আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সরেজমিন সিলেট: নৌকার ‘নজর’ বিএনপি-জামায়াতের ভোট ব্যাংকে
- Author, তাফসীর বাবু
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, সিলেট থেকে
সিলেট শহর থেকে সড়কপথে আধাঘণ্টার দুরত্ব গোলাপগঞ্জ আর বিয়ানিবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে সিলেট-৬ আসন।
গোলাপগঞ্জ মোড়ে আসতেই সেখানেই নির্বাচনে অংশ নেয়া সকল প্রার্থীর ব্যানার-পোস্টার দেখা গেলো। যদিও সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে তেমন উত্তাপ কিংবা প্রার্থী সমর্থকদের প্রচারণা চোখে পড়লো না।
তবুও সিলেটে যে আসনটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে অনেকে বলছেন সেটা এই সিলেট-৬ আসন।
এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তার বিরুদ্ধে নিজ দলেরই একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
তবে এই আসনটি নিয়ে আলোচনার কারণ হচ্ছে, বিএনপিবিহীন নির্বাচনে এখানে বিএনপি’রই সাবেক একজন হেভিওয়েট নেতা শমসের মুবিন চৌধুরী নির্বাচন করছেন। যদিও তার দল তৃণমূল বিএনপি।
‘কিংস পার্টি’, কিন্তু সরকার বিরোধী ইমেজে তৃণমূল
শমসের মুবিন তৃণমূল বিএনপি’র চেয়ারপারসন। তার দলীয় প্রতীক সোনালী আঁশ। নির্বাচনের বছরে নিবন্ধন পাওয়া এই দলটি ইতোমধ্যে কিংস পার্টি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেসব দল ‘সরকারের আনুকূল্য পেয়ে’ নির্বাচনের বছরে নিবন্ধন পেয়েছে তার মধ্যে তৃণমূল বিএনপি অন্যতম। তবে দলটি শেষপর্যন্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কোন ছাড় পায়নি।
সিলেটে মি. চৌধুরী চেষ্টা করছেন ভোটের মাঠে সরকার বিরোধী একটা ইমেজ তৈরি করে ভোটার টানতে। দাবি করছেন, তারা সরকারের আনুকূল্য পাওয়া কোন দল নন।
শমসের মুবিন চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, তৃণমূল বিএনপি সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় নির্বাচন করছে না।
“কিংস পার্টির কোন অভিযোগ আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আমরা কিংস পার্টি নই। আমরা জনগণের পার্টি। তৃণমূল বিএনপি সরকারের সঙ্গে কোন সমঝোতায় নেই।”
“মানুষ ভোট দিতে পারেনি এর আগে। তাদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র বাইরে এ ধরনের ভোটারের সংখ্যা অনেক। তারা আমাদেরকে বলে যে গতবার ভোট দিতে পারিনি, এবার দেবো। আমি তাদের ভোটের উপর নির্ভরশীল। তাদেরকে টার্গেট করেই এগিয়ে যাচ্ছি।”
হারের আশংকায় নৌকার ‘নজর’ বিএনপি-জামায়াতের ভোট ব্যাংকে
সিলেট-৬ আসন দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের দখলে। গেলো তিন দশকে চারবার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংকও আছে এখানে। তবে এবার সেই ভোট দুই ভাগ হয়ে যেতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
কারণ আওয়ামী লীগেরই স্বতন্ত্র প্রার্থী সরওয়ার হোসেন আছেন ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
এলাকার প্রতিটি অলিগলিতে সরওয়ারের ব্যানার-পোস্টার বেশ চোখে পড়ে।
তবে দলীয় ভোট ভাগ হলেও জয় যেন হাতছাড়া না হয় সেজন্য নৌকার প্রার্থী নুরুল ইসলাম নাহিদ নিয়েছেন ভিন্ন এক কৌশল।
তিনি ‘নজর’ দিচ্ছেন, বিএনপি-জামায়াতের ভোট ব্যাংকের দিকে।
ভোটের মাঠে নিজ দলেরই স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন এটা তিনি স্বীকারও করেন।
তবে বিবিসি বাংলাকে নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদি। তার মতে, নৌকার প্রার্থী হিসেবে দলীয় ভোট শেষ পর্যন্ত তিনিই পাবেন। এছাড়া বিএনপি-জামায়াতের ভোটও তার পক্ষে আসবে।
“বিএনপি-জামায়াতের ভোটাররা আমাকে পছন্দ করে। তারা ভোটে না থাকলেও এখানে কেউ না কেউ তো এমপি হবেই। অন্য কেউ এমপি হওয়ার বদলে তারা আমাকেই দেখতে চায়। বিএনপি-জামায়াতের অনেকেই আমাকে বলেন যে আপনি তো আমাদের জন্য ভালো। সেটা এজন্য যে আপনি এতো বছর এমপি ছিলেন কোন একটা লোককে আপনি ধরেন নাই, পুলিশ দিয়ে পেটান নাই, মামলা দিয়ে জর্জরিত করেন নাই। তারা মনে করে আমি ভালো লোক।”
কিন্তু বিরোধী দলের ভোটাররা কি আদৌ ভোট দিতে আসবে? এমন প্রশ্নে নুরুল ইসলাম নাহিদের উত্তর, নেতারা না আসলেও যারা সাধারণ সমর্থক তারা হয়তো আসবে।
জাতীয় পার্টির ভিন্ন ছক
তবে বিরোধী দলের ভোটে যে শুধু নৌকার নজর আছে তা নয়, এখানে বিরোধী ভোটারদের পক্ষে পাবে বলে আশাবাদি জাতীয় পার্টিও।
জাতীয় পার্টির প্রতীক লাঙ্গল নিয়ে এই আসনের পাড়া-মহল্লা চষে বেড়াচ্ছেন দলটির প্রার্থী জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা সেলিম উদ্দিন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসনটি ছিলো জাতীয় পার্টির দখলে। ফলে এখানে জাতীয় পার্টির নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে।
দলটির প্রার্থীও এখানে টার্গেট করেছেন বিএনপি-জামায়াতের ভোটকে।
একদিকে আওয়ামী লীগে দুই প্রার্থীতে বিভক্তি, অন্যদিকে বিরোধী দলের ভোট -দুইয়ে মিলে এমপি হওয়ার অংক কষছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম উদ্দিন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “বিএনপি বিশেষত জামায়াতের ভোট কখনোই নৌকায় পড়বে না। তারা নৌকাকে ভোট দেবে না। এখানে বিরোধী দল নেই, জাতীয় পার্টিই এখন বিরোধী দল। সুতরাং বিরোধী দলের ভোট আমিই পাবো। তারা আমাকে সজ্জন হিসেবেই জানে।”
“বিএনপি-জামায়াতের অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ ভোটারও যদি আমাকে সমর্থন করে, পাশাপাশি এখানে আমার দলেরও একটা ভোট ব্যাংক আছে, আমার নিজের ব্যক্তি ইমেজ আছে। এখানে আওয়ামী লীগের ভোট বিভক্ত হবে। সুতরাং বাকি ভোটগুলো যদি আমি পাই, তাহলে এখানে বড় ব্যবধানে জিতবে জাতীয় পার্টি।''
ভোটাররা কী বলছে?
আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি কিংবা তৃণমূল বিএনপি সবারই একটা আগ্রহ আছে বিএনপি-জামায়াত সমর্থক ভোটারদের দিকে। যদিও সেসব ভোটার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে কি না সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
কারণ, জাতীয় পার্টি-তৃণমূল বিএনপি-আওয়ামী লীগ কিংবা আওয়ামী লীগ থেকে স্বতন্ত্র – এই নির্বাচনে শক্তিশালী যে চার প্রাথী তাদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দেখেন না সাধারণ ভোটাররা।
গোলাপগঞ্জে শামসুল ইসলাম নামে একজন প্রবীণ ভোটার বিবিসি বাংলাকে বলেন, যারা বড় প্রার্থী তাদের সবাই কোন না কোনভাবে সরকারের সঙ্গে যুক্ত।
“এখানে সব তো আওয়ামী লীগ। নৌকার প্রার্থী আওয়ামী লীগ, এছাড়া স্বতন্ত্র যে আছে সেও তো আওয়ামী লীগের। আবার আরেকটা আছে জাতীয় পার্টি। সারাজীবন সরকারের সঙ্গেই থাকলো, এখন বলছে যে তারা বিরোধী দল। এখন বিরোধী দল কোনটাকে মনে করবো? এখানে সবাই তো সরকারের,” বলছিলেন শামসুল ইসলাম।
বিধান চন্দ্র দাস নামে আরেকজন বললেন, নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত না থাকায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে না এটা ঠিক। তবে যেসব প্রার্থী আছে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, ভোট হয়ে যাবে।
কিন্তু সেই ভোট কেমন হবে? ভোটাররা কি শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে আগ্রহী হবেন? এমন প্রশ্নে মিশ্র প্রতিক্রিয়াই পাওয়া গেলো।
ঢাকা দক্ষিণ গ্রামের বাসিন্দা আশি বছর বয়সী আব্দুল মালেক বললেন, ভোটের দিন কী হবে বুঝতে পারছেন না তিনি।
“কষ্ট করে ভোট দিতে যাবো, গিয়ে যদি দেখি ভোট দেয়া হয়ে গেছে তাহলে কষ্ট করে লাভ কী? এরকম তো ওরা করেছে কয়েকবার।”
সখিনা খাতুন নামের আরেকজন অবশ্য বললেন, গতবার তিনি ভোট দিয়েছিলেন। এবারও দিতে চান।
সিলেট-৬ আসনে চার প্রার্থী আলোচনায় থাকলেও এখানে মোট প্রার্থী ছয় জন। বাকি দু’জন হচ্ছেন মিনার প্রতীকে ইসলামী ঐক্যজোটের সাদিকুর রহমান এবং ছড়ি প্রতীকে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের আতাউর রহমান।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি থাকুক বা না থাকুক সিলেট-৬ আসনে তবু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী আছে।
এছাড়া সিলেট-৫ আসনেও আওয়ামী লীগের বাইরে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি আছে। কিন্তু সিলেট জেলার বাকি ৪টি আসনেই কার্যত: আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোন প্রার্থী নেই।