, 'নির্বাচন কমিশন কখনো অপারগ হয়ে, কখনো কৌশলে, একতরফা নিবাচনের এজেন্ডা বাস্তবায়নের অন্যতম অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান একইভাবে সহায়ক ভূমিকায় ব্যবহৃত হয়েছে বা লিপ্ত থেকেছে।
সংসদ নির্বাচনের ৫০টি আসনে নির্বাচনের দিন সংঘটিত অনিয়মের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ আসনে নির্বাচনি বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে, অনিয়ম প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
অথচ, নির্বাচনি বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি পরিমাণ (৫৪ শতাংশ) অর্থ ব্যয় করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য। এই খাতে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

টিআইবি বলেছে, অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ নির্বাচন না হওয়ার প্রধান কারণ হলো, নির্বাচিনকালীন সরকার ইস্যুতে দুই বড় দলের বিপরীতমুখী ও অনড় অবস্থান। এ বিপরীতমুখী ও অনড় অবস্থানকেন্দ্রিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লড়াইয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জিম্মিদশা প্রকটতর হয়েছে।
যেসব আসনে স্বতন্ত্রপ্রার্থী ছিল, সেইসব আসন সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “৬২ আসনে স্বতন্ত্রপ্রার্থীর সার্বিক চিত্র হলো- একটা পাতানো প্রতিযোগিতামূলক, অনেকক্ষেত্রে সহিংস এবং সংঘাতময় নির্বাচন হয়েছে। সার্বিকভাবে এসব আসনে প্রতিযোগিতা হয়েছে, তবে সেটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা।”
“তবে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার একটি মাত্র ইতিবাচক দিক হচ্ছে, তারা পরস্পরের প্রতি বিষোদ্গার এবং পাল্টা অভিযোগ করায় দুর্নীতি, অনিয়ম, অবৈধতা ইত্যাদি বিষয়গুলো যথার্থতা পেয়েছে। অর্থাৎ, তারা নিজেরাই নিজেদের সম্পর্কে অভিযোগ করেছেন।”
এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে যথেষ্ট ঘাটতি ছিল বলেও ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “যাদেরকে সরকার দলের বাইরের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে, তারা হয় সরকার দলের সদস্য, অথবা সরকারের সমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দলের সদস্য।”

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
শেষের এক ঘণ্টায় বেশি ভোট পড়া নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “নির্বাচন কমিশন যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, সেটা কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তার কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। পক্ষে-বিপক্ষে বলার কোনো সুযোগ নেই। এটি বিতর্কিত আছে এখনও এবং আমার ধারণা, এটি বিতর্কিতই থেকে যাবে।”
“তবে এটা উল্লেখযোগ্য যে এই হারটাকে যদি যথার্থ অনুমান করে নিই, যদি এটাই সঠিক ধারণা করা হয়, তাহলেও ৬০ শতাংশ মানুষ ভোট দান থেকে বিরত থেকেছে।”
টিআইবি বলেছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গন ও শাসন ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতার জবাবদিহিতাহীন প্রয়োগের পথ আরও প্রসারিত হয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, ক্ষমতায় অব্যাহত থাকার কৌশল বাস্তবায়নের একতরফা নির্বাচন সাফল্যের সাথে সম্পন্ন হয়েছে, যার আইনগত বৈধতা নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ হয়তো হবে না বা হলেও টিকবে না। তবে এ সাফল্য রাজনৈতিক শুদ্ধাচার, গণতান্ত্রিক ও নৈতিকতার মানদণ্ডে চিরকাল প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে।
টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের নির্বাচনী অঙ্গীকার আরও বেশি অবাস্তব ও কাগুজে দলিলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। সংসদে ব্যবসায়ী আধিপত্যের মাত্রাও একচেটিয়া পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে ব্যাপকতর স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও নীতি-দখলের ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে।
টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে যা বলছেন সরকারের মন্ত্রীরা
টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন সরকারের বেশ কয়েক জন মন্ত্রী।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করে বলেন, টিআইবি একপেশে ও পক্ষপাতিত্ব করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
“তাদের প্রত্যেকটা কথা, তাদের বক্তব্য একপেশে এবং একটা পক্ষে ওকালতি করে তারা সরকারের বিরুদ্ধে যখন যা খুশি তাই বলে। আর সেজন্যই বলছি, তারা বিএনপির দালাল,” বলেন মি. কাদের।
তবে এ বিষয়ে টিআইবির বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। মি. কাদের বলেন, “তারা একপেশে পক্ষপাতিত্ব করে সেটা বলছি, সব ব্যাপারেই কি মামলা ঠুকে দিতে হবে?”
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, টিআইবি ও বিএনপির ভাষা মিলে গেছে।
“রিজভী আহমেদ প্রতিদিন প্রেস কন্ফারেন্স করে যে কথাগুলো বলে, সেগুলোকে একটু পরিশীলিতভাবে গতকাল টিআইবি পরিবেশন করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতি দুঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পর পর যে তথ্য উপাত্তের কথা বলা হচ্ছে, সেটি ম্যানুয়াল ভোটে কখনো সঠিকভাবে দেয়া সম্ভব নয়। ভোট যদি ইভিএমে হতো, তাহলে প্রতি ঘণ্টায় কত ভোট পড়ছে সেটি বলা সম্ভব হতো। সঠিক প্রতিবেদন নির্বাচনের শেষে এসেছে বলে জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশন এবার বলিষ্ঠভাবে তাদের সক্ষমতা প্রদর্শন ও আইন কানুন প্রয়োগ করেছে বলেও দাবি করেন মি. মাহমুদ। তিনি বলেন, অতীতে কোনো নির্বাচন কমিশন এতো কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করেনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, সরকারি দলের ৫ জন প্রাথীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। চট্টগ্রাম-১৬ আসনের প্রার্থীর প্রার্থিতা নির্বাচনের দিন বাতিল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “দেশি-বিদেশি সমস্ত পর্যবেক্ষকরা বলছেন, একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, সুন্দর, স্বচ্ছ নির্বাচন হয়েছে, সেটিকে ম্লান করার উদ্দেশ্যে আসলে টিআইবি এই রিপোর্টটা দিয়েছে।”
সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত নিজ মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, টিআইবির প্রকাশিত গবেষণাপত্রটির পুরোটা তিনি পড়েছেন। সেখানে গবেষণার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কোনো কিছুই মানা হয়নি।
তার মতে ‘অংশীজন’ নাম দিয়ে যাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তারা আসলে তথ্য দেয়নি বরং তাদের মতামত দিয়েছে।
৫০টি আসনে কতগুলো কেন্দ্র বা পোলিং বুথ গবেষণায় নেয়া হয়েছে তা উল্লেখ করা হয় নাই। তিনি টিআইবিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, “আমি টিআইবিকে চ্যালেঞ্জ করতে চাই, তারা আন্তর্জাতিক মানের কোনো জার্নালে তাদের এই গবেষণা পাঠিয়ে দেখুক, তারা এটি পাবলিশ করে কিনা। যদি পাবলিশ করে তাহলে মেনে নেবো এটা একটা গবেষণা হয়েছে।”
“আন্তর্জাতিক মানের কোনো জার্নাল এটিকে গবেষণা হিসেবে পাবলিশ করা তো পরের কথা, এটাকে গ্রহণই করবে না। কারণ এটি গবেষণার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করেনি।”
পুরোপুরি ‘গোজামিল’ দিয়ে একটি প্রতিবেদন দাঁড় করানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নির্বাচনের দিন আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার ঘটনা বাংলাদেশে নজিরবিহীন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচন কমিশনের এমন শক্ত অবস্থানকে কোথাও অ্যাপ্রিসিয়েট করা হয়নি। বরং নেতিবাচক কথা বলে তাদের মোরাল নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে এই তথাকথিত গবেষণায়।”
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা রয়েছেন যাদের মনোনয়ন দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা গ্রহণ করা হয়নি। দলীয় অনেক এমপি ও নেতারা আপাত দৃষ্টিতে দুর্বল স্থানীয় নেতাদের কাছেও পরাজিত হয়েছে। এসব ঘটনা নির্বাচন কমিশনের শক্ত অবস্থানের কারণে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।








