খতনা করাতে গিয়ে শিশু আয়ান মারা গেল কেন, পরিবার যা বলছে

    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

“নামি-দামি অনেকেই ইউনাইটেড মেডিকেলে স্বাস্থ্যসেবা নেয়। সেজন্য কিছু টাকা বেশি গেলেও ছেলেটার খতনা নিরাপদে হবে, এই বিশ্বাস থেকেই ওখানে গিয়েছিলাম। অথচ ছেলেটা আমার লাশ হয়ে ফিরলো।”

আক্ষেপ করে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন শিশু আয়ানের বাবার শামীম আহমেদ।

একমাত্র ছেলে আয়ান আহমেদকে খতনা করানোর জন্য গত বছরের ৩১শে ডিসেম্বর ঢাকার সাতারকুলে অবস্থিত ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যান মি. আহমেদ।

সেখানে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর আর জ্ঞান ফেরেনি সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী শিশুটির।

ভুল চিকিৎসা ও হাসপাতালের অবহেলার কারণেই আয়ানের অকালমৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাবা শামীম আহমেদ।

“আমার ছেলেটার ঠাণ্ডার সমস্যা ছিল জেনেও তারা ফুলবডি অ্যানেসথেসিয়া কীভাবে দিলো? তাছাড়া খতনা চলাকালে ৩০ থেকে ৪০ জন মেডিকেল শিক্ষার্থীকে তারা দর্শক হিসেবে ওটিতে ঢুকালো। এটা কোন ধরনের ওটি?” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আহমদ।

“আসল কথা হচ্ছে আমাদেরকে ওরা মানুষই মনে করে না। মন্ত্রী-মিনিস্টাররা গেলে তাদের কাছে যে ধরনের সেবা পায়, আমরা সাধারণ মানুষরা গেলে সেটা পাই না” বিবিসি বাংলাকে বলেন শামীম আহমেদ।

এছাড়া মামলা তুলে নেওয়ার জন্যও বিভিন্ন মহল থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মি. আহমেদ।

এদিকে, শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর রোববার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

হাসপাতালটি নিবন্ধন ছাড়াই এতদিন চলছিলো। এমন কী এই নামে কখনও কোন নিবন্ধনের আবেদনও করা হয়নি বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, যথাযথ নিয়ম মেনে মূল প্রতিষ্ঠান 'ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড' নামে নিবন্ধন আবেদন করা হয়েছিলো।

সেটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন ইউনাইটেড হাসপাতালের পাবলিক রিলেশন্স ম্যানেজার আরিফুল হক।

অন্যদিকে, এ ধরনের ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সেজন্য 'কঠোর পদক্ষেপ' নেওয়া হচ্ছে বলে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন নবনিযুক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।

আরও পড়তে পারেন:

'আগেই মারা গিয়েছিল': পরিবার

খতনার জন্য শিশু আয়ান আহমেদকে অজ্ঞান করা গত ৩১শে ডিসেম্বর। এরপর জ্ঞান না ফেরায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে স্থানান্তর করা হয় গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে।

সেখানে আটদিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকার পর গত সাতই জানুয়ারি রাতে আয়ানকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

পরিবারের ধারণা, শিশুটি আগেই মারা গিয়েছিল। 'পরিকল্পিতভাবেই' সে খবর চেপে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।

"সেদিন নির্বাচন ছিল। মিডিয়া ঐটা নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তারা এই সুযোগটাই নিছে বলে আমাদের ধারণা", বিবিসি বাংলাকে বলেন আয়ানের বাবার শামীম আহমেদ।

যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, মি. আহমেদের দাবিটি সত্য নয়।

"আমরা প্রতিদিনই তাদেরকে বাচ্চার অবস্থার আপডেট দিয়েছি। কয়েকদিন ভেতরে নিয়েও দেখিয়েছি যে, বাচ্চার হার্টবিট চলছে", বিবিসি বাংলাকে বলেন ইউনাইটেড হাসপাতালের পাবলিক রিলেশন্স ম্যানেজার আরিফুল হক।

এ অবস্থায় আয়ানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।

একই সাথে, আয়ানের পরিবারকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, সেই প্রশ্নে রুল জারি করা হয়েছে।

অবশ্য মি. আহমেদ ক্ষতিপূরণ নয়, চাচ্ছেন সুষ্ঠু বিচার।

“আমার একমাত্র ছেলে মারা গেছে। এই ক্ষতি কীভাবে পূরণ করবে তারা?” বিবিসি বাংলাকে বলেন শামীম আহমেদ।

“আমার চাওয়া একটাই। এ ধরনের হাসপাতালগুলো বন্ধ হোক। আমার মতো আর যেন কেউ সন্তান না হারায়” বলেন তিনি।

বিল পরিশোধ ও সমঝোতার চাপ

অজ্ঞান হওয়া থেকে শুরু করে আয়ানকে মৃত ঘোষণা করা পর্যন্ত আট দিনে হাসপাতালের বিল এসেছে ছয় লাখ টাকা।

এই টাকা পরিশোধ করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছে বলে বিবিসি বাংলার কাছে অভিযোগ করেছেন শামীম আহমেদ।

এছাড়া সমঝোতার মাধ্যমে মামলা তুলে নেওয়ার জন্যও বিভিন্ন মহল থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মি. আহমেদ।

“আমাকে বিভিন্ন মহল থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে, অপরিচিত নাম্বার থেকে। বলা হচ্ছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আপনি বসেন এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে আপনি কী চান বলেন" বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. আহমেদ।

"তাও আপনি আইন-আদালতের ভেতরে যায়েন না। কারণ এগুলো করে কিছু পাবেন না। এসব বলা হচ্ছে" বলেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

“এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই” বিবিসি বাংলাকে বলেন ইউনাইটেড হাসপাতালের পাবলিক রিলেশন্স ম্যানেজার আরিফুল হক।

তিনি আরও বলেন, “আমরা শুরু থেকেই বাচ্চার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে আসছি। আর সে কারণেই বিল পরিশোধ না করার সত্ত্বেও বাচ্চার মরদেহ আমরা রিলিজ করে দিয়েছি।” বলেন তিনি।

শিশু মৃত্যুর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বলেও জানান মি. হক।

"ঘটনাটা আসলে কী ঘটেছে, সেটাই আমরা বের করার চেষ্টা করছি। সেখানে আমরা কেউ সমঝোতার চাপ দিবো", বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

নিজেদের কমিটির তদন্তে কারও দোষ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান মি. হক।

এতদিন কীভাবে চললো?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশে সোমবার থেকে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

রোববার রাতে এ সংক্রান্ত একটি ই-মেইল বার্তা তারা পেয়েছেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে গিয়েও দেখা গেছে, হাসপাতালের সামনে একটি নোটিশ ঝুঁলছে। সেখানে বলা হচ্ছে, এর সকল কার্যক্রম আপাতত বন্ধ।

ছয়তলা ভবনটির নির্মাণ কাজ চলমান আছে। ভবনের চারপাশে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের সহসাই সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

ঢুকতে হলে অনুমতি নিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তারা ২০২৩ সালের জুন মাসে হাসপাতালটির নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে যে, অধিদপ্তরের অনলাইন ডাটাবেজ পর্যালোচনা এবং হাসপাতাল পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রাদি যাচাই বাছই করে দেখা গেছে যে, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নামে কোন প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিকট নিবন্ধন/লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য কখনই অনলাইন আবেদন করে নাই।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, হাসপাতালটি কীভাবে এতদিন তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসলো?

"সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি", বিবিসি বাংলাকে বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

মি. আলম বলছেন যে, কোন হাসপাতাল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলেই কেবল তারা সেটি পরিদর্শন করে থাকেন।

তাহলে যারা নিবন্ধন আবেদন না করেই হাসপাতাল চালাচ্ছে, তাদেরকে থামানোর দায়িত্ব আসলে কার?

"এটা আমাদের দায়িত্ব নয়। এটা করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন", বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আলম।

ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করছে, যথাযথ নিয়ম মেনে মূল প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড নামে নিবন্ধন আবেদন করা হয়েছে।

‘আমরা আবেদন করেছিলাম ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড নামে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল।" বিবিসি বাংলাকে বলেন ইউনাইটেড হাসপাতালের পাবলিক রিলেশন্স ম্যানেজার আরিফুল হক।

"ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড আমাদের মাদার কোম্পানি। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এখন বলা হচ্ছে যে, এটি ত্রুটিপূর্ণ।", বলেন মি. হক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়ে দিয়েছে যে, মূল কোম্পানির নামে নিবন্ধন নিয়ে অন্য নামে হাসপাতাল চালানো যাবে না।

এমন অবস্থায় নতুন নামে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে হাসপাতালটির কার্যক্রম পুররায় চালু করার কথা ভাবছে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

সরকার কী বলছে?

তদন্তের মাধ্যমে খুব শিগগিরই শিশু আয়ানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হবে বলে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন নবনিযুক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।

“এটা খুবই দু:খজনক। এমন ঘটনা মোটেও মেনে নেওয়া যায় না”, বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. সেন।

দোষীদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নিবন্ধন ও অনুমোদন ছাড়া কীভাবে হাসপাতালটি রোগীদের সেবা দিয়ে আসছিল, সেটা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মি. সেন।

“নিয়ম-নীতি না মেনে কীভাবে এ ধরনের হাসপাতাল এতদিন চললো, সেটা খতিয়ে দেখা হবে। আমি দেখতে চাই, সমস্যাটা ঠিক কোথায়?”, বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

পাশাপাশি এ রকম ঘটনা সামনে যেন আর না ঘটে, সেজন্য 'কঠোর পদক্ষেপ' নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

“এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে আমরা কঠিন হবো। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে”, বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

আগে যা ঘটেছে

গত ৩১শে ডিসেম্বর খতনার জন্য শিশু আয়ানকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়া হয়।

অজ্ঞান করে খতনা করার পর আর শিশুটির চেতনা না ফেরায় তাকে গুলশানে অবস্থিত ইউনাইটেড হাসপাতালের পিআইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। সেখানেই গত ৭ই জানুয়ারি মারা যায় শিশু আয়ান।

এই ঘটনায় দেশজুড়ে নানা সমালোচনা তৈরি হয়। শিশু সন্তানের এমন মৃত্যুর ঘটনায় আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ বাড্ডা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

ঐ মামলায় হাসপাতালের অ্যানেস্থিওলজিস্ট সাইদ সাব্বির আহমেদ, সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক তাসনুভা মাহজাবিন অজ্ঞাতনামা পরিচালকসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

তাদেরকে গ্রেফতার করাসহ ছয় দফা দাবিতে গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে মানববন্ধন করে আয়ানের স্বজন ও এলাকার বাসিন্দারা।

অন্যদিকে, আয়ানের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে গত ৯ জানুয়ারি হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী।

আয়ানের মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করে কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয় সেখানে। পরে আয়ানের বাবা শামীম আহমেদও রিটে আবেদনে পক্ষভুক্ত হন।

একইসাথে, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল এবং নতুন রোগী ভর্তি না করার নির্দেশনা চেয়ে একটি সম্পূরক আবেদন করে রিট আবেদনকারীপক্ষ।

সোমবার প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারির পাশাপাশি সারা দেশে অনুমোদনহীন কতগুলো হাসপাতাল রয়েছে, সেই তালিকা এক মাসের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট।